Erfan Soltani: ইরানকে ঘিরে ফেলছে মার্কিন রণতরী, ট্রাম্প অর্ডার দিলেই হামলা! ভয়েই আচমকা বিদ্রোহী সোলতানির ফাঁসি রদ…
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: একদিকে পারস্য উপসাগরের নীল জলে মার্কিন রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ (USS Abraham Lincoln)-এর উদ্যত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের গর্জন, অন্যদিকে তেহরানের রাজপথে হাজার হাজার মানুষের ‘মোল্লাতন্ত্র নিপাত যাক’ স্লোগান। এই দুই আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ২৬ বছরের তরুণ এরফান সোলতানির ভবিতব্য নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে রুদ্ধশ্বাস নাটক চলল ইরানে। বুধবার যাঁর গলায় ফাঁসির দড়ি পড়ার কথা ছিল, শেষ মুহূর্তে তাঁর দণ্ড কার্যকর স্থগিত করল আয়াতোল্লা আলি খামেইনির প্রশাসন। কিন্তু কেন এই ইউ-টার্ন? উত্তর খুঁজছে গোটা বিশ্ব।
১০ মিনিটের বিদায় ও এক অনিশ্চিত লড়াই
পেশায় এক সাধারণ পোশাক দোকানের কর্মচারী এরফান সোলতানি (Erfan Soltani)। গত বৃহস্পতিবার তেহরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কারাজে বিক্ষোভ দেখানোর সময় তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিস। এরপর থেকেই এরফানের পরিবারকে কার্যত অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। বুধবার তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তার আগে পরিবারের হাতে সময় দেওয়া হয়েছিল মাত্র ১০ মিনিট। ‘শেষ বিদায়’ জানানোর সেই হাহাকার মাখা সাক্ষাতের পর সারা পৃথিবী যখন প্রথম ‘বিদ্রোহী’র মৃত্যুর খবর গুনছে, ঠিক তখনই এল খবর— ফাঁসি হচ্ছে না। আপাতত তা স্থগিত।
মানবাধিকার সংগঠন
‘হেঙ্গাও’-এর দাবি, সোলতানির বিরুদ্ধে চলা পুরো আইনি প্রক্রিয়া ছিল প্রহসন। না দেওয়া হয়েছে আইনি সহায়তা, না দেওয়া হয়েছে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ। এমনকি এরফানের নিজের বোন একজন আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে ভাইয়ের মামলা লড়তে দেওয়া হয়নি। সোলতানির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ‘মোহরাবে’ বা ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’। কিন্তু বিচার বিভাগ এখন বলছে, দেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে প্রচারের জন্য জেল হতে পারে, মৃত্যুদণ্ড নয়। এই ভোলবদল কি নিছকই আইনের খাতিরে, নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে কাজ হয়েছে?
রণতরীর চাপ ও ট্রাম্পের ছায়া
ইরানের আকাশে যখন বিদ্রোহের আগুন, তখন সমুদ্র ঘিরে ফেলছে মার্কিন নৌবাহিনী। পেন্টাগন জানিয়েছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন স্ট্রাইক গ্রুপ মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। সঙ্গে রয়েছে গাইডেড-মিসাইল সাবমেরিন ‘ইউএসএস জর্জিয়া’ (USS Georgia)। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন স্পষ্ট করেছেন, ইসরায়েলের সুরক্ষা এবং মার্কিন স্বার্থে কোনো আঘাত এলে আমেরিকা চুপ করে বসে থাকবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নব্য নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া অবস্থান ইরানকে ভাবিয়ে তুলেছে। ট্রাম্প আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে পরিস্থিতি বেগতিক দেখলে আমেরিকা হস্তক্ষেপ করবে। খামেইনি সরকার সম্ভবত বুঝতে পেরেছে, এই মুহূর্তে একজন তরুণ বিক্ষোভকারীকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দিলে তা জনগণের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালার পাশাপাশি আমেরিকার সরাসরি হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরি করে দেবে। সেই ‘ট্রাম্প-ভীতি’ থেকেই কি সোলতানির ফাঁসি স্থগিত? এই জল্পনা এখন তুঙ্গে।
আগ্নেয়গিরির মুখে ইরান
২০২৫-এর ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা এখন আর কেবল মুদ্রাস্ফীতি বা রিয়ালের দাম কমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য থেকে শুরু হওয়া ক্ষোভ এখন খামেনেই বিরোধী পূর্ণাঙ্গ গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১৮৭টিরও বেশি শহরে এখন বিদ্রোহের সুর।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার দাবি অনুযায়ী:
এখন পর্যন্ত সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়েছে।
মৃতদের মধ্যে অন্তত ১২ জন নাবালকও রয়েছে।
গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় ২,৫০০ মানুষকে।
তেহরানের বাজার থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন পড়ুয়া, মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী থেকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। তাঁদের দাবি একটাই— শিয়া শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক সংস্কার।
কৌশলী পিছুটান না কি দমনপীড়নের নতুন ছক?
অস্ট্রেলীয়-লেবানীয় উদ্যোক্তা মারিও নওফাল সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেছেন, এই ধরনের ফাঁসির সাজা বা স্থগিতাদেশ আসলে শাসকগোষ্ঠীর ভয় দেখানোর কৌশল। জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে কখনও মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখানো হচ্ছে, আবার আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লে তা স্থগিত করে নিজেদের ‘ন্যায়পরায়ণ’ দেখানোর চেষ্টা চলছে।
তবে খামেইনির দুশ্চিন্তা অন্য জায়গায়। ইরানের নিজস্ব বাহিনী IRGC এবং বাসিজ মিলিশিয়াদের একটা বড় অংশ এখন সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করছে। পরিস্থিতি সামলাতে ইরাক থেকে আরবিভাষী ভাড়াটে মিলিশিয়া আনার খবরও মিলছে। একদিকে বিদেশি মিলিশিয়া দিয়ে ঘরোয়া বিদ্রোহ দমন, আর অন্যদিকে দরজায় কড়া নাড়া মার্কিন রণতরী— দুই সাঁড়াশি চাপের মুখে পড়ে তেহরান এখন কিছুটা দিশেহারা।
এরফানের মুক্তি না কি স্রেফ কালক্ষেপ?
এরফানের ফাঁসি স্থগিত হওয়াকে প্রাথমিক জয় হিসেবে দেখছেন মানবাধিকার কর্মীরা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই স্বস্তি কতক্ষণের? এরফানের পরিবারকে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে, মুখ খুললে পরিবারের বাকিদেরও একই দশা হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, মৃত্যুদণ্ড স্থগিত হলেও দমনপীড়নের স্টিম রোলার থামেনি।
তেহরানের রাজপথে স্লোগান উঠছে, ‘মোল্লারা বিদায় নাও’। নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পহলভি এই আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। একদিকে রাজপথের জনজোয়ার আর অন্যদিকে মার্কিন সাঁজোয়া যানের উপস্থিতি— সব মিলিয়ে ইরানের ভাগ্য এখন ঝুলছে এক সুতোর ওপর। এরফান সোলতানি বেঁচে থাকলেন ঠিকই, কিন্তু খামেনেইর শাসনব্যবস্থা এই আগ্নেয়গিরির গ্রাস থেকে বাঁচতে পারবে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় তৈরি হয়েছে।



Post Comment