রিভিউ মিটিং করতে চাইলেও সাড়া দেয়নি সিএবি, দুর্নীতির প্রতিবাদ করাতেই কোপ! বিস্ফোরক সৌরাশিস

রিভিউ মিটিং করতে চাইলেও সাড়া দেয়নি সিএবি, দুর্নীতির প্রতিবাদ করাতেই কোপ! বিস্ফোরক সৌরাশিস

সন্দীপ সরকার, কলকাতা: জল্পনাই সত্যি হয়েছে। তাঁকে বাংলার অনূর্ধ্ব ১৯ কোচের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে সিএবি (CAB)। অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে বাংলার সমস্ত বয়সভিত্তিক দলের জন্য কোচের খোঁজে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল সিএবি। অরুণ লাল, কল্যাণ চৌধুরী ও দেবাঙ্গ গাঁধী – তিন সদস্যের কমিটি গড়ে আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার নেয় সিএবি। বুধবার আসন্ন মরশুমের জন্য বিভিন্ন দলের কোচের চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা করেছে সিএবি। সেখানে নেই গত মরশুমে বাংলার অনূর্ধ্ব ১৯ দলকে কোচিং করানো সৌরাশিস লাহিড়ীর নাম। যা দেখে হতাশ বাংলার প্রাক্তন অফস্পিনার। এবিপি লাইভ বাংলাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ক্ষোভ উগরে দিলেন। চাঁচাছোলা ভাষায় জানিয়ে দিলেন, দুর্নীতির সঙ্গে আপোস না করায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাঁর ওপর কোপ পড়ল। সিএবি-র অলিন্দে ভোট রাজনীতির জন্য বঙ্গ ক্রিকেটের সর্বনাশ হচ্ছে বলেও গুরুতর অভিযোগ করলেন বাইশ গজে বাংলার বহু যুদ্ধের সৈনিক।

প্রশ্ন: আপনাকে সরিয়ে বাংলার অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কোচ করা হল মনোজ তিওয়ারিকে…

সৌরাশিস লাহিড়ী: মান্নিকে (ময়দানে মনোজের ডাকনাম), বাংলার অন্যান্য দলের কোচ হিসাবে যারা দায়িত্ব পেয়েছে, তাদের সকলকেই অভিনন্দন। শুভেচ্ছা।

প্রশ্ন: খবরটা কে দিলেন? সিএবি-র কেউ?

সৌরাশিস: সংবাদমাধ্যম থেকেই জানতে পারি। আর সিএবি-র কেউ! ক্রিকেট তো এখন সিএবি-তে পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে। সিএবি-র ছবিটাই আরও খারাপ হচ্ছে। কে কোন দলের কোচ হবে সব ঠিকই যখন ছিল, হাস্যকর এই গোটা পদ্ধতি করা হল কেন?

প্রশ্ন: সিএবি থেকে কোনও যোগাযোগ করা হয়নি? বলা হয়নি কেন আপনাকে সরানো হল?

সৌরাশিস: না। আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার পর দাদি (সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়) হোয়াটসঅ্যাপ করেছিল যে, প্যাটসি তোকে অন্য কোনও ভূমিকায় রাখা যায় কি না দেখছি। তারপর বুধবার জ্যাক (সৌরভ ঘনিষ্ঠ সুরজিৎ লাহিড়ী, যিনি সিএঅবি-র অ্যাপেক্স কাউন্সিলের সদস্যও) আমাকে ফোন করে বলে, তুমি মুখ খুলো না। কিছু বোলো না। তোমার সঙ্গে সিএবি থেকে কথা বলা হবে। আমি জানতে চাই, কেন আমাকে বাদ দেওয়া হচ্ছে সেটা তো জানাবে সিএবি। আমাকে বলা হয়, অনেকরকম পারমুটেশন কম্বিনেশন থাকে তো। আমি প্রশ্ন করি, বাংলার ক্রিকেট দলের কোচ ঠিক করার জন্যও পারমুটেশন? তাতে ও কোনও উত্তর দিতে পারেনি। বুধবার রাতে কোচের তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর আমি জ্যাককে ফোন করি। বলি, সংবাদমাধ্যমের অনেকে যোগাযোগ করছে। আমি প্রতিক্রিয়া কী দেব? কেন বাদ পড়লাম বলতে তো হবেই। ও কোনও উত্তর দিতে পারেনি।

প্রশ্ন: আপনি অনূর্ধ্ব ১৯ কোচের পদেই আবেদন করেছিলেন?

