আইসিসির বড় চমক! ওয়ানডে ও টি২০ বিশ্বকাপের ফরম্যাটে আসছে বড় বদল

Cricket

-Ritesh Ghosh

বিশ্ব ক্রিকেটের আকর্ষণ বাড়াতে এবং প্রতিটি ম্যাচের রোমাঞ্চ নিশ্চিত করতে এক দূরদর্শী সংস্কারের ঘোষণা করল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। পুরুষদের ওয়ানডে এবং টি২০ বিশ্বকাপের ফরম্যাটে এই বড় ধরনের বদল আনা হয়েছে। এডিনবার্গে অনুষ্ঠিত আইসিসির বার্ষিক সাধারণ সভায় এই নতুন নকশা সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত হয়েছে। ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থার মূল লক্ষ্য হল টুর্নামেন্টগুলিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বাড়ানো এবং দর্শকদের প্রতিটি ম্যাচে টানটান উত্তেজনা উপহার দেওয়া।

আইসিসির প্রধান নির্বাহী কমিটির সুনির্দিষ্ট সুপারিশের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তগুলি চূড়ান্ত করা হয়েছে, যেখানে সদস্য ও সহযোগী দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। ওয়ানডে এবং টি২০ বিশ্বকাপের এই অভিনব রূপরেখা আগামী দিনে ক্রিকেট বিশ্বের সামগ্রিক চিত্রকে অনেকটাই বদলে দেবে। নতুন এই ফরম্যাটের ফলে গ্লোবাল টুর্নামেন্টগুলিতে একতরফা বা অপ্রয়োজনীয় ম্যাচের সংখ্যা একেবারে কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ICC reveals new 2026 World Cup tournament structure

একদিনের বিশ্বকাপে নতুন তিন স্তরের রোমাঞ্চ

আইসিসি পুরুষদের ওয়ানডে বিশ্বকাপে আগের মতোই ১৪টি দল অংশ নেবে। তবে প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব বাড়াতে এবার টুর্নামেন্টটিকে সম্পূর্ণ নতুন তিনটি স্তরে বিন্যস্ত করা হয়েছে। সহযোগী দেশ বা ক্রমতালিকায় তলানিতে থাকা শেষ তিনটি দল অর্থাৎ ১২, ১৩ এবং ১৪ নম্বর দলগুলিকে সরাসরি মেগা টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। তাদের প্রথমে একটি তিন দলীয় ‘সুপার সিরিজ’ খেলতে হবে, যেখান থেকে কেবল চ্যাম্পিয়ন দলটি মূল পর্বে যাবে।

এই বিজয়ী দলটি পরবর্তী গ্রুপ পর্বে বাকি ১১টি দলের সঙ্গে যোগ দেবে। এখানে ১২টি দলকে দুটি ভিন্ন গ্রুপে ভাগ করা হবে, যেখানে প্রতিটি গ্রুপে থাকবে ৬টি করে দল। গ্রুপ পর্বে প্রতিটি ম্যাচই নকআউটের মতো কঠিন হবে। কারণ, দুই গ্রুপের শীর্ষ তিনটি দলের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে চতুর্থ স্থানে থাকা সেরা পারফর্মার দল নতুন প্রবর্তিত ‘সুপার ৭’ স্তরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে।

সুপার ৭ পর্বে দলগুলি রাউন্ড-রবিন পদ্ধতিতে একে অপরের মুখোমুখি হবে। এই রাউন্ডের কঠিন বাধা পেরিয়ে শীর্ষ স্থানে থাকা সেরা চারটি দল সরাসরি প্রবেশ করবে সেমিফাইনাল পর্যায়ে। এরপর সেমিফাইনালের জয়ী দুটি দল ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে ফাইনালের মঞ্চে মুখোমুখি হবে। আইসিসির বিশ্বাস, প্রথম দিন থেকেই এই নতুন পদ্ধতি দলগুলির মধ্যে জয়ের মানসিকতা বাড়িয়ে তুলবে।

ধাপ বিন্যাস ও নিয়ম যোগ্যতা অর্জনের শর্ত
ধাপ ১: সুপার সিরিজ ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ব়্যাঙ্কিংয়ের দলের মধ্যে রাউন্ড-রবিন লড়াই চ্যাম্পিয়ন দলটি মূল টুর্নামেন্টে যাবে
ধাপ ২: গ্রুপ পর্ব ৬টি করে দল নিয়ে দুটি গ্রুপে ম্যাচ প্রতি গ্রুপের প্রথম ৩টি দল এবং সামগ্রিকভাবে সেরা চতুর্থ দল খেলবে সুপার ৭-এ
ধাপ ৩: সুপার ৭ সপ্ত দলের মধ্যে রাউন্ড-রবিন লিগ লড়াই সেরা ৪টি দল খেলবে সেমিফাইনালে
নকআউট সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল ম্যাচ সেমিফাইনালের দুই জয়ী দল খেলবে ফাইনাল

