Suman De’s Blog : একাকার এপার-ওপার

Suman De’s Blog : একাকার এপার-ওপার


সুমন দে : ১৯৩৩ সালের মাঝামাঝি প্রফুল্ল কুমার সরকারের মাথায় এল যে আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে আলাদা একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা যদি প্রকাশ করা যায় । কিন্তু নামকরণ কে করবেন ? অনেক ভেবেচিন্তে ‘পরশুরাম‘ অর্থাৎ রাজশেখর বসুকে এই কাজের জন্য নির্বাচন করা হয়। প্রফুল্লবাবুর অনুরোধে রাজশেখর বসু এই নতুন পত্রিকার নামকরণ করলেন – “দেশ”। ১৯৩৩ সালের ২৪শে নভেম্বর জন্ম নিল বাংলা সাহিত্যের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা – ‘দেশ‘। আমাদের প্রজন্মের বেড়ে ওঠার সঙ্গেও এই পত্রিকা ভীষণভাবে জড়িয়ে আছে । সেই ‘দেশ‘ পত্রিকায় বাংলাদেশ নিয়ে আমার একটি লেখা অন্যতম প্রচ্ছদকাহিনী হিসেবে গতবছরের ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়েছিল। টেলিভিশনে বিস্তারিত আলোচনার খুব একটা সুযোগ থাকে না বলে বহু কথাই অডিও-ভিসুয়াল মাধ্যমে বলা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ‘দেশ‘ আমাকে সেই সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। তারপর গঙ্গা এবং পদ্মা দিয়ে বহু গ্যালন জল গড়িয়ে গেছে , কিন্তু কিছু বিশ্লেষণ বোধহয় এখনও প্রাসঙ্গিক লাগতে পারে।

“দ্বেষ, দেশ ও রাজ্য “

‘হরপ্রসাদদাদা, গ্রাম ছাড়ার সময়ে তুমি যে বলেছিলে আমরা নতুন বাড়িতে যাচ্ছি, এটাই কি সেই নতুন বাড়ি ?’–ছোট্ট সীতা অবাক চোখে জিজ্ঞেস করছে পাবনা থেকে সদ্য কলকাতার ‘নবজীবন কলোনি’-তে কোনওরকমে মাথা গুঁজতে পারা ছিন্নমূল দাদার বন্ধুকে। ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখা-র ছোট্ট সীতার সেই সরল প্রশ্নটাই যেন যুগ যুগ ধরে কানাগলিতে ঘুরে, প্রেক্ষিত পাল্টে পাল্টে চিরস্থায়ী ভৃগুচিহ্ন এঁকে দিয়েছে ইতিহাসলাঞ্ছিত এক জাতির বুকে। সময়ের ঘাত-প্রতিঘাতে উত্তাল জলরাশির ওপর ডিঙিনৌকার মতোই, কখনও ভেসে-কখনও ডুবে, এই মুহূর্তে আবার এক-সমুদ্র অনিশ্চয়তার মধ্যে এনে ফেলেছে বহুধাবিভক্ত বাঙালিকে।

