মণিপুর-মিজোরাম থেকে কয়েকশোকে ‘এয়ারলিফ্ট’ করে নিয়ে গেল ইজ়রায়েল, পুনর্বাসন ও ধর্মান্তরণ কেন?

মণিপুর-মিজোরাম থেকে কয়েকশোকে ‘এয়ারলিফ্ট’ করে নিয়ে গেল ইজ়রায়েল, পুনর্বাসন ও ধর্মান্তরণ কেন?

নয়াদিল্লি: পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে সরগরম দেশের রাজনীতি। মণিপুরে নতুন করে অশান্তির আগুন জ্বলে উঠলেও, সে নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য নেই। সেই আবহেই মণিপুর এবং মিজোরাম থেকে কয়েকশো মানুষকে ‘এয়ারলিফ্ট’ করে নিয়ে নিয়ে গেল ইজ়রায়েল। এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী মণিপুর এবং মিজোরাম থেকে ২৪০জনের বেশি মানুষকে তেল আভিভ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে এখানেই শেষ নয়। আগামী দিনে আরও ভারতীয়কে ইজ়রায়েল ‘এয়ারলিফ্ট’ করে নিয়ে যাবে বলে জানা যাচ্ছে। (India-Israel Relations)

মণিপুর-মিজোরাম থেকে দলে দলে ইজ়রায়েলে

বৃহস্পতিবার দিল্লি হয়ে ২৪০ জনের বেশি মানুষকে নিয়ে তেল আভিভের উদ্দেশে রওনা দেয় ইজ়রায়েলের বিমান। ‘Operation Wings of Dawn’-এর আওতায় তাঁদের নিয়ে গিয়েছে ইজ়রায়েল। ২০২৬ সালে আরও ১২০০ মানুষকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। আগামী সপ্তাহে আরও দু’টি বিমান এসে পৌঁছবে বলে জানিয়েছে ইজ়রায়েলের Aliayh and Integration মন্ত্রক, যারা শরণার্থী এবং পুনর্বাসন সংক্রান্ত বিধি তৈরি করে, বাজেট বরাদ্দ করে এবং আশ্রয়, কর্মসংস্থান ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত সবকিছু দেখভাল করে। (B’nei Menashe Community Moves to Israel)

আরও পড়ুন: ভারতগামী জাহাজ বাজেয়াপ্ত করল ইরান, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হঠাৎই আবির্ভূত হলেন মুখোশধারী কম্যান্ডোরা, ভিডিও দেখাল তেহরান

কিন্তু মণিপুর এবং মিজোরাম থেকে মানুষজনকে কেন ‘তুলে’ নিয়ে যাচ্ছে ইজ়রায়েল? 

এর নেপথ্যে ঐতিহাসিক কার্যকারণ রয়েছে যেমন, তেমনই ভবিষ্য়ৎ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটাতেও এমন পদক্ষেপ ইজ়রায়েলের। মণিপুর এবং মিজোরাম থেকে সেই সব মানুষদেরই তেল আভিভ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যাঁরা B’nei Menashe (বনেই মেনাশে) সম্প্রদায়ের মানুষ। এই ‘ব’নেই মেনাশে’ সম্প্রদায়ের মানুষজনকে ‘ইজ়রায়েলের অবলুপ্ত ১০ জনজাতি’র বংশধর বলে মনে করা হয়। 

Operation Wings of Dawn

‘ব’নেই মেনাশে’রা ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষ। মণিপুর এবং মিজোরামের কুকি জনজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে পড়েন। তাঁরাও নিজেদের ইজ়রায়েলের অবলুপ্ত মেনাশে জনজাতি গোষ্ঠীর বংশধর মনে করেন। মণিপুর এবং মিজোরামে ‘ব’নেই মেনাশে’ সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭০০০। বছরের পর বছর তাঁদের অনেকেই ইজ়রায়েল চলে গিয়েছেন। Shavei Israel নামের একটি বেসরকারি সংস্থা গোটা বিষয়টি তদারকি করে। তাদের সহযোগিতায় প্রায় ৪০০০ মানুষজন ইতিমধ্যেই ইজ়রায়েলে থিতু হয়েছেন। ২০০৬ সালে মিজোরাম থেকে ২১৩ জন ইজ়রায়েল চলে যান, ২০০৭ সালে মণিপুর থেকে যান ২৩৩ জন। ২০১৮ সালে ইজ়রায়েল চলে যান ৪০০ জনের বেশি।

তবে বৃহস্পতিবার যে ২৪০ জনের বেশি মানুষকে বিমানে তোলা হয়, তা সরাসরি ইজ়রায়েল সরকারের হস্তক্ষেপ ছিল। গত বছর নভেম্বর মাসে ইজ়রায়েলের মন্ত্রিসভায় ‘ব’নেই মেনাশে’দের ইজ়রায়েলের ‘পুনর্বাসন’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই মতো পৃথক বাজেটও বরাদ্দ করা হয়, যার আওতায় শরণার্থীদের জন্য বিমানভাড়া থেকে আবাসের জন্য টাকা বরাদ্দ করা হয়। পাশাপাশি, টাকা বরাদ্দ করা হয়, ‘ধর্মান্তরণ শিক্ষা’র জন্যও। হিব্রু শেখানোর জন্য টাকা খরচ করবে ইজ়রায়েল সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে গোটা ‘ব’নেই মেনাশে’ সম্প্রদায়ের সকলকে ইজ়রায়েলে পুনর্বাসন  দেওয়ার কাজ সম্পূর্ণ করে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে।

