চন্দননগরে উৎসবের আবহ, ফরাসি রেজিস্ট্রি ভবন সংস্কারে বড় উদ্যোগ রাজ্যের… আলোয় সেজেছে আলোর শহর
ফরাসি রেজিস্ট্রি ভবন সংস্কারের সূচনা উপলক্ষে উৎসবের চেহারা নেয় চন্দননগর। আলোকসজ্জায় সাজিয়ে তোলা হয় চন্দননগর স্ট্যান্ড রোড। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত থিয়েরি মাতু, রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ, প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার, চন্দননগরের বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ, বিধায়ক স্বরাজ ঘোষ, বিধায়ক দিলীপ সিং, হুগলির জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদরি-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
গঙ্গাবক্ষে জলপথে চন্দননগরে পৌঁছন ফরাসি রাষ্ট্রদূত। এরপর রানিঘাটের কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক ফরাসি রেজিস্ট্রি ভবন সংস্কারের কাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন তিনি। পরে চন্দননগরের ফরাসি কবরস্থান, মিউজিয়াম-সহ একাধিক ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখেন রাষ্ট্রদূত। অনুষ্ঠানের ফাঁকে পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের সঙ্গে ফুচকাও খান তিনি।
চন্দননগর মহকুমা শাসকের দফতরের উল্টোদিকে অবস্থিত এই ফরাসি রেজিস্ট্রি ভবন বর্তমানে কার্যত ভগ্নপ্রায়। ভবনটিকে ঘিরে গজিয়ে উঠেছে বট, অশ্বত্থ-সহ একাধিক গাছ। দীর্ঘদিনের অযত্নে ইট খসে পড়েছে, বিবর্ণ হয়েছে ভবনের চেহারা। তবে এখনও দূর থেকে চোখে পড়ে প্রাচীন নির্মাণশৈলী এবং ফরাসি স্থাপত্যের ছাপ। জানা যায়, ১৮৭৫ সালে নির্মিত এই ভবন একসময় চন্দননগরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল। জমি জরিপ ও নথিভুক্তিকরণের পাশাপাশি বিবাহের শংসাপত্রও এখান থেকে দেওয়া হত। ভবনে আদালতও বসত। সময়ের সঙ্গে সেই সবই অতীত হয়েছে।
২০১৭ সালে ভবনটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করে রাজ্য সরকার। এরপর ঐতিহাসিক ভবনটিকে তার পুরনো চেহারায় ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় পর এবার সেই সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগোল রাজ্য। ফরাসি রেজিস্ট্রি ভবন সংস্কারকে কেন্দ্র করে ১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর চন্দননগরে একাধিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। জগদ্ধাত্রী পুজোর আগেই গঙ্গার পাড়ের ঐতিহাসিক ফরাসডাঙায় শুরু হয়েছে উৎসবের আবহ।
সংস্কারের সূচনার পর ফরাসি মিউজিয়ামে সাংবাদিক বৈঠক করেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত থিয়েরি মাতু এবং পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ। ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, পর্যটনের সঙ্গে ব্যবসা, শিক্ষা, আর্থিক লেনদেন এবং কর্মসংস্থান সরাসরি যুক্ত। তাই পর্যটনকে কেন্দ্র করে ভারত ও ফ্রান্সের সম্পর্ক আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। বাংলায় ফরাসি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথাও জানান তিনি। চন্দননগরের একটি ঐতিহাসিক রেজিস্ট্রি ভবনের সংস্কার দিয়েই কাজ শেষ হবে না বলেও জানান রাষ্ট্রদূত। আগামী দিনে আরও একাধিক ক্ষেত্রে ভারত-ফ্রান্স সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তাঁর বক্তব্য। চন্দননগর স্ট্যান্ড রোডের আলোকসজ্জা এবং স্থানীয় মানুষের উৎসাহেও আপ্লুত হন তিনি।
ফরাসি ফুটবল দল বাংলায় খেলতে আসবে কি না, সেই প্রশ্নেরও জবাব দেন রাষ্ট্রদূত। বাংলায় ফুটবলের বিপুল জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বিষয়ে বাংলার মানুষের প্রত্যাশা পূরণের আশা রয়েছে।
এদিন পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ জানান, কলকাতা থেকে সরাসরি প্যারিসের বিমান যোগাযোগ না থাকায় পর্যটনের ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। আগামী দিনে সেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। বাংলায় ফরাসি ফুটবল দলকে খেলতে আনার বিষয়েও রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ ফরাসি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন বলে জানান তিনি। এর পাশাপাশি হুগলি নদীকে কেন্দ্র করে নতুন একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন সার্কিট তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। হুগলি নদীর তীরবর্তী একসময়কার ইউরোপীয় উপনিবেশগুলিকে একই পর্যটন মানচিত্রে আনার পরিকল্পনা রয়েছে রাজ্যের। এই সার্কিটে থাকবে বাঁশবেড়িয়া ও ব্যান্ডেলের পর্তুগিজ ঐতিহ্য, চুঁচুড়ার ডাচ উপনিবেশ, শ্রীরামপুরের ড্যানিশ কলোনি এবং চন্দননগরের ফরাসি ঐতিহ্য। বিশেষ করে ইউরোপীয় পর্যটকদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
হুগলি নদীকে কেন্দ্র করে ওয়াটারওয়ে-বেসড ট্যুরিজম গড়ে তোলারও পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ জলপথে একের পর এক ঐতিহাসিক শহর ঘুরে দেখার সুযোগ তৈরি করে হুগলির এই অঞ্চলকে একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে রাজ্য সরকার। পর্যটনমন্ত্রী বলেন, পর্যটনকে সামনে রেখে ভারত-ফ্রান্স সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি বাংলায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করতে চায় রাজ্য।
Post Comment