চোখে জল আর স্বপ্নভঙ্গের হতাশা নিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় মেসির

চোখে জল আর স্বপ্নভঙ্গের হতাশা নিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় মেসির

Football

-Ritesh Ghosh

নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের আকাশে তখন আতশবাজির রোশনাই। কিন্তু মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মহাতারকার চোখের কোণ বেয়ে তখন গড়িয়ে পড়ছিল জল। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্স-আপ হতে হল আর্জেন্টিনাকে। ৩৯ বছর বয়সে গলায় রুপোর পদক ঝুলিয়ে মাঠ ছাড়লেন লিওনেল মেসি। সম্ভবত এটিই ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা জাদুকরের জীবনের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।

দুই দশক আগে ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে যাঁর রাজকীয় অভিষেক ঘটেছিল, সেই নায়ক হয়তো নিজের শেষ বড় মঞ্চে আর একটি অলৌকিক রূপকথা লিখতে পারলেন না। ব্যাক-টু-ব্যাক বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামা আর্জেন্টিনা ফাইনালে স্পেনের কাছে প্রায় কোণঠাসা হয়ে ছিল। নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হাজির হওয়া প্রায় আশি হাজারেরও বেশি দর্শক এদিন মাঠ কাঁপাতে এসেছিলেন তাঁদের প্রিয় ‘ইশ্বরের’ বিশ্বজয় দেখার জন্য। কিন্তু শেষ হাসি হাসল তরতাজা স্পেন।

Lionel Messi emotional after losing 2026 World Cup final

পুরো নব্বই মিনিট গোলশূন্য থাকার পর খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয় দ্বিতীয়ার্ধের অতিরিক্ত সময়ের খেলা শুরু হওয়ার মাত্র ৩৭ সেকেন্ডের মাথায়। দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে আর্জেন্টিনার ডিফেন্স ভেঙে বল জালে জড়ান স্পেনের ফেরান তোরেস। এই একটি গোলই স্পেনের ফুটবল ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে আর একটি বিশ্বজয়ের আসনে বসাল। আর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মেসির ভক্তের হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

স্পেনের রণকৌশল ও মেসিকে বেঁধে রাখার কঠিন লড়াই

স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ম্যাচের শুরু থেকেই মেসির ক্ষিপ্রতা এবং পাসিং দক্ষতাকে স্তব্ধ করে দেওয়াই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন। ম্যাচের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, তাঁদের মূল পরিকল্পনাই ছিল মেসিকে যথাসম্ভব কম সুযোগ দেওয়া। মাঝমাঠে রদ্রিগোর নেতৃত্বাধীন স্প্যানিশ ডিফেন্স ও মিডফিল্ড প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল আলবিসেলেস্তেদের আক্রমণের পথে। মেসিকে তাঁরা মাঠে এক ইঞ্চি জমিও হাতবদল করতে দেননি।

পরিসংখ্যানও স্পেনের এই একচেটিয়া আধিপত্যকেই ফুটিয়ে তুলেছে। পুরো ম্যাচে স্প্যানিশ ব্রিগেড গোলে শট নিয়েছে ২০টি, যেখানে আর্জেন্টিনা নিতে পেরেছে মাত্র দুটি শট। তাও টার্গেটে কোনও শট নেই। স্পেনের নিখুঁত পাসিং ফুটবল আর্জেন্টিনাকে নিজেদের অর্ধেই আটকে রেখেছিল প্রায় পুরো সময়।

মেসি এই ম্যাচে নিজেকে মেলে ধরার কোনও সুযোগই পাননি। সারা ম্যাচে তাঁর পা স্পর্শ করেছে মাত্র ৫৪ বার, যার মধ্যে প্রথম অর্ধে ছিল সাকুল্যে ১৫ বার। স্পেনের রক্ষণভাগ মেসিকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছিল, যার ফলে তিনি আক্রমণের মতো সঠিক জায়গা তৈরি করতে ব্যর্থ হন। সালিকাদের সাহায্য করা বা বিপজ্জনক পাসের ফুলঝুরি ফোটানোর যে খেলা মেসি খেলে অভ্যস্ত, তা এদিন তাঁর পা থেকে দেখতে পাওয়া যায়নি।

আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি তাঁর প্রিয় শিষ্যের এই বিদায়ে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে কান্নাভেজা গলায় তিনি বলেন, “আমি আশা করি বিশ্বের প্রতিটি মানুষ ওঁর জন্য অত্যন্ত গর্ববোধ করেন। ফুটবল মাঠে পা রাখা ইতিহাসের সেরা এবং অনন্য প্রতিভা হলেন মেসি।” স্কালোনির এই স্বীকারোক্তি মেটলাইফ স্টেডিয়ামের গ্যালারিকে আরও একবার নস্টালজিক করে তুলেছিল।

