রেল দুর্ঘটনা মুর্শিদাবাদে, খোলা রেল গেটে পুল কারে ধাক্কা ট্রেনের, মৃত ৩

রেল দুর্ঘটনা মুর্শিদাবাদে, খোলা রেল গেটে পুল কারে ধাক্কা ট্রেনের, মৃত ৩

West Bengal

-Ritesh Ghosh

মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে এক মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল দুই স্কুল পড়ুয়া-সহ মোট তিনজনের। শুক্রবার সাতসকালে বহরমপুরে কর্ণসুবর্ণ ও গোবিন্দপুর স্টেশনের মাঝে ২৪এ/২ নম্বর রেলগেটে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। দ্রুত গতির একটি যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনে চলে আসায় লাইনের ওপর থাকা একটি স্কুল পুল কার এবং এক সাইকেল আরোহীকে সজোরে ধাক্কা মারে। ধাক্কার তীব্রতা এতটাই ছিল যে স্কুল গাড়িটি সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে তার ভিতরের যাত্রীরা আটকে পড়েন।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শুক্রবার সকাল আনুমানিক সাতটা নাগাদ এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিমতিতা থেকে কাটোয়াগামী একটি প্যাসেঞ্জার ট্রেন তীব্র গতিতে এসে লাইনের ওপর থাকা গাড়ি ও আরোহীকে পিষে দেয়। ঘটনার সময় স্কুল পুল কারটির ভিতরে অন্তত আটজন স্কুল পড়ুয়া আটকে পড়েছিল। দুর্ঘটনার বিকট শব্দ শুনে আশেপাশের খেত ও বসতবাড়ি থেকে বাসিন্দারা দ্রুত উদ্ধার করার তাগিদে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।

Aftermath of tragic rail accident in Baharampur Murshidabad

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় ট্রেনের তীব্র আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ গাড়িটির ভিতর শিশুদের কান্নায় সেখানকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এলাকার মানুষ কালবিলম্ব না করে নিজেদের উদ্যোগেই অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে দুর্ঘটনাগ্রস্তদের উদ্ধারকাজে প্রথম হাত লাগান। অত্যন্ত সাবধানে দুমড়ে যাওয়া ধাতব কাঠামোর ভেতর হাত গলিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় একে একে শিশুদের বাইরে বের করে আনা হয়। ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ পৌঁছলে এলাকা জুড়ে এক চরম উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়।

আহতদের দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরের জন্য পুলিশ ও স্থানীয় মানুষ অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তড়িঘড়ি দুর্ঘটনাস্থল থেকে রক্তাক্ত ছোট ছোট শিশুদের উদ্ধার করে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে যাওয়া হলে হাসপাতালের চিকিৎসকেরা দু’জন স্কুল শিক্ষার্থী এবং এক প্রাপ্তবয়স্ক সাইকেল আরোহীকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। চিকিৎসাধীন অন্যান্য শিশুদের অবস্থাও এখনো অত্যন্ত আশঙ্কাজনক থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বৃদ্ধির চরম আশঙ্কা রয়েছে।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকার মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ, শোক ও হাহাকার দেখা দেয়। বহু অভিভাবক খবর পেয়েই চিৎকার করতে করতে হাসপাতালের দিকে ভিড় জমান এবং আহত বাচ্চাদের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেন। এই দুর্ঘটনায় গোটা বহরমপুর জেলা জুড়ে এক গভীর শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা রেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে চরম উদাসীনতার অভিযোগ তুলে হাসপাতাল চত্বরে ও দুর্ঘটনার স্থলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

সকালবেলার দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ও উদ্ধারকাজ বাধাহীন করতে লাইনে সমস্ত রেল চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হয়। ক্রুদ্ধ জনতাকে শান্ত করতে পুলিশ বাহিনীকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা রেলওয়ের প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করলে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্দেশে এলাকায় অতিরিক্ত জেলা পুলিশ ও রেল পুলিশের বিশাল বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