টি২০ বিশ্বকাপে সুপার ১০ এবং এলিমিনেটর রোমাঞ্চ

অন্যতম জনপ্রিয় সংস্করণ টি২০ বিশ্বকাপেও আইসিসি দল সংখ্যা আগের মতোই ২০টিতে সীমাবদ্ধ রেখেছে। তবে এই বিন্যাসের বড় রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় পর্বে। আগে ব্যবহৃত সুপার এইট পর্বকে বিদায় জানিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা এখন অভিনব ‘সুপার ১০’ পর্ব চালু করার বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে মূল টুর্নামেন্ট থেকে আরও বেশি সংখ্যক দল পরবর্তী ধাপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবে।

প্রাথমিক পর্বে এখন পাঁচটি গ্রুপে চারটি করে দল থাকবে, যা আগের চার গ্রুপে পাঁচটি দলের নিয়মকে স্থানান্তরিত করবে। এই পর্বের প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল সরাসরি সুপার ১০-এর টিকিট পাবে। তবে পূর্ববর্তী ফরম্যাটের মতো গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সরাসরি শেষ চারে খেলতে পারবে না। সুপার ১০-এ দুটি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন সরাসরি সেমিফাইনালে গেলেও, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে শেষ করা চার দল একে অপরের বিরুদ্ধে লড়বে ‘এলিমিনেটর’ ম্যাচে।

পর্যায় বিন্যাস পরবর্তী ধাপে যাওয়ার নিয়ম
গ্রুপ পর্ব ৪টি দল নিয়ে ৫টি গ্রুপে লিগ খেলা প্রতি গ্রুপ থেকে প্রথম দুটি দল যাবে সুপার ১০-এ
সুপার ১০ ৫টি দল নিয়ে দুটি পৃথক গ্রুপে লড়াই দুই গ্রুপের সেরা দল সরাসরি সেমিফাইনালে যাবে
এলিমিনেটর এক গ্রুপের দ্বিতীয় দল বনাম অন্য গ্রুপের তৃতীয় দল জয়ী দল দুটি খেলবে সেমিফাইনালে
নকআউট সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল ম্যাচ সেমিফাইনালের দুই বিজয়ী দল খেলবে ফাইনাল

আঞ্চলিক দেশের জন্য যোগ্যতা অর্জনের পথ ও নতুন সুযোগ

টি২০ বিশ্বকাপের ফরম্যাট জটিলতা দূর করার উদ্যোগের পাশাপাশি আইসিসি ২০২৮ সালের বিশ্বকাপের জন্য একটি স্পষ্ট যোগ্যতা অর্জনের রোডম্যাপ নির্ধারণ করেছে। বিশেষ ক্রিকেটীয় পরিস্থিতির কারণে স্কটল্যান্ডকে সরাসরি ইউরোপের আঞ্চলিক ট্রায়ালের ফাইনালে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে যারা সরাসরি কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হবে, তারা সরাসরি খেলবে বিশ্ব বাছাইপর্ব নামের চূড়ান্ত লড়াইয়ে।

এই গ্লোবাল বাছাইপর্বের বাকি আটটি আসন নির্ধারণের জন্য আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশ থেকে ২টি করে দল এবং আমেরিকা ও পূর্ব এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে ১টি করে দল বিশ্ব বাছাইপর্বে লড়বে। এরপর ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ সাপেক্ষে এই টুর্নামেন্টের সেরা পারফর্মিং দলগুলি ২০২৮ সালের মেগা আসরে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা পাবে।

সহযোগী দেশগুলির ক্রিকেটের ভিত্তি ও দক্ষতা আরও শক্তিশালী করতে আইসিসি একটি নতুন ১৬ দলের গ্লোবাল টুর্নামেন্ট আয়োজনের প্রস্তাব পাশ করিয়েছে। এটি মূলত টি২০ বিশ্বকাপের ঠিক আগে একটি প্রয়োজনীয় টুর্নামেন্ট হিসেবে কাজ করবে, যা নতুনদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ সুগম করবে। ফিন্যান্স ও কমার্শিয়াল কমিটির পর্যালোচনার পর আগামী নভেম্বর মাসের সভায় প্রস্তাবটি চূড়ান্ত সবুজ সংকেত পেতে পারে।

আইসিসির এই সুদূরপ্রসারী সংস্কার বিশ্ব ক্রিকেটে এক নতুন যুগের সূচনা করবে। সুপার সিরিজ, সুপার ৭, সুপার ১০ এবং এলিমিনেটরের মতো প্রতিটি নাটকীয় সংযোজন ট্রফির লড়াইয়ের প্রতিটি মুহূর্তকে আরও কঠিন ও উপভোগ্য করে তুলবে। টুর্নামেন্টের একেবারে শেষ ধাপেও দলগুলির সমান সুযোগ বজায় থাকবে, যা ক্রিকেটপ্রেমীদের রোমাঞ্চের মাত্রা এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

Post Comment

You May Have Missed