নিট পুনঃপরীক্ষার জালিয়াতি চক্র ফাঁস! গ্রেফতার অভিযুক্ত সরকারি মেডিক্যাল কলেজের পড়ুয়ারাও
India
-Ritesh Ghosh
নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার বিতর্ক ও অসঙ্গতির আবহে বিহারে ফের ফাঁস হল এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ছক। পরীক্ষা ব্যবস্থার সমস্ত কড়া নজরদারি ও সুরক্ষাবলয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিহারের লক্ষ্মীসরাইয়ে হুবহু চলচ্চিত্র ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’-এর কায়দায় অন্যের হয়ে পরীক্ষা দেওয়ার প্রক্সি চক্রের পর্দাফাঁস করল রাজ্য পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, নিট পরীক্ষায় আসল প্রার্থীদের পরিবর্তে মেধাবী পড়ুয়াদের বসিয়ে পাস করিয়ে দেওয়ার এক বড়সড় চক্র সক্রিয় ছিল রাজ্যজুড়ে।
এই ব্যাপক জালিয়াতির তদন্তে নেমে পুলিশ রবিবার হওয়া নিটের পুনঃপরীক্ষা চলাকালীন ২৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। উদ্ধার হওয়া তথ্য থেকে জানা গিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া এই ২৪ জনের মধ্যে যেমন রয়েছেন দেশের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় সরকারি কলেজের চিকিৎসাবিদ্যা ও নার্সিংয়ের পড়ুয়ারা, তেমনই রয়েছেন বায়োমেট্রিক পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা একটি সংস্থার ১৪ জন কর্মীও। পরীক্ষার মূল সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের এই যোগসাজশ স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থাকে ঘোর অস্বস্তিতে ফেলেছে।

লক্ষ্মীসরাইয়ের হাসানপুর হাইস্কুল পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রথম সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ করেন কর্তব্যরত পুলিশ আধিকারিকরা। তদন্তে প্রকাশ পায় যে, ময়াঙ্ক কাশ্যপ নামের এক যুবক বায়োমেট্রিক সংস্থার ভুয়ো পরিচয়পত্র নিয়ে সেই কেন্দ্রে প্রবেশ করেছিলেন। ময়াঙ্ক আদতে পাটনা মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের (PMCH) তৃতীয় বর্ষের এমবিবিএস ছাত্র। তাকে আটক করার পরেই পুলিশের হাতে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসতে থাকে।
ময়াঙ্ককে জেরার ভিত্তিতে পুলিশ লক্ষ্মীসরাইয়ের কেআরকে হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল এবং কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে হানা দেয়। এই দুই পরীক্ষাকেন্দ্রে ঘটনার দিনই সাতজন ভুয়ো পরীক্ষার্থী ও তাদের সহযোগীদের হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে পারে যে, বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাইয়ের গলদ গলিয়ে আসল প্রার্থীর চোখের আইরিশ স্ক্যান এবং আঙুলের ছাপ জালিয়াতি করতে প্রস্তুত ছিল চক্রটি। আর এই কাজে সাহায্য করছিল ওই বায়োমেট্রিক কোম্পানিরই কয়েকজন অসাধু কর্মী।
বিহার পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এই চক্রের অন্যতম দূরদর্শী রূপকার বা মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উঠে এসেছে অর্পিত রাজের নাম। অর্পিত গয়ার এএনএম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ছাত্র। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের প্রথম দফার নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাতেও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (CBI) অর্পিতকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। জামিনে বা নজরদারির বাইরে বেরিয়ে সে ফের একই ধরনের পরীক্ষার জালিয়াতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা নিটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
একদিকে যখন হবু চিকিৎসকেরা তাদের সততা এবং পরিশ্রমের পরিচয় দিয়ে সমাজে জায়গা পাওয়ার লড়াই করছেন, তখন অন্য একদল চূড়ান্ত লোভের বশবর্তী হয়ে কালোবাজারিতে নাম লিখিয়েছেন। পুলিশ জানাচ্ছে, এই চক্রে ভাড়াটে লেখক বা ‘সলভার’ হিসেবে কাজ করা বেশিরভাগ তরুণ-তরুণীই দেশের প্রথম সারির চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে পাঠরত। ধৃতদের তালিকায় থাকা নামগুলো দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায় এই কারবারের গভীরতা কতটা বিস্তৃত।