এই দুর্ঘটনার মূল কারণ অন্বেষণ করতে গিয়ে ট্রেনের যাত্রাপথ ও রেল গেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর গুরুতর কর্তব্যে অবহেলার তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্পষ্ট অভিযোগ, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগে একটি সাধারণ আপ ট্রেন যাওয়ার জন্য ২৪এ/২ নম্বর রেলগেটে সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছিল। ট্রেনটি নিরাপদ দূরত্বে চলে যাওয়ার পর কর্তব্যরত গেটম্যান প্রথাগত নিয়ম মেনেই আটকে থাকা সড়কপথের যানবাহন চলাচলের জন্য বড় গেটটি খুলে দেন।

রেল গেট খোলার সংকেত মেলা মাত্রই লাইনের দু’পাশে আটকে থাকা স্কুল পুলকার ও অন্যান্য ছোট বাইক ও সাইকেল আরোহীরা রেললাইন পার হতে শুরু করে। কিন্তু গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে, ঠিক সেই মুহূর্তেই কোনও সতর্কবার্তা ছাড়া বা রেলের সবুজ ও লাল সিগন্যাল নির্ধারণ না করেই হঠাৎ অপর লাইন ধরে ধেয়ে আসে প্যাসেঞ্জার ট্রেন। রেলগেট খোলা থাকায় স্বাভাবিকভাবেই কোনও বিপদ আঁচ করতে পারেননি গাড়ির চালক।

চোখের পলক ফেলার আগেই দ্রুতগামী ট্রেনটি রেল লাইনের মাঝখানে থাকা সেই দুর্ভাগ্যজনক স্কুল পুল কার এবং অন্য এক সাইকেল আরোহীকে সরাসরি ধাক্কা মারে। মর্মান্তিক এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরেই উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক সক্রিয়তা শুরু হয়েছে পূর্ব রেল বিভাগে। প্রশ্ন উঠছে, রেলগেট পুরো খোলা থাকা সত্ত্বেও ওই নির্দিষ্ট লাইনে এক্সপ্রেস গতিতে প্যাসেঞ্জার ট্রেন প্রবেশের গ্রিন সিগন্যাল বা নির্দেশ কীভাবে পেলেন ট্রেনের লোকো পাইলট?

বিষয়টির তীব্রতা বিবেচনা করে হাওড়া রেল হেডকোয়ার্টার থেকে তৎক্ষণাৎ চারজন অত্যন্ত প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রেল আধিকারিকের সমন্বয়ে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল রওনা করিয়েছে। এই অভিজ্ঞ তদন্তকারী দলটি ঘটনাস্থলের সামগ্রিক পরিকাঠামো খতিয়ে দেখার পাশাপাশি সমস্ত টেকনিক্যাল সিগন্যাল লগ পরীক্ষা করবে। ঘটনার সময় ডিউটিতে থাকা গেটম্যান, পার্শ্ববর্তী স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার এবং ট্রেনের চালকের ভূমিকাও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হবে এই তদন্ত প্রক্রিয়ায়।

পূর্ব রেলের জনসংযোগ আধিকারিক জানিয়েছেন, সিগন্যালে বড় কোনও ত্রুটি ছিল নাকি কোনও মানুষের অমার্জনীয় উপেক্ষার জন্য এই বিশাল বিপর্যয় ঘটল, তা দ্রুত স্পষ্ট হয়ে যাবে। যদি গেটম্যান বা অন্য কোনও কর্মীর কর্তব্যে কোনও ফাঁকি বা অবহেলার প্রমাণ মেলে, তবে তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় রেলওয়ে আইনের কঠিনতম ধারায় মামলা দায়ের করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সম্পূর্ণ তদন্ত প্রক্রিয়া যাতে স্বচ্ছতার সঙ্গে চলে তার ওপর নজর রাখা হচ্ছে।

Post Comment

You May Have Missed