৪১ বছর বয়সে গোল রোনাল্ডোর, ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে পর্তুগালের ইতিহাস গড়ার পথে নতুন রেকর্ড

৪১ বছর বয়সে গোল রোনাল্ডোর, ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে পর্তুগালের ইতিহাস গড়ার পথে নতুন রেকর্ড

Football

-Ritesh Ghosh

বয়সের ভারে ফুটবল বিশ্বের অনেকেই যেখানে বুটজোড়া তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নেন, সেখানে পর্তুগালের মহানায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো যেন রোজ নতুন কোনও উপায়ে নিজেকে প্রমাণ করছেন। ভারতীয় সময় শুক্রবার ভোরে ফিফা বিশ্বকাপের অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে পর্তুগাল যখন শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করল, তখন মাঠের সব আলো কেড়ে নিলেন সিআরসেভেন। ৪১ বছর ১৪৭ দিন বয়সে গোল করে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রবীণ গোলদাতার খেতাব এখন নিজের শোকেসে পুরেছেন তিনি।

ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টিকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় জালে জড়িয়ে এই বিস্ময়কর মাইলফলকে স্পর্শ করেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। এতদিন পর্যন্ত বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করার রেকর্ডের মালিক ছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি। আর্জেন্টাইন মহাতারকার সেই মহিমান্বিত রেকর্ড ভেঙে আজ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলেন রোনাল্ডো। শুধু তা-ই নয়, নিজের বর্ণাঢ্য এবং দীর্ঘ খেলোয়াড়ি জীবনে ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটিই ছিল রোনাল্ডোর প্রথম গোল, যা বিশ্বজুড়ে থাকা তাঁর কোটি কোটি ভক্তকে পরম আনন্দ দিয়েছে।

Cristiano Ronaldo celebrating his historic World Cup goal

ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে পর্তুগালের এই জয়টি মোটেই সহজে আসেনি। মাঠে দুই দলের মধ্যে যে তীব্র লড়াই চলেছিল, তা দর্শকদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খাঁড়ার গ্রাসের মতো উত্তেজনায় বসিয়ে রেখেছিল। ম্যাচের অন্তিমলগ্নে ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলারদের একটি নিশ্চিত গোল অফসাইডের কারণে বাতিল না হলে ম্যাচের ভাগ্য হয়তো অন্যদিকেও মোড় নিতে পারত। তবে সমস্ত কঠিন পরিস্থিতি বুক চিতিয়ে মোকাবিলা করে পর্তুগিজ ব্রিগেড তাদের জয় ছিনিয়ে নিতে সমর্থ হয় এবং মাঠে রোনাল্ডোর এই অতিমানবীয় গোল দলের উদ্দীপনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

ফিফা বিশ্বকাপের সামগ্রিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ফুটবল মহলে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করার মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় রোনাল্ডোো এখন পাকাপাকিভাবে দ্বিতীয় স্থানে নিজের নাম লিখিয়ে নিলেন। সর্বকালের এই তালিকায় এখনও পর্যন্ত শীর্ষে রয়েছেন ক্যামেরুনের কিংবদন্তি রজার মিলা। ১৯৯৪ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ৪২ বছর ৩৯ দিন বয়সে গোল করে তিনি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সেদিক থেকে মিলা এখনো বিশ্বতালিকায় রোনাল্ডোর চেয়ে সামান্য এগিয়ে থাকলেও, বর্তমান যুগের অসম্ভব গতিশীল ফুটবল বিবেচনায় পর্তুগিজ তারকার পারফরম্যান্সকে বিশ্লেষকরা অন্য উচ্চতায় রাখছেন।

এই ঐতিহাসিক ম্যাচে মাঠে নামার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক স্তরে রোনাল্ডোর বিশ্বকাপের মোট ম্যাচের সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ২৬-এ। এই অনবদ্য মাইলফলকের সুবাদে তিনি বহু কিংবদন্তি বিশ্বমানের ফুটবলারের রেকর্ড পিছনে ফেলে দিয়েছেন। বর্তমানে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার তালিকায় জার্মানির কিংবদন্তি ডিফেন্ডার লোথার ম্যাথিউস তাঁর থেকে মাত্র ১টি ম্যাচ এগিয়ে রয়েছেন। সর্বকালের সর্বাধিক ২৯টি ম্যাচ খেলে এই তালিকার শীর্ষে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন লিওনেল মেসি। তবে পরবর্তী ম্যাচগুলিতে অংশ নিয়ে রোনাল্ডোর সামনে সুযোগ থাকছে ম্যাথিউসকে ছোঁয়ার এবং মেসির কাছাকাছি যাওয়ার।