সৌরাশিস: আমি অনূর্ধ্ব ১৯ দলকেই কোচিং করাতে চেয়েছিলাম। কারণ, গত তিন বছর ধরে দলটাকে একটা জায়গায় এনেছিলাম। এর আগে যে সমস্ত বিরাট বিরাট নাম কোচিং করিয়েছে, তারা ১২ বছর ধরে টিমটাকে কোয়ালিফাই করাতে পারেনি। দেবাঙ্গ গাঁধী তো মরশুম শুরু হওয়ার আগে, বিনু মাঁকড় ট্রফি শুরু হওয়ার ১০ দিন আগে দিল্লির কোচ হয়ে চলে গিয়েছিল। আমি তখন সিনিয়র দলের কোচ। সেই মরশুমে সঞ্জীব সান্যাল একা অনূর্ধ্ব ১৯ দলের দায়িত্ব সামলায়। তার পরের মরশুমের আগে সিএবি-র তৎকালীন সভাপতি স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে ডেকে বলেন, সিনিয়র টিমে প্রচুর সাপোর্ট স্টাফ হয়ে গিয়েছে। তোর অভিজ্ঞতাকে আরও ভালভাবে কাজে লাগাতে চাই আমরা। তুই অনূর্ধ্ব ১৯ দলের দায়িত্ব নে। অনূর্ধ্ব ২৩ দলে এত ভাল কাজ করেছিস। সাপ্লাই লাইনটা ঠিক করতে তুই অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কোচ হ। আমি ভাবার জন্য সময় নিই। কারণ, সেই সময় সিনিয়র দলও ভাল খেলছে। ফাইনালে খেলেছি আমরা। অনূর্ধ্ব ২৩ দল থেকে আকাশ দীপ, সুদীপ কুমার ঘরামি, সূরয সিন্ধু জয়সওয়ালরা উঠে এসে সিনিয়র দলে ভাল করছে। সেই সন্ধিক্ষণটা নিজে সামলাচ্ছিলাম। তবু আমি সেই প্রস্তাবে রাজি হই। আমার সহকারী কোচ সঞ্জীব সান্যাল আমাকে বলেছিল, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা অনূর্ধ্ব ১৯ পর্যায়ে কী সব দুর্দান্ত দল দেখেছিস! আমার সহকারী কোচ এ কথা বলছে! আমি দায়িত্ব নিয়ে দলটাকে ফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলাম। তার আগে অনূর্ধ্ব ১৯ দলে সাদা বলের ক্রিকেট নিয়ে কোনও ধারণাই ছিল না। যোগ্যতা অর্জন করতে পারছিলাম না নক আউট পর্বে। আমি অনূর্ধ্ব ১৬ দল থেকে এক ঝাঁক ক্রিকেটারকে তুলে আনি। আমি বিশ্বাস করি এই দলটার প্রতিভা আছে। এরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারে। সেই জন্যই দলটার সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলাম। আমি দাদিকে সেটা জানিয়েওছিলাম। সিএবি কোষাধ্যক্ষ সঞ্জয় দাসের সঙ্গেও কথা হয়েছিল আবেদন করার আগে। আমাকে বলেছিল, আবেদন কর না।

প্রশ্ন: ইন্টারভিউতে কী জিজ্ঞেস করা হয়েছিল? আপনার প্রেজেন্টেশন নাকি পছন্দ হয়নি…

সৌরাশিস: আমি বোর্ডের সেন্টার অফ এক্সেলেন্সে প্রেজেন্টেশন দিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলাম। আমি অত্যাধুনিকভাবে প্রেজেন্টেশন দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সিএবি-র চিফ এগজিকিউটিউ অফিসার জানান যে, প্রোজেক্টর বা স্ক্রিনে প্রেজেন্টেশনের বন্দোবস্ত করা হয়নি। তাহলে কীসের প্রেজেন্টেশন আর কেনই বা তা অপছন্দ হল? সদুত্তর পাইনি। ইন্টারভিউয়ে দেবাঙ্গ আমাকে জিজ্ঞেস করেন, কাজ করতে গিয়ে কী অসুবিধা হয়েছে? আমি তখন জানাই যে নির্বাচকেরা কীভাবে সিন্ডিকেট তৈরি করে দলে ক্রিকেটার ঢোকানোর চেষ্টা করছিল, সহকারী কোচ বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, সবই বলি। পরে ভাইটুদা (কল্যাণ চৌধুরী) আমাকে ব্যক্তিগতভাবে জানান যে, তুই এত খোলামেলা কথা বলেছিস, ভালভাবে নেবে না। আমি জানাই, এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আমি সিএবি কর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার বসতে চেয়েছিলাম। রিভিউ মিটিং করতে চেয়েছিলাম। দাদিকে, সিএবি সচিব বাবলু কোলেকে মেসেজ করেছিলাম। কেউ উত্তর দেননি। একটা লোক কাজ করতে গিয়ে কী কী অসুবিধায় পড়েছে, কেউ জানতে চায়নি। এবারও বাবলু কোলে বলেছিলেন, কোচের রিপোর্ট তৈরি করো, তোমাদের সঙ্গে বসা হবে। কোথায় কী? কোনওদিন রিভিউ মিটিং হয় না। কোনও কথোপকথন হয়নি। বাংলার ক্রিকেট নিয়ে সিএবি-র কেউ ভাবে না। সবাই গদি আগলাতে ব্যস্ত। জাতীয় স্তরে প্রচুর কাজ করেছি। অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপের আগে দল নির্বাচনের জন্য যে চ্যালেঞ্জার্স টুর্নামেন্ট হয়েছিল, সেখানে ইন্ডিয়া বি দলের কোচ ছিলাম। ফাইনালে উঠে আমরা হেরে যাই। ভারতীয় ক্রিকেটকে কাছ থেকে দেখেছি, কাজ করেছি। দেশের সেরা উঠতি ক্রিকেটারদের সঙ্গে কাজ করেছি। এখনকার ক্রিকেটে কী প্রয়োজন জানি। 

প্রশ্ন: গত মরশুমে বাংলার অনূর্ধ্ব ১৯ দলের পারফরম্যান্স কেমন হয়েছিল?