আরও পড়ুন: ভারতকে ‘নরককুণ্ড’ বললেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্যে বিতর্ক

ইজ়রায়েলের আইন অনুযায়ী ‘ব’নেই মেনাশে’দের যদিও ইহুদি বলে গণ্য করা হয় না। ফলে বিশেষ বিধি এনে এই গোটা কার্য সম্পন্ন করা হচ্ছে। ইজ়রায়েলের ‘ব’নেই মেনাশে’ সংগঠনের সদস্য দেগেল মেনাশে জানান, মণিপুর এবং মিজোরাম থেকে ২৪৯ জন তেল আভিভ পৌঁছেছেন। ইজ়রায়েলে উত্তরের নফ হেগালিল এবং কিরইতায় ইয়ামের মতো শহরে শরণার্থীদের পুনর্বাসন দেওয়া হবে। AFP-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এই তো অভিযানের সূচনা হল। বছরে ১২০০ জনকে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও ৬০০ জনকে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। বছরের শেষে এসে পৌঁছবেন আরও ৬০০ জন। ২০৩০ সাল পর্যন্ত অভিযান চলবে।”

‘ব’নেই মেনাশে’ বলতে কী বোঝায়? তাঁরা ভারতে এলেনই বা কী করে? উত্তর-পূর্ব ভারতেই বা গিয়ে থিতু হলেন কী করে? 

বাইবেল অনুযায়ী, প্রাচীন ইজ়রায়েলিরা ১২টি জনজাতিতে বিভক্ত, যার মধ্যে ১০টি জনজাতির নামকরণ হয় জেকবের সন্তানদের নামানুসারে এবং দু’টির তাঁর নাতিদের নামানুসারে, Epharaim এবং Menashe. এই এফারইম এবং মেনাশে জোসেফের সন্তান। উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘ব’নেই মেনাশে’ সম্প্রদায়ের মানুষজন নিজেদের মেনাশের বংশধর মনে করেন। কথিত রয়েছে, ইজ়রায়েলের পতনের পর ৭২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বিজয়ী আশুরীয়রা তাঁদের নির্বাসিত করেন। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উত্তর অংশ, বর্তমানে যেখানে ইরাক, সেখানে যে মহাশক্তিধর, প্রাচীন সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, তাকে আশুরীয় সভ্যতা বলা হয়।

ইজ়রায়েল থেকে বিতাড়িত হয়ে ‘ব’নেই মেনাশে’রা পারস্য, আফগানিস্তান, তিব্বত এবং চিন পেরিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বে থিতু হন বলে কথিত রয়েছে। প্রায় ১০০০০ মানুষ সেই সময় ভারতের উত্তর-পূর্বে থিতু হন। মূলত মণিপুর এবং মিজোরামে বসবাস শুরু করেন তাঁরা। IIT দিল্লির গবেষক আসাফ আর জানিয়েছেন, ‘ব’নেই’  শব্দের অর্থ শিশু এবং ‘মেনাশে’ শব্দের অর্থ নাতি-নাতনি। ভারতকে নিরাপদ মনে করেই ‘ব’নেই মেনাশে’রা এখানে আশ্রয় নেন বলে মত গবেষকদের। মণিপুরে ‘ব’নেই মেনাশে’রা কুকি জনজাতির অন্তর্ভুক্তষ ২০ শতকের গোড়ায় কুকিদের অধিকাংশই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। আমেরিকা থেকে আগত পাদরিদের দ্বারা প্রভাবিত হন তাঁরা। তবে ‘ব’নেই মেনাশে’রা ইহুদি রীতিনীতির অনুসারীই রয়ে যান। 

এখন যখন ‘ব’নেই মেনাশে’রা ইজ়রায়েল ফিরে যেতে চাইছেন, তার নেপথ্য়েও রয়েছে ধর্ম। মণিপুরের বাসিন্দা বেঞ্জামিন হাওকিপ ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, নিজেদের ধর্মাচারণের তেমন সুযোগ নেই তাঁদের। সেই মতো পরিকাঠামোও নেই উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তাঁর কথায়, “এখানে সব রীতিনীতি পালন করতে পারি না আমরা। প্রার্থনাসভার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষজনের উপস্থিতির প্রয়োজন পড়ে, যা এখানে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ধর্মের খাতিরেই ইজ়রায়েল যেতে চাই আমরা।” ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের জন্য ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক ইহুদি দ্বারা গঠিত কোরামের উল্লেখ করেন তিনি। নিজেদের খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি থেকেও ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন বলে দাবি হাওকিপের। বর্তমানে অনলাইন হিব্রু ভাষা শিখতে শুরু করেছেন তাঁরা। 

‘ব’নেই মেনাশে’দের নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইজ়রায়েলের আসল উদ্দেশ্য কী?

