CAA ইস্যুতে আগুন জ্বলেছিল, তৃণমূল-বিজেপি আবহে মুর্শিদাবাদে কতটা প্রাসঙ্গিক ‘ঘরের ছেলে’ অধীর?
দীপক ঘোষ, মুর্শিদাবাদ: নবাবের এই শহরের নাম উচ্চারণ করলেই এক সময়ে চোখের সামনে ভেসে উঠত শুধুমাত্র হাজারদুয়ারি, ভাগিরথী নদীর অপার সৌন্দর্য, লালবাগ, মতিঝিল আর বিরল প্রজাতির মন মাতানো স্বাদের নবাবি আম বাগান। এই জেলায় পায়ে পায়ে কথা বলে ইতিহাস। একসময়ে এই ভূখণ্ড ছিল বিশ্বের অন্য়তম সমৃদ্ধ ভূখণ্ড। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলেছে। বদলেছে জেলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদের ভোটের হাওয়া কেমন, এই প্রতিবেদনে সেই বিষয়েই উল্লেখ আছে।
CAA আইন সামনে আসতেই প্রথম আগুন জ্বলে উঠেছিল এই জেলাতেই। পথ অবরোধ, ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলা, ট্রেনে আগুন, রেলস্টেশন ভাঙচুরের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা রাজ্য়ে। এরপর এল ওয়াকফের পালা। ফের আগুন, ফের সন্ত্রাস। সামশেরগঞ্জে সাম্প্রদায়িক হামলা, খুন, লুঠপাট নাড়িয়ে দেয় গোটা দেশকে। এরপর SIR ঘিরেও একের পর এক অশান্তির ঘটনা উত্তপ্ত করে তুলেছে এই ভূখণ্ডকে। তার ওপরে এই মাটিতে বাবরি মসজিদ নির্মাণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে হাত দিয়ে জেলার রাজনীতিকে আরও ঘোরালো করে তুলেছে হুমায়ুন কবীর।
বাবরি মসজিদকে হাতিয়ার করে ভোটের ময়দানে হুমায়ুন কবীর
বাবরি মসজিদ সামনে রেখে সংখ্য়ালঘু ভোট কব্জা করতে আসরে নেমেছেন হুমায়ুন কবীর। কিন্তু তাঁর এই ভাইরাল ভিডিওকাণ্ডের পর সেই প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে তা সময়ই বলবে। কংগ্রেস থেকে তৃণমূল, তারপর তৃণমূল থেকে বিজেপি, আবার বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে গিয়েও টিকতে পারেননি হুমায়ুন। অবশেষে আম জনতা উন্নয়ন পার্টি খুলে নিজেই ভোটের ময়দানে নেমে পড়েছেন তিনি।
রাম মন্দির গড়ে তোলার ডাক বিজেপির
পিছিয়ে নেই গেরুয়া শিবিরও। তাঁদের পাল্টা হুমকি, বাবরি মসজিদের জবাব দিতে এখানে রাম মন্দির গড়ে তুলবেন তাঁরা। একেবারে কড়া ডোজের সাম্প্রদায়িক দাওয়াই দিয়ে আসরে নেমেছে দু’পক্ষ। এই মন্দির মসজিদ রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনায় প্রমাদ গুনছেন জেলার অধিকাংশ নাগরিক। তাঁদের বক্তব্য়, এই রাজনীতি জেলার সামাজিক, অর্থনৈতিক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে।
একদা সমৃদ্ধ এই ভূখণ্ড আজ আক্ষরিক অর্থেই এক হতদরিদ্র জেলা। কর্মসংস্থানের অভাবে সিংহভাগ মানুষ আজ পরিযায়ী। কাজের খোঁজে ভিনরাজ্য়ে পাড়ি জমাতে বাধ্য় হচ্ছেন তাঁরা। উজার হয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। এই গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো যোগ হয়েছে সাম্প্রদায়িক সংগ্রাম, যার কুপ্রভাব ঘনিয়ে এসেছে জেলার অর্থনীতির উপর। এখানে আয়ের একমাত্র মাধ্য়ম পর্যটন, আজ মুখ থুব়ড়ে পড়েছে। মুর্শিদাবাদ মানেই এখন আতঙ্ক, ফলে পর্যটকরা সযত্নে এড়ি্য়ে যাচ্ছেন মুর্শিদাবাদকে।
