আইফোনের ইএমআই থেকে বিভিন্ন লোন, কীভাবে ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে যাচ্ছে জেন-জি?

কলকাতা: ভারতের অর্থনীতি হু হু করে বদলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বদলাচ্ছে ক্রেতাদের চাহিদা ও তাদের মানসিকতা। সম্প্রতি আইফোনের EMI শোধ করা নিয়ে মহারাষ্ট্রের একটি পরিবারের ৩ সদস্যের মৃত্যুর ঘটনা শোরগোল ফেলে দিয়েছে নেট দুনিয়ায়। এই একই রকম খবর সামনে এসেছিল মে মাসেও। সেই সময় আইফোন কেনা নিয়ে স্বামীর সঙ্গে মারাত্মক ঝগড়া হয় হায়দরাবাদের এক ৪২ বছর বয়সী মহিলার। পরবর্তীতে আত্মঘাতী হয় ওই মহিলাও।

আপাত দৃষ্টিতে এই দুটি ঘটনায় আলাদা। কিন্তু এর পিছনে থাকা ঘটনা বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয়ই সামনে আসবে। সেটা হল ভারতের অর্থনীতির বদলের সঙ্গে ভারতীয়দের আর্থিক অবস্থার বাস্তবতা। আর সেই সঙ্গে একটি প্রশ্নও যেন ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। ভারতীয়দের উপার্জন ও খরচের মধ্যে ব্যবধান কতটা বাড়ছে? আর এই পুরো বিষয়টাই ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। যা বলছে, ভারতীয়রা বর্তমানে এমন কিছু জিনিস কেনার জন্য লোন নিচ্ছে যার মূল্য তাদের উপার্জনের থেকেও বেশি।

যে কোনও জিনিস কেনার ক্ষেত্রে সবার আগে দেখতে হবে, আদৌ সেই জিনিসটার কোনও প্রয়োজন আছে কি না। আর এই সামান্য নিয়মটাই মেনে নিতে চায় না আজকের প্রজন্ম। আজকের দিনে স্মার্ট ফোন ব্যবহারকারীদের একাংশের কাছে আইফোন বা কোনও প্রিমিয়াম স্মার্টফোন একটা স্টেটাস সিম্বলের মতো। আর সেই কারণেই স্মার্টফোন কেনার ক্ষেত্রে ইএমআইয়ের ব্যবহার বেড়েছে হু হু করে।

কিন্তু ইএমআই কি খারাপ? অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইএমআই খারাপ নয়। কিন্তু সেই ইএমআইকে সঠিক পথে ব্যবহার করতে না পারলে যিনি ইএমআই নিচ্ছেন, তাঁর কপালে দুর্গতি নাচছে। একটি হিসাব বলছে, ২০২৬ সালে ভারতে যে পরিমাণ স্মার্ট ফোন বিক্রি হতে চলেছে, তার প্রায় ৪২ শতাংশ কেন হবে ইএমআইতে। অন্যদিকে শুধুমাত্র প্রিমিয়াম স্মার্টফোন ধরলে, যেখানে আবার আইফোনের আধিপত্য বেশি; এই হিসাবটা গিয়ে দাঁড়ায় ৬৬ শতাংশের কাছে।

আরও একটা অবাক করে দেওয়ার মতো হিসাব রয়েছে। অন্য যে কোনও স্মার্ট ফোন যখন ইএমআইতে কেন হয়, তখন সেই লোন গড়ে ১০ মাসের মধ্যে শোধ হয়ে যায়। আর অ্যাপেলের আইফোনের ক্ষেত্রে সেটাই গিয়ে দাঁড়ায় ১৭ মাসের কিছু বেশি সময়ে। বেশিদিন ধরে কোনও ইএমআই দিতে হচ্ছে, এর মানে কিন্তু এটা নয় যে এতে ফোনটা আসলে সস্তা হতে গেল, এর ফলে আসলে যিনি ফোন কিনছেন, তিনি নিজের সাধ্যের বাইরের কোনও জিনিসকে কিনতে গিয়ে, তার মাসিক খরচ কমিয়ে লোন শোধ করার সময়কালকে দীর্ঘ করে ফেলছেন।

এর ফলে আগামীতে যে খরচ আসতে চলেছে, তার উপরও একটা চাপ তৈরি হয়। পিরিয়ডিক লেবার ফোর্সের সার্ভে অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে একজন চাকুরিজীবী ভারতীয়ের গড় উপার্জন ছিল মাসে ২০ হাজার ৭০০ টাকা। এমনকি আয়করের হিসাব দেখলেও বোঝা যায় প্রতি ১০০ জন বেতনভোগীর মধ্যে ১ জনেরও কম মাসে ১ লক্ষ টাকা বা তার বেশি উপার্জন করেন। আর এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ৭০ হাজার বা ৭৫ হাজার টাকার আইফোন কেনা দেশের সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরের কাজ।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ফাইন্যান্সিয়াল স্টেবিলিটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। আর সেই রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ভারতের পারিবারিক ঋণের পরিমাণ ছিল দেশের জিডিপির ৪১.৩ শতাংশ। তার ঠিক ৬ মাস পর, অর্থাৎ ২০২৬ সালের জুন মাসের এই রিপোর্ট বলছে পারিবারিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবে। তা মাত্র ৬ মাসে জিডিপির ৪৫.৫ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। এর মধ্যে নন-হাউজিং রিটেল লোন, পার্সোনাল লোন, ক্রেডিট কার্ড এবং কনজিউমার ডিউরেবল লোনের অংশ ক্রমশ বাড়ছে।

বর্তমানে জেন-জিও লোনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সিবিলের হিসাব বলছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন লোন যাঁরা নিয়েছেন, তাঁদের ৪১ শতাংশই জেন-জি। আর এদের একটা বড় অংশেরই প্রথম লোন কিন্তু বাড়ির জন্য বা গাড়ির জন্য লোন নয়, বরং তাঁরা ক্রেডিট কার্ড, পার্সোনাল লোন বা কনজিউমার ডিউরেবল লোন দিয়েই এই পথে যাত্রা শুরু করছেন।

আসলে এই মুহূর্তে ভারতের অর্থনীতির সামনে দুটো ছবি। আর দুটো ছবিই খুব স্পষ্ট। প্রথমত বর্তমানে ভারতের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল। কমেছে মোট ঋণ খেলাপির হারও। কিন্তু একই সঙ্গে এই পরিসংখ্যান এটাও দেখাচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ কিন্তু ভোগ্যপণ্যের জন্য ঋণের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তাই এই গল্প শুধুমাত্র আইফোনের ইএমআই বা পার্সোনাল লোনের ইন্সটলমেন্ট দেওয়ার নয়। আসলে এই মুহূর্তে দেশের পারিবারিক ঋণ সংস্কৃতি খাতায় কলমে মজবুত মনে হলেও বাস্তবে তার চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।

Previous post

দিঘার হোটেলগুলিতে ফায়ার সেফটি নিয়ে কড়া নজর, লাইসেন্সহীন হোটেল-গেস্ট হাউসের বিরুদ্ধে অভিযানের প্রস্তুতি

Next post

5 New Project in Bengal: আজ বাংলায় ৩৪০০ কোটির ৫ বড় প্রকল্পের উদ্বোধন, তৈরি হবে চাকরির সুযোগ—কী কী প্রকল্প?

Post Comment

You May Have Missed