রাজ্যে একযোগে বদলি ৩৩ জন আইপিএস, বড় রদবদল সিআইডি ও গোয়েন্দা বিভাগে
Kolkata
-Ritesh Ghosh
রাজ্য পুলিশ প্রশাসনে বড়সড় রদবদল ঘটাল নবান্ন। মঙ্গলবার রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতরের পক্ষ থেকে জারি করা এক নির্দেশিকায় একযোগে ৩৩ জন আইপিএস আধিকারিককে বদলি করা হয়েছে। এই রদবদলের তালিকায় যেমন রয়েছেন রাজ্য পুলিশের একাধিক শীর্ষস্তরের আধিকারিক, তেমনই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জোনের দায়িত্বেও আনা হয়েছে নতুন মুখ।
প্রকাশিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই রদবদলের সবচেয়ে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তটি হল রাজ্য গোয়েন্দা বিভাগের (সিআইডি) শীর্ষ পদে পরিবর্তন। সিআইডির এডিজি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে আইপিএস সুপ্রতিম সরকারকে। তাঁকে এডিজি, টেলিকমিউনিকেশনে পাঠানো হয়েছে। তাঁর জায়গায় রাজ্যের নতুন গোয়েন্দা প্রধান বা এডিজি সিআইডি করা হয়েছে নটরাজন রমেশবাবুকে, যিনি এতদিন রাজ্য কারা বিভাগের ডিজি পদে কর্মরত ছিলেন।

গুরুত্বপূর্ণ জোনের দায়িত্বে ব্যাপক রদবদল
শুধুমাত্র রাজ্য গোয়েন্দা বিভাগই বা সদর দফতর নয়, জেলা ও সমান্তরাল বড় জোনগুলির ক্ষেত্রেও রাজ্য স্বরাষ্ট্র বিভাগ বড়সড় পরিবর্তন এনেছে। উত্তরবঙ্গের মতো রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল জোন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এডিজি কে জয়রামনকে। অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ এই আধিকারিককে উত্তরবঙ্গের দায়িত্ব থেকে ডিরেক্টরেট অব ইকোনমিক অফেন্স বা রাজ্যের প্রধান আর্থিক দুর্নীতি দমন শাখার ডিরেক্টর করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের সীমান্ত নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার বহুমাত্রিক বিষয় সামলানোর পর তাঁর এই পোস্টিং বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
একইভাবে, জঙ্গলমহল ও ঝাড়খণ্ড সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলিকে নিয়ে গঠিত পশ্চিমাঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এডিজি বিশাল গর্গকেও পদ থেকে সরানো হয়েছে। তাঁর মতো মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত অভিজ্ঞ পুলিশ আধিকারিককে পশ্চিমাঞ্চলের গুরুদায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাজ্য গোয়েন্দা শাখা অর্থাৎ আইবি-তে স্থানান্তর করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের পর এখন তাঁর অভিজ্ঞতাকে রাজ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজে লাগানো হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজ্য পুলিশের বিশেষ কার্যনির্বাহী অঙ্গ তথা স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বা এসটিএফ-এর প্রশাসনিক পরিকাঠামোতেও আনা হয়েছে পরিবর্তন। অত্যন্ত সচকিত এবং গুরুত্বপূর্ণ এই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা আইজি প্রবীণ ত্রিপাঠিকে তাঁর বর্তমান পদ থেকে বদলি করা হয়েছে। জঙ্গি দমন এবং কুখ্যাত অপরাধচক্র নিষ্ক্রিয় করার কাজে বিশেষ পারদর্শী এই অফিসারকে সোজাসুজি হোমগার্ড বিভাগের আইজি পদে পাঠানো হয়েছে, যা পুলিশ মহলে কিছুটা অপ্রত্যাশিত বদলি হিসেবেই আলোচিত হচ্ছে।
এছাড়াও রাজ্য পুলিশের জেলা স্তরের বেশ কিছু পদে এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ আইপিএস আধিকারিকদের বদলির নির্দেশ জারি হয়েছে। রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতরের এই বদলি রুটিনমাফিক বলা হলেও, গোয়েন্দা বিভাগ, স্পেশাল টাস্ক ফোর্স ও সীমান্ত এলাকাগুলির বদলি নিশ্চিতভাবেই বর্তমান রাজ্য পরিস্থিতির নিরিখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এক নজরে শীর্ষ আইপিএস কর্তাদের নতুন দায়িত্ব
| আইপিএস আধিকারিক | পূর্বতন পদ | বর্তমান পদ |
|---|---|---|
| সুপ্রতিম সরকার | এডিজি, সিআইডি | এডিজি, টেলিকমিউনিকেশন |
| নটরাজন রমেশবাবু | ডিজি, কারা বিভাগ | এডিজি, সিআইডি |
| কে জয়রামন | এডিজি, উত্তরবঙ্গ | ডিরেক্টর, ইকোনমিক অফেন্স |
| বিশাল গর্গ | এডিজি, পশ্চিমাঞ্চল | এডিজি, আইবি |
| প্রবীণ ত্রিপাঠি | আইজি, এসটিএফ | আইজি, হোমগার্ড |
রাজ্য জুড়ে চলতে থাকা একাধিক মামলার তদন্তের গতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সিআইডি এবং গোয়েন্দা শাখার ভূমিকাকে সুনিশ্চিত করতে চায় নবান্ন। সেক্ষেত্রে এই বদল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ প্রশাসনের কাজে আরও বেশি স্বচ্ছতা এবং ক্ষিপ্রতা আনাও এই নতুন বিন্যাসের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।
নতুন গোয়েন্দা প্রধান ডিজি নটরাজন রমেশবাবুর পূর্বতন জেলা পুলিশিংয়ের এবং সংশোধনাগার দফতরের কাজের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কয়েদিদের পুনর্বাসন ও সংশোধনাগার দপ্তরে দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারি চালানোর পর, এবার তিনি রাজ্যের সবচেয়ে বড় তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি-র ভার হাতে নিচ্ছেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতা অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে এবং বহুমুখী অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে সিআইডি আধিকারিকদের সঠিক দিশা দেখাতে সাহায্য করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অপরদিকে, অভিজ্ঞ আইপিএস সুপ্রতিম সরকারের পোস্টিংও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সাইবার অপরাধ ও প্রযুক্তিগত অপব্যবহার এক বড় ঘটনা। এই অবস্থায় এডিজি টেলিকমিউনিকেশন পদের সুপ্রতিম সরকারের মতো একজন অভিজ্ঞ আধিকারিক এই বিভাগকে আরও ভালোভাবে সামলাতে পারবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
আর্থিক অপরাধ ক্রমবর্ধমান এবং জটিল রূপ নেওয়ায় ডিরেক্টরেট অব ইকোনমিক অফেন্সকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের। এই কারণেই কে জয়রামনকে এর শীর্ষ পদে নিয়ে আসা হয়েছে। জমি-বাড়ি জালিয়াতি, ব্যাঙ্ক প্রতারণা বা সরকারি তহবিলের অর্থ তছরুপের মতো জটিল অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে দক্ষ অফিসারদের কড়া নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী দিনে এই দপ্তরের অধীনে তদন্ত প্রক্রিয়া আরও নিখুঁত ও দ্রুত গতি পাবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
Post Comment