একদিকে কর্মসংস্থানহীন পরিবেশ, অন্য়দিকে আর্থিক আঘাতে যখন জর্জরিত এই জেলা, তখন আরও বড়সড় বিপদ ঘনিয়ে উঠেছে জেলার শিক্ষার পরিবেশের উপর। শিক্ষার জন্য় যে জেলার একসময়ে যথেষ্ট নামডাক ছিল, সেই জেলা এখন ধুঁকছে শিক্ষাক্ষেত্রে। কলেজগুলিতে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির সংখ্য়াটা বিস্ময়করভাবে কমে এসেছে গত কয়েকবছরে। জলঙ্গি মহাবিদ্য়ালয়ে ২১৮৯টি আসন থাকলেও চলতি শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছে মাত্র ১৮৩জন। ৯১ শতাংশ আসন খালি। এই তথ্য় সামনে আসার পর আমরা ঢুঁ দিলাম এই কলেজে।
এই পরিস্থিতির মধ্য়েই অসাম্প্রদায়িক প্রচার, স্লোগান নিয়ে অধীর চৌধুরীর নেতৃত্বে মাঠে লড়াই করছে কংগ্রেস। চড়া মাত্রায় সাম্প্রদায়িক চিৎকারের মধ্য়ে কংগ্রেসের প্রয়াস কতটা কার্যকর হবে, সেটা নিয়ে কৌতুহল আছে রাজনৈতিক মহলে। কারণ, গত লোকসভা ভোটেই বহরমপুরের অবিসংবাদিত নেতা অধীরকে পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সামনেই। কিন্তু এবার? জেলা রাজনীতিতে রবিনহুড বলে পরিচিত অধীর আত্মবিশ্বাসী হলেও তাঁর প্রতিপক্ষ তৃণমূল এবারেও তাঁকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়ার মেজাজে নেই। মালদার মতোই মুর্শিদাবাদও ছিল বাম-কংগ্রেসের দখলে। পরবর্তীতে দুই দলকে নিশ্চিহ্ন করেই ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে ময়দানে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস।
২০২১-এর ফলাফলে, জেলার মোট ২২টি আসনের মধ্য়ে তৃণমূল পেয়েছিল মোট ২০টি আসন। বিজেপি পেয়েছিল ২টি আসন। ২০২৪ লোকসভা ভোটের বিধানসভা ভিত্তিক ফলাফল অনুযায়ী, তৃণমূল ১৪টি, বিজেপি ৩টি, কংগ্রেস ৪টি এবং CPM ১টি আসনে এগিয়ে। যদিও চব্বিশে এখানে জোট বেধে লড়েছিল বাম-কংগ্রেস, কিন্তু এবার তাদের জোট নেই।
এবার এই সমীকরণে কোনও পরিবর্তন হবে কিনা, সেটা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতুহল থাকলেও এই জেলার মানুষ উদ্বিগ্ন সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে। একদিকে কর্মসংস্থানের বেহাল দশা, অন্য়দিকে আর্থিক পরিকাঠামোর উপর আঘাত এবং সেই সঙ্গে শিক্ষায় দুর্দশা। এখনও একটিও বিশ্ববিদ্য়ালয় চালু হল না সেভাবে। এলাকার মানুষের ক্ষোভ, কৃষ্ণনাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্য়ালয় ঘোষণা করা হলেও এখনও সেটা ঠিকঠাক চালু করা যায়নি। তারপরও হাজারদুয়ারি নামে দ্বিতীয় একটি বিশ্ববিদ্য়ালয় তৈরির ঘোষণা করে বসে আছে সরকার। এই ঘোষণা সর্বস্য় দেখনদারিতে আদৌ সন্তুষ্ট হবে জেলার মানুষ?



Post Comment