সৌরাশিস: ওয়ান ডে সেমিফাইনালে উঠে পঞ্জাবের কাছে হেরে গিয়েছিলাম। কোচবিহার ট্রফির প্রথম দুই ম্যাচে ১৪ পয়েন্ট পাই। তৃতীয় ম্যাচে ভিলাইয়ে গিয়ে ছত্তীসগঢ়ের কাছে হেরে যাই। পরের ম্যাচ ছিল কল্যাণীতে গোয়ার বিরুদ্ধে। আমরা ভিলাই থাকাকালীন ইন্ডিগোর ধর্মঘট হয়। আমি সিএবি-কে বলেছিলাম, বোর্ডের সঙ্গে কথা বলে গোয়া ম্যাচ যদি পিছনো যায় সেটা দেখতে। কারণ সেটা ছিল আপদকালীন পরিস্থিতি। সিএবি থেকে কেউ বোর্ডের সঙ্গে কথা বলেছিল বলে মনে হয় না। আমরা ৩০ ঘণ্টা বাস সফর করে ভিলাই থেকে সরাসরি কল্যাণী পৌঁছই। আমি শুধু ভোরে বাড়িতে নেমে বেলা এগারোটায় কল্যাণী পৌঁছে যাই। সেদিনই বিকেলে ছেলেদের প্র্যাক্টিস করাই। পরের দিন ম্যাচ। কোনও বিশ্রাম ছাড়া নামতে হয় ছেলেদের। ম্যাচটা ড্র হয়। প্রথম ইনিংসের লিড হজম করি। শেষ ম্যাচটা ছিল বরেলিতে উত্তর প্রদেশের বিরুদ্ধে। কুয়াশায় চারদিনের ম্যাচে ৬৫-৬৮ ওভার খেলা হয়। কোনও ফলই হয়নি। আমরা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাই। এই কথাটা সিএবি-র কারও শোনার কথা ছিল না? কেন ৩০ ঘণ্টা বাস জার্নি করে এসে ছেলেদের মাঠে নামতে হবে? আমি বারবার মেসেজ করেছি দাদি, সঞ্জয় দাস, বাবলু কোলেকে। তাদের ক্রিকেট নিয়ে ভাবার সময় কোথায়! তারা এখন অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত।

প্রশ্ন: কোথায় পিছিয়ে পড়লেন বলে মনে হয়?

সৌরাশিস: জানি না। আমি কোচের পদ ভিক্ষা করছি না। কিন্তু আমাকে বলতে হবে কেন বাদ পড়লাম? যারা সুযোগ পেল, কোচ হিসাবে তারা কোথায় এগিয়ে? আমাকে তো সেটা জেনে সেইভাবে উন্নতি করতে হবে। বিগত দশ বছরে যারা বাংলার কোচিং করিয়েছে, কেউ যদি আমার চেয়ে এগিয়ে থাকে, আমি মুখ বুজে মেনে নেব। রাজীব দত্ত ভারতের কমনওয়েলথ গেমস জয়ী দলের কোচ। গৌতম সোম জুনিয়র কোচবিহার ট্রফি জিতিয়েছে। তাদের সহকারী করা হচ্ছে! তাঁদের চেয়ে এগিয়ে অনুষ্টুপ মজুমদার! রুকু (অনুষ্টুপের ডাকনাম) আমার সতীর্থ, দারুণ বন্ধু, অসাধারণ ক্রিকেটার। কিন্তু সরাসরি কোচিংয়ে কী করে আসে!

প্রশ্ন: অন্য কোথাও প্রস্তাব রয়েছে কোচিং করানোর?

সৌরাশিস: এরকম শেষ মুহূর্তে বাদ পড়ার পর আমি বিকল্প ভাবব কী করে? আমাকে সময়ই দেওয়া হল না। আমার সামনে বেঙ্গল টি-২০ লিগ রয়েছে। সেখানেই কোচিং করাব। তৈলমর্দন করতে পারব না। যাদের নিজেদের দক্ষতা নিয়ে আস্থা নেই, তারাই তেলবাজি করবে। ভাল স্টুডেন্ট কখনও উত্তরপত্রের ফাঁকে টাকা গুঁজে দেবে না।

Previous post

Herbal Clothing: রান্নাঘরের ফেলনা উপাদানেই তৈরি হচ্ছে জামা-কাপড়ের টেকসই রঙ! পুরোটাই উপকারের, বাঁকুড়ার এই ভেষজ ফর্মুলায় চমকে যাবেন আপনিও

Next post

LPG Rules: গ্রাহকদের জন্য দারুণ খবর, এলপিজি-র নিয়মে বদল !

Post Comment

You May Have Missed