বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের দাম এক ধাক্কায় অনেকটা কমল, ব্যবসায়ীদের জন্য সুখবর
Business
-Ritesh Ghosh
নতুন মাসের শুরুতেই ব্যবসায়ী ও হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিকদের জন্য বড় স্বস্তির খবর নিয়ে এল রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে সারা দেশে ১৯ কেজির বাণিজ্যিক এলপিজি (LPG) সিলিন্ডারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। চলতি বছরে এই প্রথম বাণিজ্যিক রান্নার গ্যাসের দাম কমানো হল, যা স্বাভাবিকভাবেই বাজার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তেল বিপণন সংস্থাগুলির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এবার ১৯ কেজি ওজনের প্রতিটি বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম এক ধাক্কায় ১৮৩.৫০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। রাজধানী দিল্লি ছাড়াও কলকাতা, মুম্বই, পাটনা এবং চণ্ডীগড়ের মতো প্রধান শহরগুলিতে এই মূল্যহ্রাস কার্যকর করা হয়েছে। বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের ওপর এই ছাড়ের ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা অনেকটাই স্বস্তি পাবেন বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।

দর পরিবর্তনের পর জাতীয় রাজধানী দিল্লিতে ১৯ কেজির বাণিজ্যিক রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম ৩,১১৩.৫০ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২,৯৩০ টাকা। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার ব্যবসায়ীদের জন্য এই দাম ১৭৪ টাকা হ্রাস পেয়েছে। ফলে কলকাতায় এই সিলিন্ডারের নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ৩,০৮১.৫০ টাকা, যা গত জুন মাসে ছিল ৩,২৫৫.৫০ টাকা।
একইভাবে উত্তর ভারতের চণ্ডীগড়ে বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম ১৮১.৫০ টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ২,৯৫৪.৫০ টাকায়। উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউতেও দিল্লির মতোই ১৮৩.৫০ টাকা দাম কমেছে। বিভিন্ন শহরে এই দামের তারতম্য প্রধানত স্থানীয় কর কাঠামো এবং পরিবহণ খরচের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। প্রতি মাসের পয়লা তারিখেই এই দর পুনর্বিবেচনা করা হয়।
| শহরের নাম | পূর্ববর্তী দাম (টাকা) | হ্রাসের পরিমাণ (টাকা) | নতুন দাম (টাকা) |
|---|---|---|---|
| দিল্লি | ৩,১১৩.৫০ | ১৮৩.৫০ | ২,৯৩০.০০ |
| কলকাতা | ৩,২৫৫.৫০ | ১৭৪.০০ | ৩,০৮১.৫০ |
| চণ্ডীগড় | ৩,১৩৬.০০ | ১৮১.৫০ | ২,৯৫৪.৫০ |
| পটনা | ৩,৪০০.০০ | ১৭৩.০০ | ৩,২২৭.০০ |
বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম কমলেও গৃহস্থালির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ১৪.২ কেজির রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দামে এই মাসে কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নার বাজেটে বড় কোনও হেরফের না হলেও এই দাম অপরিবর্তিত রাখাকেই আপাতত স্থিতিশীলতার লক্ষণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির ঘোষণা অনুযায়ী, জুলাই মাসে গৃহস্থালির গ্যাস সিলিন্ডারের দাম আগের মাসের মতোই রয়েছে।
চলতি জুলাই মাসে রাজধানী দিল্লিতে ১৪.২ কেজির রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম ৯৪২ টাকাতেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একইভাবে দেশের অন্যান্য প্রধান শহরগুলিতেও এই দামের কোনও বদল হয়নি। কলকাতায় গৃহস্থালির গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকদের আগের মতোই ৯৬৮ টাকা খরচ করতে হবে। এছাড়া দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বইয়ে এই দাম ৯৪১.৫০ টাকা এবং চেন্নাইতে ৯৫৭.৫০ টাকা বজায় রয়েছে।
| শহর | সিলিন্ডারের ওজন (কেজি) | বর্তমান দাম (টাকা) |
|---|---|---|