কিন্তু হঠাৎ ভারত থেকে ‘ব’নেই মেনাশে’দের নিয়ে গিয়ে পুনর্বাসন দিতে এত আগ্রহী কেন ইজ়রায়েল? প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানইয়াহু গতবছর সেই নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। গোটা অভিযানকে তিনি ‘ইহুদিরাষ্ট্রপন্থী ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত’ বলে উল্লেখ করেন। ২০০৫ সালের আগে ভারত থেকে যত ‘ব’নেই মেনাশে’ ইজ়রায়েল চলে যান, তাঁরা মূলত হেব্রন এবং গাজ়ায় ইজ়রায়েলের দখলে থাকা বসতি এলাকায় থিতু হয়েছেন। বৃহস্পতিবার যে ২৪৯ জন তেল আভিভ পৌঁছন, তাঁদের পুনর্বাসন দেওয়া হবে ইজ়রায়েলের উত্তরে, যেখানে গত গত সপ্তাহেই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে লেবাননের হেজবোল্লা। সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে এই মুহূর্তে। নেতানইয়াহু মনে করছেন, ‘ব’নেই মেনাশে’দের পুনর্বাসন দিলে উত্তরের অংশে ইজ়রায়েলের উপস্থিতি আরও জোরাল হবে। ধর্মান্তরণের পর সকলেই ইজ়রায়েলের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন। ফলে তাঁরা ইজ়রায়েলের জন্য প্রাণপাত করতেও যে প্রস্তুত থাকবেন, সেখানে ইজ়রায়েলের আধিপত্য বজায় রাখতে যে সহায়ক হয়ে উঠবেন, সে ব্যাপারে একমত কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরাও।

ফলে ভারত থেকে ‘ব’নেই মেনাশে’দের উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া এবং পুনর্বাসনের নেপথ্যে আসলে ইজ়রায়েলের স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, হামাসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জেরে লোকজনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শ্রমিক নেই পর্যাপ্ত সংখ্য়ক। নেপাল, তাইল্যান্ড থেকে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে যাঁরা কাজ করতে যেতেন, যুদ্ধের আবহে তাঁরাও এখন আর ইজ়রায়েল যাচ্ছেন না। ফলে ‘ব’নেই মেনাশে’ সম্প্রদায়কে নিয়ে যেতে পারলে, ইজ়রায়েলের হাত শক্ত হবে। সীমান্ত এলাকায় আরব এবং ইজ়রায়েলি জনসংখ্যায় ভারসাম্য রাখাও সহজ হবে তাদের পক্ষে। গাজ়ার উপর দখলদারির কাজেও সহযোগিতা মিলবে।

‘ব’নেই মেনাশে’রা কেন ভারত ছাড়ছেন?

২০২৩ সালে যখন ইজ়রায়েল এবং হামাসের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়, সেই সময় মণিপুর এবং মিজোরাম থেকে যাওয়া ২০০-র বেশি ‘ব’নেই মেনাশে’ সম্প্রদায়ের মানুুষ ইজ়রায়েলি সেনায় নাম লেখান এবং সীমান্তে যুদ্ধ করতে যান। এতকিছু জেনেও যে মণিপুর এবং মিজোরাম থেকে ‘ব’নেই মেনাশে’রা ইজ়রায়েল যেতে প্রস্তুত, তার নেপথ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক কারণও। ভারতে মূলত কৃষিকাজেই নিযুক্ত তাঁরা। শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যান অনেকে। কিন্তু এখানে তাঁরা যে টাকা রোজগার করেন, তার চেয়ে যদি ইজ়রায়েলে গিয়ে লরি চালানো বা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, তাতেও ঢের বেশি টাকা আয়ের সুযোগ রয়েছে। ভারতে তাঁদের আয় যেখানে খুব বেশি হলে বছরে ১.৫ লক্ষ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করে, ইজ়রায়েলে সেখানে প্রায় ৫০-৫২ লক্ষ টাকায় আয় করা যায় হেসে খেলে।

২০২৩ সালের মে মাসে মণিপুরে কুকি বনাম মেইতেই সংঘর্ষেও ক্ষতিগ্রস্ত হন ‘ব’নেই মেনাশে’রা। বিশেষ করে তাঁদের রোজগারে খাঁড়া নেমে এসেছে। আজও সংসার চালাতে রীতিমতো যুঝছেন তাঁরা। ভারতে বর্ণবিদ্বেষের শিকার হতে হয় বলেও ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে জানিয়েছেন হাওকিপ। চেহারার দরুণ রাস্তাঘাটে ‘চিনা’ বলে কটাক্ষ করা হয় বলে জানিয়েছেন তিনি। ড্যানিয়েল হাংশিং তাই বলেন, “ভারত জন্মস্থান, কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ ইজ়রায়েল।”



Post Comment

You May Have Missed