আবার ভিটে হারানোর আশঙ্কা আর ছোট্ট সীতাদের নতুন বাড়ি খোঁজার অনিশ্চয়তার নামই আজকের বাংলাদেশ। আর এই মুহূর্তে সেই অনিশ্চয়তা, অগ্নিগর্ভ লাভার মতোই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের রাজ্যের ২২১৭ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত ধরে। কখনও কোচবিহার, কখনও জলপাইগুড়ির বেরুবাড়ি সীমান্তে জ়িরো পয়েন্টে ভারতে আসার সুযোগের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি। বিএসএফ-এর উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ারের আইজি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছেন, সীমান্তের এ পারে আসতে মরিয়া বাংলাদেশি জনস্রোতের চাপ ক্রমেই বেড়ে চলেছে ! অর্থাৎ, ওপারের পরিস্থিতি এমনই যে, হেমন্তর শিশিরমাখা ভোরে, কুবোপাখির অক্লান্ত ডাক আর হিজল, সুপারি, বাঁশ ঘেরা ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়’-টিকে এক কথায় ছেড়ে প্রাণভয়ে কিছু শিকড়-উৎপাটিত ধুলোমাখা মানুষ, চরম অসহায়তায় ছেঁড়া কাঁথা, শতচ্ছিন্ন ন্যাকড়া-বাঁধা বোচকা-বুঁচকি ঘাড়ে-মাথায় নিয়ে পড়শি দেশের একই ভাষায় কথা বলা পড়শি রাজ্যটির দরজায় করাঘাত করছে। ঠিক যেমন বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ থেকে ৭৭ বছর বয়সি বাবা, স্ত্রী, দুই ভাই আর পাঁচটা শিশুসন্তান নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে এ দেশে চলে আসা শঙ্কর সরকার গ্রেফতার হওয়ার পর থানায় বসে চিৎকার করে বলছিলেন, “মরতে হলে ভারতের মাটিতে মরব।” এই প্রজন্মটা বাপ-দাদার কাছে শুনছে, আজ থেকে ৫৪ বছর আগে এই দেশ তাদেরই মতো ৯৮ লক্ষ ৯৯ হাজার ৩০৫ জনকে আশ্রয় দিয়েছিল। ৭টা রাজ্যে ৮২৫টা ক্যাম্প তৈরি হয়েছিল তাদের জন্য। ইন্দিরা গান্ধী নামে একজন ছুটে এসেছিলেন বনগাঁর ক্যাম্পে। প্রতিদিন তাদের পূর্বপুরুষদের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল ৩০০ গ্রাম চাল, ১০০ গ্রাম আটা, ১০০ গ্রাম ডাল, ২৫ গ্রাম ভোজ্য তেল, ২৫ গ্রাম চিনি, মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট, কলেরা ভ্যাকসিন আর অনেকটা আত্মবিশ্বাস। সেই বিশ্বাস যে, ও দেশের অসহায় হাতটা ধরার জন্য অনেকগুলো হাত এ দেশে বাড়ানো আছে। সেই বিশ্বাসের বোধটা যেন বরাবর বলেছিল, ‘দু’জনে বাঙালি ছিলাম, দেখরে কী কাণ্ডখান/ তুমি এখন বাংলাদেশী, আমারে কও ইন্ডিয়ান !’ এই উথাল-পাথাল আবেগ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম আর সর্বোপরি, ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভৌগোলিক মানচিত্রের বদলে যাওয়া চুয়ান্ন বছর আগেও ভারতীয় রাজনীতিতে ও রাজ্যে রাজ্যে দীর্ঘ ছায়া ফেলেছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে তো বটেই, দলের মধ্যেও কামরাজ, নিজলিঙ্গাপ্পা, মোরারজি দেশাই, সঞ্জীব রেড্ডিদের ‘সিন্ডিকেট কংগ্রেস’-কে কার্যত দুরমুশ করে ১৯৭১-এর সাধারণ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর অনুগামীরা বিপুল জয় পেয়েছিলেন। আজ, চুয়ান্ন বছর পর, পড়শি রাষ্ট্রের যাবতীয় অনিশ্চয়তা কি এই দেশ আর এই রাজ্যকে আর-একটা রাজনৈতিক যুগসন্ধিক্ষণে এসে দাঁড় করিয়েছে? প্রতিবেশীর ‘হাত ধরার ভরসা’ কি কালের নিয়মে ২০২৪-এ এসে এখন দ্রুত ‘ভোট টানার ভরসা’-র অঙ্কে পাল্টে যাচ্ছে? এই ঘটমান বর্তমানে রাজ্য-রাজনীতির চৌষট্টি খোপে, এই মুহূর্তে তো দেড়েকষে সেই হিসেবনিকেশই চলছে।

