রাজ্য সরকারের অ্যাকাউন্ট থেকে গায়েব কয়েকশো কোটি? ফিরেও এল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে?
নয়াদিল্লি: ফের বড় ধরনের ব্যাঙ্ক দুর্নীতির পর্দাফাঁস। ৫-১০ কোটি নয়, ৫৯০ কোটি টাকার দুর্নীতি সামনে এসেছে। গত কয়েক মাসে ১৭০টির বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে কমপক্ষে ৩৯১টি সন্দেহজনক লেনদেনের খোঁজ মিলেছে। সেই তালিকায় রয়েছে হরিয়ানা সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, IDFC First Bank-এর কিছু কর্মী এবং চার IAS অফিসারের অ্যাকাউন্টও। যে সমস্ত অ্যাকাউন্ট থেকে সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে, তার মধ্যে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী থেকে রিয়েল এস্টেট সংস্থা এবং রিয়্যালটর্সের নামও রয়েছে বলে খবর। আর সেই আবহেই হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রীর দাবি ঘিরে ধোঁয়াাশা তৈরি হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টাকা ফেরত এসেছে বলে দাবি করেছেন তিনি। কিন্তু এত বড় ঘটনা ঘটল কী করে, এর নেপথ্যে কার হাত ছিল, কিছুই স্পষ্ট নয়। (IDFC Bank Fraud)
হরিয়ানায় IDFC First Bank-এর শাখায় বড় দুর্নীতির পর্দাফাঁস হয়। হরিয়ানা সরকারের একটি বিভাগ সম্প্রতি ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার আর্জি জানায়। ওই অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা স্থানান্তরিত করতে বলা হয় অন্য একটি অ্যাকাউন্টে। কিন্তু হরিয়ানা সরকারের তরফে দেওয়া টাকার অঙ্কের সঙ্গে অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত টাকার অঙ্ক মিলছিল না। কয়েক লক্ষ বা কয়েক কোটি টাকা নয়, প্রথমে ৪৯০ কোটি টাকার হদিশ পাওয়া যাচ্ছিল না। সংযুক্ত অ্যাকাউন্টগুলির তথ্য খতিয়ে দেখে আরও ১০০ কোটির অসঙ্গতি চোখে পড়ে। অর্থাৎ ৫৯০ কোটি টাকার জালিয়াতি ধরা পড়ে। আর তাতেই টনক নড়ে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের। (IDFC Bank 590 Cr Fraud)
Axis Securities জানায়, চণ্ডীগড়ে IDFC First Bank-এর একাধিক অ্যাকাউন্টেই জালিয়াতি হয়। চেকের মাধ্যমেও জালিয়াতি হয়ে থাকতে পারে। সেই নিয়ে শোরগোলের মধ্যে IDFC First Bank-এর, মান্থলি স্টেটমেন্ট থেকে SMS অ্যালার্ট, পিরিয়ডিক ব্যালান্স কনফার্মেশন, মেকার-চেকার অ্যাপ্রুভাল…তাদের তরফে সব কিছুই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তার পরও অসঙ্গতি চোখে পড়ল না কেন, প্রশ্ন ওঠে।
IDFC First Bank জানায়, অভ্যন্তরীণ তদন্তে এই জালিয়াতিতে ব্য়াঙ্কের কিছু কর্মী, অন্য আরও কয়েক জন ব্যক্তি ও সংস্থার যুক্ত থাকার প্রমাণ মিলেছে। এর ঠিক পর পরই হরিয়ানা অর্থ দফতরের তরফে সার্কুলার জারি করে চণ্ডীগড়ে স্থিত IDFC First Bank-এর ওই শাখা এবং AU Small Finance Bank-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা জানানো হয়। পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত রাজ্য সরকারের কোনও টাকা সেখানে জমা দেওয়া যাবে না, গচ্ছিত রাখা যাবে না, কোনও বিনিয়োগ করা যাবে না এবং লেনদেনও চলবে না বলে জানানো হয়।
এমন পরিস্থিতিতে IDFC First Bank-এর শেয়ারে ২০ শতাংশ ধস নামে। অন্য দিকে, AU Small Finance Bank জানায়, অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে তারা। তবে তাদের ব্যাঙ্কের সরকারি অ্যাকাউন্ট থেকে ৪৭ কোটি টাকা মূল্যের যে ১৪টি লেনদেন হয়েছে, তা স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই হয়েছে বলে দবি করা হয়েছে। তবে IDFC First Bank-এর ৫৯০ কোটি এবং AU Small Finance Bank-এর ৪৭ কোটি টাকার দুর্নীতির যে অভিযোগ সামনে আসে, তাতে বেশ কিছু বিষয় নজর কেড়েছে ইতিমধ্যেই—
- IDFC First Bank-এর দাবি, হরিয়ানা সরকাের একটি বিভাগ থেকে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে গচ্ছিত টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করতে বা হয় তাদের। আর তাতেই অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
