‘বুঝে কথা বলবেন’, ট্রাম্পের হুঙ্কারে পাল্টা দিল ইরান, বৈঠকে আমেরিকানদের সঙ্গে হাত মেলাল না ইরানিরা!
International
-Ritesh Ghosh
কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে আয়োজিত বহুমুখী শান্তি বৈঠকের প্রথম দিনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক বাকযুদ্ধ চরম রূপ নিল। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান চলমান শান্তি প্রক্রিয়াকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক উপদেষ্টারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র হুমকির প্রত্যুত্তরে ইরান ওয়াশিংটনকে অবিলম্বে নিজের ভাষা নিয়ন্ত্রণে রাখার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এই চরম দ্বন্দ্বের জেরে কূটনৈতিক সৌজন্যমূলক করমর্দনের সূচিও বর্জন করেছে ইরানের প্রতিনিধি দল।
শান্তি আলোচনা শুরুর মাত্র কয়েক মিনিট পরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ অত্যন্ত তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। লেবাননে সক্রিয় হিজবুল্লার দিকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করেন, তারা যেন তাদের বিপুল অর্থপুষ্ট প্রক্সিবাহিনীকে অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণে আনে। ইরান যদি ইজরায়েলের ওপর হামলা রুখতে না পারে, তবে তাদের ওপর গত সপ্তাহের চেয়েও আরও ভয়ঙ্কর ও বিধ্বংসী আক্রমণ চালানো হবে বলে স্পষ্ট হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন অভূতপূর্ব ঔদ্ধত্যপূর্ণ সোশ্যাল মিডিয়া বার্তার পর সুইজারল্যান্ডের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা কক্ষে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ইরানের প্রধান আলোচক মহম্মদ বাঘের গালিবাফ আমেরিকার এই আগ্রাসনের কড়া জবাব দিতে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করেননি। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, আমেরিকার উচিত সাবধানে কথা বলা এবং যেকোনও পরিস্থিতির মোক্ষম জবাব দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বহর যেকোনও মুহূর্তে সামগ্রিক যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
এই বাকযুদ্ধের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ে দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর। তেহরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, শান্তি বৈঠক শুরুর আগে দুই পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বিনিময় এবং উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে একটি ঐতিহ্যবাহী যৌথ ছবি তোলার সূচি ছিল। তবে ট্রাম্পের এই বিতর্কিত বার্তার তীব্র প্রতিবাদে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং প্রধান আলোচক গালিবাফ মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে করমর্দন এড়িয়ে চলেন এবং নির্ধারিত ফটোসেশন বর্জন করেন।
উত্তেজনার পারদ আরও চড়ে যখন ক্ষুব্ধ ইরানি প্রতিনিধি দল আলোচনার টেবিল ছেড়ে সাময়িকভাবে বৈঠক থেকে বেরিয়ে যায়। ইরানের সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির দেওয়া তথ্যমতে, ইরানি আলোচকেরা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এই ধরনের আক্রমণাত্মক ও অসম্মানজনক টুইট বা পোস্টের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। ওয়াশিংটনের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিয়ে ইরানের প্রতিনিধি দল সুইস কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তাদের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্রও জমা দিয়েছে, যার ফলে আলোচনার স্বাভাবিক গতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
উত্তপ্ত বাগবিতণ্ডা এবং নাটকীয় বয়কটের কালো মেঘ উড়িয়ে দিয়ে অর্থনৈতিক উপশমের খোঁজে কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল দ্বিপাক্ষিক আলোচনাও পিছনের দরজায় হয়েছে। বৈঠক সংশ্লিষ্ট ইরানি প্রতিনিধি দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমী দেশগুলোর দীর্ঘকাল ধরে আরোপিত কড়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের একটি বিশেষ খসড়া চুক্তি আজকের বৈঠকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী খুব দ্রুতই ওয়াশিংটনের তরফ থেকে এই ছাড়পত্র জারি করা হবে।
তবে নিষেধাজ্ঞাের অবসানের পাশাপাশি ইরান তাদের একটি অত্যন্ত কঠিন শর্ত পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা না মিললে শান্তি চুক্তি অসম্ভব। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রে পড়ে থাকা বা অবরুদ্ধ হয়ে থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের ইরানি অর্থ ছাড়ের ওপর আলোচনা হয়েছে। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই আটকে থাকা তহবিলগুলো যদি নিঃশর্তে তাদের হাতে ফেরত না দেওয়া হয়, তবে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির কোনো চুক্তি কার্যকর করা যাবে না।
কাতার এই সংকটে বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের অবরুদ্ধ ইরানি সম্পত্তি মুক্ত করার ঘোষণা করেছে। রবিবারের বৈঠকে তেহরান এবং দোহার আর্থিক বিভাগের আধিকারিকেরা এই বিশাল পরিমাণ মূলধনের নিরাপদ ডিজিটাল হস্তান্তর এবং প্রশাসনিক আইনি জটিলতা দ্রুত মেটানোর জন্য বিশেষ কার্যপ্রণালী তৈরি করতে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই ঐতিহাসিক ছাড় পাওয়া ইরানের বিপর্যস্ত অভ্যন্তরীণ মুদ্রা ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দার মহাসংকট কাটাতে বড় ধরনের অক্সিজেন জোগাবে।
সুইজারল্যান্ডে শুরু হওয়া এই প্রথম দফার বৈঠক থেকে তেহরান কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় কারার পথে এগোলেও ভবিষ্যৎ সংলাপ নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইজরায়েলের ক্রমাগত লেবাননে বিমান এবং স্থল সেনা অভিযানের মুখে পরবর্তী দফার শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি ঝুলে রইল। ইরানি প্রশাসন সতর্ক করে বলেছে, হিজবুল্লার ওপর হামলা এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হওয়া অবিলম্বে বন্ধ না হলে ইরান আমেরিকার সঙ্গে আর কোনো স্তরে বৈঠকে বসবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে চার মাস ধরে চলা এই প্রলয়ংকারী যুদ্ধের প্রধান অক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। একদিকে যখন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি মেটানো ও সংঘাত বন্ধের আশায় দুই দেশের কূটনীতিকেরা সুইজারল্যান্ডে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সামনাসামনি লড়াই করছেন, তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধানের যুদ্ধংদেহী আচরণ শান্তি ফিরিয়ে আনার আন্তরিকতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে। এই জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণে কোন পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তি আনতে পারে, তা দেখতে বিশ্ব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।



Post Comment