নকআউট পর্বের ম্যাচটি শুরু হওয়ার পূর্বমুহূর্তে পর্তুগালের প্রথম একাদশে রোনাল্ডোর নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আরও একটি অভূতপূর্ব রেকর্ড তৈরি হয়ে যায়। তিনি বিশ্বকাপে নকআউটের মতো কঠিন ম্যাচে শুরুর একাদশে খেলা সবচেয়ে বয়সী আউটফিল্ড বা মাঠের খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। এর ঠিক একদিন আগে বসনিয়ার তারকা ফরওয়ার্ড এডিন জেকো আমেরিকার বিরুদ্ধে ম্যাচটিতে ৪০ বছর ১০৬ দিন বয়সে খেলে এই অনন্য গৌরব অর্জন করেছিলেন। কিন্তু পরদিনই রোনাল্ডো ৪১ বছর ১৪৭ দিন বয়সে নিজের সামর্থ্য দেখিয়ে জেকোর সেই সদ্য তৈরি রেকর্ডটি নিজের নামে লিখে নেন।

খেলার আর একটি চমকপ্রদ দিক ছিল দুই দেশের দুই কিংবদন্তির মুখোমুখি সংঘাত। রোনাল্ডোর সঙ্গে দ্বৈরথে নামা ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক লুকা মদ্রিচও এদিন ৪০ বছর ২৯৬ দিন বয়সে ম্যাচটির শুরু থেকে খেলছিলেন। বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এর আগে এমন কোনও ম্যাচ দেখা যায়নি যেখানে প্রতিযোগী দুই দলেই একই সঙ্গে ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সে দুজন মাঠের আউটফিল্ড খেলোয়াড় খেলছেন। ফলে এই ঐতিহাসিক লড়াইটি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে নবীনদের উদ্দীপনা এবং প্রবীণদের অভিজ্ঞতার এক অসামান্য উদাহরণ হয়ে রইল।

খেলোয়াড় ও দল ম্যাচ বয়স
ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো (পর্তুগাল) পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া ৪১ বছর, ১৪৭ দিন
লুকা মদ্রিচ (ক্রোয়েশিয়া) ক্রোয়েশিয়া বনাম পর্তুগাল ৪০ বছর, ২৯৬ দিন
এডিন জেকো (বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা) বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৪০ বছর, ১০৬ দিন

বর্তমানে ফুটবল প্রেমীদের মনে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে, আর তা হলো ৪১ বছর বয়সী এই ফুটবল জাদুকরকে কি আগামী ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপেও দেখা যাবে? অনেক ফুটবল বিশ্লেষক মনে করছেন, আগামী বিশ্বকাপ আসরটিই হতে পারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোনাল্ডোর শেষ বিদায় রাগিণী। যদিও ফুটবল অনুরাগীদের মনে হতাশা বা আশার এই দোলাচল লেগে রয়েছে, তবে রোনাল্ডো কিন্তু সৌদি আরবের স্বনামধন্য দল আল নাসরের সঙ্গে ২০২৬-২৭ সেশন পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ আছেন, যার অর্থ গোল করা তিনি এখনই থামিয়ে দিচ্ছেন না।

পর্তুগালকে রাউন্ড অব সিক্সটিনে কোয়ালিফাই করানোর মধ্য দিয়ে রোনাল্ডোর ট্রফি জেতার স্বপ্ন আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই ও বয়সের শারীরিক বাধার তোয়াক্কা না করে যেভাবে তিনি মাঠের নৈপুণ্য দিয়ে বিশ্বের তাবড় প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করছেন, তাতে তাঁর অফুরন্ত শক্তির আভাস মিলছে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পাওয়া এই চরম স্বস্তিদায়ক ও আত্মবিশ্বাস জাগানো জয় আগামী ম্যাচগুলোতে তাঁদের নতুন পথ দেখাবে। রোনাল্ডোর পায়ের জাদু পর্তুগিজ সমর্থকদের মনে আরও একটি বিশ্বকাপ জয়ের রঙীন স্বপ্ন বুনে চলেছে।

Previous post

জালে আটকে বিশালাকার ‘দৈত্য’…! লম্বায় ৬ ফুট, ওজনে ১৫ কিলো, বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলে ছড়াল আতঙ্ক, কী বললেন বিশেষজ্ঞরা?

Next post

স্কুল থেকে মিড-ডে মিলের চাল পাচারের অভিযোগ, নেপথ্যে কারা? নামখানার স্কুলে চাঞ্চল্য

Post Comment

You May Have Missed