| দিল্লি | ১৪.২ | ৯৪২.০০ |
| কলকাতা | ১৪.২ | ৯৬৮.০০ |
| মুম্বই | ১৪.২ | ৯৪১.৫০ |
| চেন্নাই | ১৪.২ | ৯৫৭.৫০ |
আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের দাম বা ক্রুড অয়েলের দর কমতে শুরু করার জেরেই এই সিদ্ধান্তের পথে হেঁটেছে ভারতীয় তেল সংস্থাগুলি। বিশ্ববাজারে তেলের দর এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রার বিনিময় মূল্যের ওপর ভিত্তি করেই প্রতি মাসে ভারতে গ্যাস ও জ্বালানির দাম নির্ধারণ করা হয়। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক স্তরে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অস্ত্রবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর বিষয়ে সমঝোতা হওয়ার পরেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে পতন দেখা গিয়েছে। এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা অনেকটাই কমেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী জলপথ হরমুজ প্রণালীর ওপর। লোহিত সাগরের পর এই জলপথটিই বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান ভরসা।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহণের প্রায় ২০ শতাংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে হয়ে থাকে। মার্কিন ও ইরান সম্পর্ক কিছুটা নমনীয় হওয়ায় এবং অস্ত্রবিরতি বজায় থাকায় এই সামুদ্রিক জলপথে জাহাজ চলাচল আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ ও স্বাভাবিক হয়েছে। পরিবহণ ঝুঁকি কমায় জ্বালানি তেলের দাম কমেছে এবং এর ফলে ভারতের মতো আমদানিকারক দেশে গ্যাস আমদানির খরচ কমেছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমায় কেবল এলপিজি নয়, দেশের অন্যান্য জ্বালানি ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক স্তরে জ্বালানি সস্তা হওয়ায় ভারতের অভ্যন্তরীণ পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরো বাজারেও সরবরাহ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করেছে সরকার। পাশাপাশি বেসরকারি তেল বিপণন সংস্থাগুলিও জ্বালানি তেলের দাম লিটার প্রতি কয়েক টাকা করে কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা দেশীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সাহায্য করছে।
বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের দাম কমায় সরাসরি লাভবান হবেন হোটেল, রেস্তোরাঁ, ছোট চায়ের দোকান, মিষ্টি প্রস্তুতকারক এবং ক্যাটারিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রান্নার গ্যাসের প্রয়োজন হয় এই শিল্পগুলিতে। জ্বালানি সস্তা হওয়ার কারণে তাদের দৈনিক উৎপাদন খরচ এক ধাক্কায় অনেকটা কমে আসবে। এর ফলে উৎসবের মরসুমের আগে খাদ্য ও আতিথেয়তা খাতের মুনাফার মার্জিন আরও উন্নত হবে বলে আশা করা যায়।
বাণিজ্যিক জ্বালানি সস্তা হওয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের একাংশের প্রশ্ন, রেস্তোরাঁ বা হোটেলের খাবারের দাম কি এবার কমবে? বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি খাবারের দাম না কমলেও অনেক ক্ষেত্রেই উৎসবের মরশুমে বিভিন্ন হোটেল বা ক্যাটারিং সংস্থা খাবারের থালিতে বিশেষ ছাড় বা অফার দিতে পারে। এছাড়া কাঁচামালের দামের ওঠানামার মধ্যে গ্যাসের দাম কমায় ব্যবসায়ীরা তাদের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারবেন।
বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্যের এই পতন সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা নিতে পারে। জুলাই মাসের প্রথম দিন থেকেই নতুন এই দর কার্যকর হওয়ায় খুচরো বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন দেখার, আগামী মাসগুলিতে আন্তর্জাতিক বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রেখে দেশের সাধারণ গৃহস্থের রান্নার গ্যাসের দামেও কোনও স্বস্তির ইঙ্গিত মেলে কিনা।


Post Comment