রাজ্যের হিসেবে আসার আগে একবার দিল্লির হিসেবে ঢোকা যাক। এই হিসেবের একইসঙ্গে একটা সহজ এবং একটা জটিল দিক রয়েছে। সহজ সমীকরণটি বলছে, সীমান্তের ও পারে মুসলিম মৌলবাদী শক্তি যত তার দাঁত-নখ বের করবে, যত আজকের বাংলাদেশের ওপর পাকিস্তানি কিংবা তালিবানি ছাপ সৃষ্ট হবে, তত সমানুপাতিক ভাবে হিন্দু-রাষ্ট্রবাদী ভাবধারা শক্তিসঞ্চয় করবে এবং তাতে রাজনৈতিক ভাবে সরাসরি বিজেপির লাভ হবে। জটিলতর হিসেবটি কিন্তু গৈরিক বলয়ের অভ্যন্তরীণ সমীকরণের নিরিখে। এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশ ইসুতে দৃশ্যত মোদী সরকারের সক্রিয়তা এবং প্রত্যাশিত আগ্রাসী কূটনীতির অভাবে হতাশ আরএসএস এবং অন্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি ইতিমধ্যেই সরাসরি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানাতে শুরু করেছে। নজিরবিহীন ভাবে হিন্দুত্ববাদী নেতারা ১৯৭১-এর ইন্দিরা গান্ধীর তুলনা টেনে, মোদী সরকারের আপাত-নিষ্ক্রিয়তাকে কটাক্ষ করে বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতনের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোরতম পদক্ষেপের দাবি তুলছেন নিয়মিত! কট্টর হিন্দুত্ববাদী একাধিক নেতা তো ইতিমধ্যেই গত এক দশকে মোদী সরকারের আমলের কূটনৈতিক ব্যর্থতাকেও তুলে ধরছেন এই সুযোগে। প্রকাশ্যে বলছেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চিন আর পাকিস্তান তো ‘চিরশত্রু’ ছিলই, কিন্তু নেপাল, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা আর এখন ‘বন্ধু’ বাংলাদেশের সঙ্গে বৈরিতা, ভারতকে স্পষ্টত একঘরে করে দিয়েছে। লক্ষণীয়, অন্দরমহল থেকেই এই সমালোচনার ধার বাংলাদেশ-পরবর্তী সময়ে প্রায় বিরোধীদের ছুঁয়ে ফেলেছে।

এবার আসি রাজ্যের হিসেবে। অনেকের শুনতে খারাপ লাগলেও, বঙ্গ রাজনীতির বেশির ভাগটা এখন ধর্মীয় মেরুকরণসর্বস্ব। আর জি কর-উত্তর উপনির্বাচনে জয়ের ‘ছক্কা’ হাঁকিয়ে শাসক তৃণমূল আত্মবিশ্বাসী। বাইরের বিরোধীদের থেকে কিঞ্চিৎ বেশি মনোযোগী ভিতরের উচ্চাভিলাষ দমনে। কিন্তু বাংলাদেশ ইস্যু রাজ্যের শাসকের পক্ষে ক্রমশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। যে ভাবে প্রধান বিরোধী দল সাধুসন্তদের সামনে রেখে রোজই রাজপথে নামছে, তার আঁচ শহরের পাশাপাশি গ্রামেও বিস্তর পড়ছে, বিশেষত এই রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয়। অথচ এ রাজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটের প্রায় পুরোটাই ভরসা রাখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর। কাজেই ওয়াকফ ইস্যু নিয়ে ঝাঁপাতে স্বচ্ছন্দ তৃণমূলের পক্ষে খুল্লমখুল্লা শুধুমাত্র হিন্দুদের পক্ষে আন্দোলনে নামা কঠিন। তাই এক ধরনের ভারসাম্যের রাজনীতি করাই তৃণমূলের বাধ্যবাধকতা, তাতে যতই মুসলিম-তোষণের অভিযোগ উঠুক না কেন।