- AU Small Finance Bank-এর দাবি, নির্দেশ পাওয়ার পর গত ১৫ জানুয়ারি হরিয়ানা সরকারের একটি ব্য়াঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় তারা। গচ্ছিত ২৫ কোটি টাকা সুদ-সহ অন্য বেসরকারি ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়।
- এর পর ১৬ ফেব্রুয়ারি হরিয়ানা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের তরফে যোগাযোগ করা হয় তাদের সঙ্গে। অ্যাকাউন্ট খোলার পাশাপাশি, নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকে লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়।
- IDFC First Bank জানিয়েছে, ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হরিয়ানা সরকারের অন্যান্য বিভাগ থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। জানানো হয়, ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে থাকা ব্যালান্সের সঙ্গে সরকারি রেকর্ডে থাকা ব্যালান্সের হিসেব মিলছে না।
- এর পর অভ্যন্তরীণ স্তরে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হয়। দেখা যায়, হরিয়ানা সরকারের কিছু অ্যাকাউন্টের বাইরে সাধারণ গ্রাহকদের উপর এই দুর্নীতি বা জালিয়াতির কোনও প্রভাব পড়েনি।
- IDFC First Bank-এর দাবি, ৫৯০ কোটি টাকার রেকর্ড খোঁজা হচ্ছে। সব কিছু খতিয়ে দেখার পরই এর সার্বিক প্রভাব সম্পর্কে কিছু বলা সম্ভব হবে।
- চার সন্দেহভাজন আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়েছে আপাতত। তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। ব্যাঙ্কের যে কর্মীরা এর সঙ্গে যুক্ত, বাইরের যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আইনি পদক্ষেপ করা হবে বলে জানিয়েছে IDFC First Bank.
- AU Small Finance Bnak জানিয়েছে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি বিভাগ থেকে পৃথক ভাবে যোগাযোগ করা হয় তাদের সঙ্গে। হরিয়ানা সরকারের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে এক গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়। ওই দিনই তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের কথা জানায় হরিয়ানা সরকার।
- ২০ ফেব্রুয়ারি IDFC First Bank বোর্ডের সদস্যদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক ডাকে।
- ২১ ফেব্রুয়ারি অডিট কমিটি এবং বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
- ২২ ফেব্রুয়ারি কর্মীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় এবং IDFC First Bank জানায়, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে ব্যাঙ্ক নয়, কিছু ব্যক্তি এই দুর্নীতির জন্য দায়ী বলে জানায় তারা।
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া-কে গোটা বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করে IDFC First Bank. থানায় অভিযোগও দায়ের হয়। সেই সঙ্গে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থার কাছেও অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানায় তারা। জানায়, তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত তারা। পাশাপাশি, নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য KPMG-কেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই দুর্নীতিতে হরিয়ানা সরকারকে কত টাকা খোয়াতে হল, তাদের কত ক্ষতি হল, সেই নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু হয়। হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী নয়াব সিংহ সাইনি প্রথমে জানান, দুর্নীতিদমন বিভাগ গভীরে তদন্ত করবে। উচ্চস্তরের তদন্ত কমিটি গড়া হবে, যাতে IAS অফিসাররাও শামিল থাকবেন। এর পর, মঙ্গলবার আচমকা সাইনি জানান, দুর্নীতির সব টাকাই ফিরে এসেছে তাঁদের কাছে। রাজ্য বিধানসভায় তিনি জানান, ৫৫৬ কোটি টাকার পাশাপাশি, সুদের ২২ কোটি টাকা ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ফেরত আসে। কিন্তু রবিবার দুর্নীতির বিষয়টি সামনে এল, আর মঙ্গলবারের মধ্যে টাকা ফেরত এসে গেল কোন উপায়ে, ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।



Post Comment