অভিযোগে প্রকাশ, বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির (BHU) নার্সিংয়ের ছাত্রী পুনম কুমারী অন্য এক পরীক্ষার্থীর নাম ভাঁড়িয়ে নিট পরীক্ষায় বসেছিলেন। একইভাবে, এই জালিয়াতি কারবারে অপরাধী হিসেবে হাতেনাতে ধরা পড়েছে এমস রায়বেরিলির (AIIMS Rae Bareli) প্রতিভাবান ছাত্র সৌরভ ঝা। দিল্লির শাহদারা মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্ন আমান আগরওয়াল এবং নালন্দা মেডিক্যাল কলেজের নার্সিং পড়ুয়া সঞ্জিত ও তার ভাইকেও পুলিশ এই গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে গ্রেফতার করেছে।
মেধাবী এবং সফল এই পড়ুয়ারা কেন এমন বেআইনি কাজ করতে গেলেন, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ সূত্রের অনুমান, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অন্যের হয়ে পরীক্ষা দেওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন এরা। একেকটি আসনের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেন চূড়ান্ত হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। নিটের মতো সর্বভারতীয় পরীক্ষায় এভাবে আসন বিক্রির চেষ্টা পুরো চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
নিট পরীক্ষার দিনে মেধার অনৈতিক পাচার রুখতে দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ বিশেষ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। পরীক্ষা চলাকালীন যেন কোনো পড়ুয়া ক্যাম্পাস ছেড়ে বাইরে না যেতে পারে, তার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ কড়া নির্দেশ জারি করেছিল। বিশেষ সেমিনার, উপস্থিতি পর্ব ও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল যাতে ক্যাম্পাসে ছাত্রদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়।
কিন্তু এত কড়াকড়ি সত্ত্বেও ধূর্ত ছাত্ররা ফাঁকি দেওয়ার পথ খুঁজে নেয়। উদাহরণস্বরূপ, পাটনা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ময়াঙ্ক কাশ্যপ কলেজে নিজের অসুস্থতার ভুয়া অজুহাত বা ছুটি নিয়ে লক্ষ্মীসরাইয়ের পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে যান। একইভাবে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারাও কোনো না কোনো বাহানায় কলেজ প্রশাসনের নজর এড়িয়ে এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে যোগ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এই পুরো ঘটনাটিতে সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের বিষয় হলো বায়োমেট্রিক সংস্থার কর্মীদের অপরাধমূলক মানসিকতা। সর্বভারতীয় স্তরের একটি পরীক্ষার ডিজিটাল সুরক্ষাবলয় যাদের নিখুঁতভাবে পরিচালনা করার দায়িত্ব ছিল, তারাই এই দুর্নীতিতে সরাসরি শামিল হয়ে পড়েছিল। বায়োমেট্রিক সংস্থার ১৪ জন কর্মীকে এই মামলায় গ্রেফতার করায় এটা পরিষ্কার যে, প্রযুক্তির যতই আপগ্রেডেশন হোক না কেন, ভিতরের কর্মচারীদের নীতিভ্রষ্টতার জন্য পুরো ব্যবস্থাটাই ধসে পড়তে পারে।
বিহার পুলিশের একাধিক বিশেষ দল বর্তমানে এই কেলেঙ্কারির শিকড়ে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে বহুমুখী তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ খতিয়ে দেখছে যে, এই চক্রে কেবল লক্ষ্মীসরাই নয়, বিহার সহ প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর আরও বড় কোনো প্রভাবশালী চক্র হাত বাড়িয়ে রেখেছে কি না। একইসঙ্গে আর কোন কোন কেন্দ্রে এভাবে পরীক্ষক বা অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিবিদদের কিনে নিয়ে বিকল্প উপায়ে পরীক্ষা দেওয়া হয়েছে, তাও খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
নিট পুনর্বার আয়োজন করার পরেও রাজ্য প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ এড়ানো গেল না, এটি ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ধাক্কা। পরীক্ষার্থীদের একাংশ এবং অভিভাবকদের মধ্যে এই ঘটনার পর চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। সাধারণ ও সৎ পরীক্ষার্থীদের কষ্টার্জিত মেধা রক্ষার্থে কীভাবে আগামীতে পরীক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত এবং সুরক্ষাবাহী এক পরিবেশ তৈরি করা যাবে, তা নিয়েই এখন দেশজুড়ে জোর আলোচনা চলছে।



Post Comment