আর ঠিক এইখানেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মভূমিতে বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে প্রধান বিরোধী দল। শহরকেন্দ্রিক আর জি কর আন্দোলনে দাঁত ফোটাতে না-পারলেও বাংলাদেশে হিন্দু-নিগ্রহে সংখ্যাগরিষ্ঠদের আবেগ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে এ রাজ্যের গ্রামগঞ্জে। মূলত তিনটে কারণে এ রাজ্যে বিজেপির এই আকালেও ভবিষ্যতে আশার আলো দেখছেন দিল্লির নেতারা। প্রথম কারণ, ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে যে নিঃশব্দ ধর্মীয় মেরুকরণ হয়েছিল, তা প্রমাণ করে দিয়েছে, বাংলাতেও মেরুকরণ সম্ভব। উগ্র হিন্দুত্বের জিগির তুলে নন্দীগ্রাম আসনে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীকে হারিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর জয়, বঙ্গে মেরুকরণের বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ নিয়ে বিজেপির আশাবাদের দ্বিতীয় কারণটা হল সদ্যসমাপ্ত মহারাষ্ট্র ভোট। উন্নয়ন বা ‘সবকা বিকাশ’-এর পুরনো স্লোগান আলমারিতে তুলে রেখে সরাসরি হিন্দুত্বের তাস খেলে বিধানসভা ভোটে দুরন্ত কামব্যাক করেছে বিজেপি। বিরোধী শিবির যখন মরাঠা ভোট, ওবিসি ভোটে ভাগ বসাতে চাইছে, তখন স্রেফ হিন্দু ভোটকে এককাট্টা করতে মহারাষ্ট্রে–‘বাটেঙ্গে তো কাটেঙ্গে’ কিংবা ‘এক হ্যায় তো সেফ হ্যায়’-এর স্লোগান সটান দেবেন্দ্র ফডনবীশকে রাজ্যের তখত-এ বসিয়েছে। এবার আসি তৃতীয় কারণে। বিজেপির দিল্লির থিঙ্ক-ট্যাঙ্কদের কাছে এ রাজ্য নিয়ে আশার বাতিটা জ্বেলেছে পশ্চিমবঙ্গের মতোই আর-এক বাংলাদেশ-ঘেঁষা রাজ্য অসম। ১৯৫১ সালে যে-অসমে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ১২ শতাংশ, এখন তা পশ্চিমবঙ্গের ৩০ শতাংশের থেকেও বেড়ে ৩৪.২ শতাংশ। আর সেটাই হিমন্ত বিশ্বশর্মাদের মেরুকরণের রাজনীতিকে পরপর দু’বার ডিভিডেন্ড দিয়ে রাজ্যের শাসনক্ষমতায় বসিয়েছে। কাজেই কেন্দ্রের শাসকদের যুক্তিমতো অসমে অনায়াসে গেরুয়া-শাসন সম্ভব হলে, পশ্চিমবঙ্গে নয় কেন? তবে বাংলা নিয়ে প্রবল আশাবাদী এই অংশকেও মানতে হবে, এ রাজ্যে ভোট হয় সংগঠনের জোরে। আর বুথস্তর-সংগঠনে এখনও রাজ্য বিজেপির কপালে পাসমার্কও জোটা কষ্টকর। তা ছাড়া শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির একটা অংশ আজও বিজেপি দলটাকে হৃদকমলে ঠাঁই দিতে পারেনি, খুব সম্প্রতি আর জি কর-কাণ্ড আর-একবার তা প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের হিন্দু-নিগ্রহ ইসু নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগ কি শেষ পর্যন্ত পারবে এ রাজ্যে বহিরাগত ‘তকমা’ ঘুচিয়ে বিজেপির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে? প্রশ্নটা সেখানেই।

তবে যা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই, তা হল, বঙ্গ রাজনীতির এই দ্বিমেরুকরণে আপাত ভাবে আরও দুই রাজনৈতিক শক্তির আরও কিছুটা প্রান্তিক হয়ে পড়া। প্রথমে আসি বামেদের প্রসঙ্গে। প্রবল বামবিরোধীদেরও মানতে হবে, বাংলাদেশ ইসুতে রাস্তায় নামতে বামেদের বিভিন্ন গণসংগঠন অন্তত দেরি করেনি। তবে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু-নিগ্রহের প্রতিবাদের সঙ্গে, ভারতের সংখ্যালঘু (উত্তর প্রদেশের মহম্মদ আখলাখ, রাজস্থানের পেহলু খান), এমনকি প্যালেস্টাইন, গাজ়া-ভূখণ্ড জুড়ে গোটা বিষয়টাকে একটা আগমার্কা বামপন্থী আন্তর্জাতিকতাবাদের মোড়ক দেওয়া হচ্ছে রাজপথের বেশির ভাগ মিছিলে। ছিন্নমূল মানুষের কলোনি এলাকার ভোট যে কত দ্রুত হিন্দুত্ববাদীদের কব্জায় যেতে পারে, ১৯৯৮ আর ১৯৯৯-এর লোকসভা ভোটে তৎকালীন বামদুর্গ দমদম কেন্দ্রের তপন সিকদারের জয় চোখে আঙুল দিয়ে রাজ্যবাসীকে দেখিয়ে দিয়েছিল। বামেরা সম্ভবত আজও সেই শিক্ষা ভোলেনি বলেই, উপনির্বাচনে জামানত জব্দ হওয়া সত্ত্বেও পড়শি রাষ্ট্রের ঘটনা নিয়ে রাস্তায় নামতে আর দেরি করেনি। অতি-সীমিত শক্তি নিয়েও অবশ্য রাজপথে নামতে দেরি করেনি প্রদেশ কংগ্রেসও। কিন্তু এই চূড়ান্ত মেরুকরণের বাজারে তার প্রভাব বোঝাতে একটা উদাহরণই যথেষ্ট। প্রায় সকলের আগে প্রদেশ কংগ্রেসের নতুন সভাপতি শুভঙ্কর সরকার পৌঁছে গেছিলেন বাংলাদেশে ধর্মীয় কারণে আক্রান্ত বেলঘরিয়ার যুবক বন্ধু সায়ন ঘোষের বাড়ি। আর পরের দিনই সায়নকে দেখা গেল রানি রাসমণি রোডের সাধুসন্তদের সভায় গেরুয়া উত্তরীয় কাঁধে অগ্নিবর্ষী ভাষণ দিতে। গোটা দর্শকমণ্ডলীকে হতবাক করে দিয়ে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সটান মঞ্চের ওপর তাঁর অর্ধেক বয়সি সায়নকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন। এই মুহূর্তে অতি-উচ্চগ্রামে বাঁধা মেরুকরণের রাজনীতির সঙ্গে যেন যোগ্য প্রতীকী সঙ্গত করল এ ছবি! বঙ্গরাজনীতির অচেনা বাঁক সন্দেহ নেই।