রুপোলি ট্র্যাজেডির আড়ালে মেসির অলৌকিক অধ্যায়

তিন বছর আগে যখন লিওনেল মেসি বার্সেলোনা ও প্যারিস সাঁ জাঁ ছেড়ে আমেরিকার মেজর লিগ সকারের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন, তখন ইউরোপের অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞই ভেবেছিলেন জাদুকরের সূর্য এবার অস্তমিত হতে চলেছে। কিন্তু সমস্ত সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে এই বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে মেসি তাঁর নেতৃত্বগুণ এবং জাদুকরি পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে নিয়ে যান। টুর্নামেন্টে তাঁর পা থেকে এসেছে ৮টি গোল এবং ৪টি চমৎকার অ্যাসিস্ট।

ফাইনালে হারের ট্র্যাজেডি বাদ দিলে টুর্নামেন্ট জুড়ে মেসির অবদান আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে জোড়া সুযোগ তৈরি করে ম্যাচ জেতানো কিংবা মিশরের বিরুদ্ধে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়া ম্যাচে নিজে এগিয়ে এসে সমতা ফেরানো— মেসি একাই পুরো দলের বোঝা নিজের কাঁধে বহন করেছিলেন। তিনি মাঠে যুবকদের মতো বেশি না দৌড়ালেও প্রতি ম্যাচে গড়ে মাত্র ৫ কিলোমিটার হেঁটে এবং সঠিক সময়ে জ্বলে ওঠার অনন্য কৌশল ব্যবহার করেছিলেন।

জাতীয় দলের জার্সিতে ১২৫টি আন্তর্জাতিক ফুটবল গোল নিয়ে মেসি বর্তমানে ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা, যেখানে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ১৪৬টি গোল নিয়ে এখনও শীর্ষে রয়েছেন। যদিও তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফরাসি স্ট্রাইকার কিলিয়ান এমবাপে জোড়া গোল করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মেসির ২১টি বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড ভেঙে ২২-এ পৌঁছে যান, তবুও মেসির অর্জনকে ছোট করার ক্ষমতা কারও নেই। তাছাড়া ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার অসামান্য নজির তো রইলই।

ব্যথাতুর বিদায় বনাম কালজয়ী মহিমা

মেসির রাজত্বের ঝুলিতে কী নেই? ২০২২ সালের সোনার বিশ্বকাপ, পরপর দুটি কোপা আমেরিকা খেতাব, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ৪টি সোনালি ট্রফি, বার্সেলোনা এবং প্যারিস সাঁ জাঁ-র হয়ে ১২টি ঘরোয়া লিগ শিরোপা। আর বিশ্বের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে আটটি ব্যালন ডি’অর জয়ের ইতিহাস তাঁকে ইতিমধ্যেই পেলে এবং দিয়েগো মারাদোনার মতো মিথের পাশে বসিয়ে দিয়েছে। ফলে নিউ জার্সির এক রাতের কান্না তাঁর অমর সৃষ্টিকে মলিন করতে পারবে না।

খেলার শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠের এক অভূতপূর্ব দৃশ্য সকলের নজর কাড়ে। স্পেনের তরুণ ও অভিজ্ঞ সব ফুটবলার নিজেদের জয়োল্লাস থামিয়ে মেসিকে এসে সান্ত্বনা জানাচ্ছিলেন ও জড়িয়ে ধরছিলেন। স্প্যানিশ দল যখন রানার্স-আপ আর্জেন্টিনাকে অভিনন্দন জানাতে ‘গার্ড অব অনার’ দিচ্ছিল, তখন মেসি কান্না আড়াল করে নম্র হাসি হাসার ব্যর্থ চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তাঁর বিষণ্ণ মুখাবয়ব বুঝিয়ে দিচ্ছিল পরাজয়ের যন্ত্রণা কতটা তীব্র ছিল।

এই রাত হয়তো লিওনেল মেসির কল্পিত কোনও রূপকথার অবসান ছিল না, কিংবা হয়তো এটিই তাঁর খেলোয়াড় জীবনের একদম শেষ ম্যাচ নয়। তিনি কবে ফুটবল বুট জোড়া তুলে রাখবেন, তা কেবল তিনিই সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে বিশ্বমঞ্চের শেষ ছবিতে যদি মেসির দু’চোখ ভেজা জলই থেকে যায়, তবুও ভক্তরা চিরকাল মনে রাখবেন যে তাঁরা এমন এক ফুটবল দেবতাকে মাঠে খেলতে দেখেছেন, যাঁর সমকক্ষ আগামী বহু যুগেও খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।

Post Comment

You May Have Missed