ইতিহাস সাক্ষী, চেনা প্রতিবেশীর দিক থেকে অচেনা আঘাত নেমে এসেছে বারবার। যখনই বাংলাদেশ অশান্ত হয়েছে, তার আঁচ এসে পড়েছে আমাদের রাজ্যে। ২০০১ সাল থেকেই বিভিন্ন ভারত-বিরোধী শক্তির আখড়া হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। ভারত সরকারের গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই সময়ে ঢাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। এমনকি, উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক জঙ্গিগোষ্ঠী তাদের বেস সরিয়ে নিয়ে যায় ঢাকায়। খাদিমকর্তা অপহরণের অন্যতম মূল চক্রী মহম্মদ জালালুদ্দিন ওরফে বাবুভাই জেরায় কবুল করে, বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে আসা টাকা ও প্রায় ১০০ কেজি বিস্ফোরক সে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। তার জেরাতেই উঠে আসে, গত শতকের নয়ের দশক থেকে লস্কর-এ-তৈবা ও হুজি পশ্চিমবঙ্গে স্লিপার সেল গড়ে তুলেছে। সে স্পষ্ট কবুল করেছিল, সমস্ত স্লিপার সেলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় পশ্চিমবঙ্গেরগুলোই, যাদের মূল কাজ বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে আসা টাকা, বিস্ফোরক, এমনকি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গিদের ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছোতে সাহায্য করা। ২০১৪-র ২ অক্টোবর বর্ধমানে খাগড়াগড় বিস্ফোরণের এনআইএ তদন্তেও পরিষ্কার উঠে এসেছিল যে, বাংলাদেশের জঙ্গিগোষ্ঠী জামাত-উল-মুজাহিদিন বা জেএমবি এই রাজ্যে কতটা সক্রিয়। কাজেই এখন বাংলাদেশের কারা অধিদফতরের প্রধান এবং কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহের হোসেন যখন নৈর্ব্যক্তিক মুখে এবং ততোধিক উদাসীন কণ্ঠে তথ্য দিচ্ছিলেন যে, তাঁদেরই পরিভাষায় ১১ জন ‘শীর্ষ-সন্ত্রাসী’-কে তাঁরা এই ক’দিনে মুক্তি দিয়েছেন এবং অন্তত ৭০ জন জঙ্গি জেল-ভেঙে এখনও পলাতক, তখন প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং রাজ্য হিসেবে উদ্বেগ হয় বইকি। সবচেয়ে বড় কথা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে পড়শি রাষ্ট্রের গত কয়েক মাসের এই উদাসীনতা নিঃসন্দেহে অচেনা। অচেনা আজ অনেক কিছুই। রাতারাতি অচেনা।

পদ্মাপারে রবীন্দ্রনাথের ‘কুঠিবাড়ি’ ছিল কুষ্টিয়া জেলাশহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে। জমিদারি পরিচালনার পাশাপাশি এই কুঠিবাড়ি আর পদ্মবোটে বসেই কবিগুরু লিখেছিলেন সোনার তরী, চিরকুমার সভা, চিত্রাঙ্গদা কিংবা ‘নষ্টনীড়’-এর মতো চিরকালীন সাহিত্যসম্ভার। কুষ্টিয়ার এই বাড়িতে বসেই গীতাঞ্জলি-র একটি বড় অংশও লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আজ সেই কুষ্টিয়া আবার শিরোনামে। কুষ্টিয়া জেল ভেঙে ১৫জন কারারক্ষীকে গুরুতর জখম করে ৪০জন কয়েদি পলাতক! এদের বেশির ভাগই জঙ্গি।

এই কুষ্টিয়াতেই আজও মাটির নীচে শুয়ে আছেন তিনি। লালন ফকির। রাজনীতির সঙ্গে ধর্ম মিলে মানুষকে মানুষের কাছ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে যখন, তখন আর-একবার এই কুষ্টিয়ার আখড়ায় বসে লেখা তাঁর অমোঘ শব্দগুলো ধাক্কা দিক আমাদের–

আসবার কালে কী জাত ছিলে
তুমি কী জাত নিলে 
কী জাত হবা যাবার কালে
সেই কথা ভেবে বলো না।

——–

‘দেশ‘ পত্রিকার লেখাটি এখানেই শেষ হচ্ছে। কিন্তু আবার বলছি, তারপর গঙ্গা এবং পদ্মা দিয়ে বহু গ্যালন জল গড়িয়ে গেছে… একদিকে বাংলাদেশে হিন্দু-নিগ্রহের ঘটনা নিঃসন্দেহে কমেছে এবং ইদানিং আর সেসব উদ্বেগজনক শিরোনাম দেখা যায় না-মানতেই হবে। আবার অন্যদিকে, পুরনো সৌভ্রাতৃত্বে সেইসব ছবি, যেমন দুর্গাপুজোর বিসর্জনের দিন টাকিতে, ইছামতির মোহনায় সারি দিয়ে দু’পারের নৌকোর একসঙ্গে ভাসানের যে চমৎকার ছবি দশকের পর দশক আমরা কভার করেছি, এ বছর সেই ছবি যেন কোন জাদু মন্ত্রে উধাও হয়ে গেছে! পরিস্থিতি যে আগের মতো নেই তা যেন চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে বিসর্জনের এই রাতারাতি পাল্টে যাওয়া ছবিটা! 

আজ ভাইফোঁটার দিনে এই লেখার সঙ্গে ভিডিওটা দিলাম আসলে একটা স্পষ্ট স্বপ্ন দেখতে চেয়ে। নিকটতম প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌভ্রাতৃত্বের, বন্ধুত্বের, নির্ভরতার যে স্বপ্নটা কিছুদিন আগেও এতটা দূরের ছিল না। বাংলাদেশের মানুষ নিশ্চয়ই বুঝছেন যে ভারতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানোর পেছনে আছে একেবারে স্পষ্ট সংকীর্ণ রাজনীতি। সে দেশের কিছু রাজনীতিবিদের নিখুঁত পরিকল্পনা। আসলে উগ্র ভারত-বিরোধিতার আগুন না জ্বালালে যে রাজনীতির রুটি সেঁকা যায় না! তাঁরা ভুলে যান যে শাড়ি পোড়ানো যায়, ইতিহাস নয়। যে আগুন তাঁরা জ্বালাতে চেয়েছিলেন, সেই আগুন কিন্তু কোনও রং, কোনও ধর্ম, কোনও সম্প্রদায় দেখে না। হিংসার আগুন সর্বগ্রাসী। ইতিহাস সাক্ষী, দেশ-কাল ভেদে, ধর্মান্ধতার আগুনে পোড়ে শুধু মানবতা…

তবে গভীরভাবে বিশ্বাস করি, একদিন নিশ্চয়ই শুভবুদ্ধির উদয় হবে আর সেই প্রক্রিয়া কেন জানিনা মনে হচ্ছে, ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। তাই ভাইফোঁটার দিনে বাংলাদেশের সমস্ত ভাই-বোনেদের জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইল। আর হ্যাঁ, কবীর রিজভী সাহেবের জন্য তো বটেই।

 

আরও পড়ুন – Suman De’s Blog : ফিরে আসছি বিরতির পর …

মতামত লেখকের নিজস্ব।

Post Comment

You May Have Missed