‘যেতে দাও আমায় ডেকো না…’, আশা আর নেই, পড়ে রইল প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেব

‘যেতে দাও আমায় ডেকো না…’, আশা আর নেই, পড়ে রইল প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেব

মুম্বই: হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরেই প্রহর গুনতে শুরু করেছিলেন অনুরাগীরা। সেই আশঙ্কাই সত্য হল শেষ পর্যন্ত। ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ‘কুইন অফ ইন্ডিপপ’ আশা ভোঁসলে। রবিবার সকালে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে মৃত্যু হয় শিল্পীর। আশার মৃত্যুতে সঙ্গীতের জগতে নক্ষত্রপতন ঘটল বলে মনে করছেন অনেকে। তবে আশাকে গুরু-গম্ভীর উপমার মধ্যে বেঁধে রাখতে নারাজ তাঁর অনুরাগীরা। নবতিপর আশার কণ্ঠে বয়সের ছাপ পড়েনি শেষ দিন পর্যন্ত। সর্বকালের, সব প্রজন্মের, সমস্ত সঙ্গীতপ্রেমীর মনে আজও নাড়া দেয় তাঁর কণ্ঠ। (Singer Asha Bhosle Death News)

১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলিতে, পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের ঘরে জন্ম আশার। তাই জন্মসূত্রেই সঙ্গীতের সরস্বতীর আশীর্বাদধন্য। ছোট্ট বয়স থেকেই দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে গান গাইতে শুরু করেন। দুই বোন মিলেই সংসার চালাতেন একরকম। ১৯৪৩ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে প্রথম বার মরাঠি ছবি ‘মাঝা বল’ ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ পান আশা। হিন্দি ছবিতে প্রথম গান গাওয়ার সুযোগ হয় ১৯৪৮ সালে, ‘চুনরিয়া’ ছবিতে ‘সাওয়ন আয়া’। তবে প্রথমবার একার কণ্ঠে গান গাওয়ার সুযোগ হত ১৯৪৯ সালে, ‘রাত কি রানি’ ছবিতে। (Asha Bhosle Death)

বিদ্রোহী, গোড়া থেকেই

অনুরাগীদের অনেকে মনে করেন, কোকিলকণ্ঠী লতা যদি সুর সম্রাজ্ঞী হন, তাহলে আশাকে চিরন্তন বলা চলে। আশার কণ্ঠে প্রাণশক্তি খুঁজে পান অনুরাগীরা। সুর, ছন্দ, মাদকতা মিলিয়ে ভাললাগা কাজ করে মনে। লতার সঙ্গে আশার তুলনা করতে গিয়ে আশাকে কেউ কেউ ‘বিদ্রোহী’ বলারও পক্ষপাতী। ব্য়ক্তিগত জীবনেও আশার ক্ষেত্রে ওই শব্দবন্ধ প্রযোজ্য হতে পারে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান আশা। বিয়ে করেন ৩১ বছর বয়সি, নিজের সেক্রেটারি গণপতরাও ভোঁসলেকে। সকলের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করেছিলেন বলে পরিবারের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়। 

চার থেকে পাঁচের দশকে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন গীতা দত্ত, শামশাদ বেগম, লতা মঙ্গেশকররা। সেই তুলনায় প্রচারের আলো সেভাবে গায়ে পড়েনি আশার। তুলনামূলক কম বাজেটের ছবিতে গান গাউতেন তিনি। ১৯৫২ সালে ‘সঙ্গদিল’ ছবির দৌলতে প্রচারের আলোয় উঠে আসেন আশা। তবে সুরকার ওপি নাইয়ারের সঙ্গে ‘ছম ছমা ছম’ ছবিতে ১১টির মধ্যে ১০টি গান গাওয়ার সুযোগ পান আশা। ১৮৫৩ সালে বিমল রায়ের ‘পরিণীতা’ এবং ১৯৫৪ সালে রাজ কপূরের দৌলতে ‘বুট পলিশ’ ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ হয়। 

লতার সঙ্গে কেমন সম্পর্ক

কয়েক বছর আগে একটি সাক্ষাৎকারে আশা জানান, বাড়িতে লতা তাঁর দিদি হলেও, প্রকাশ্যে সেভাবে কথা বলতেন না। নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখে চলতেন লতা। তাঁর প্রস্তুতি সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত রিহার্সালে বসে থাকতে হতো আশাকে। লতার জন্য় আশার প্রতিভা ঢাকা পড়ে যায় বা লতাই একরকম ভাবে বোনের উন্নতি হতে দেননি বলেও অভিযোগ ওঠে সেই সময়। যদিও পরবর্তীতে লতাকে বলতে শোনা যায়, “আশার উন্নতি হতে না দিলে, আজ এত খ্যাতি হত কি? ও তো বিয়ে করে চলে গিয়েছিল। তার পর ওর নামযশ হয়। তাছাড়া ওর স্টাইল, আমার স্টাইল আলাদা ছিল। আমরা দুই বোন, কণ্ঠেও মিল আছে, তবে আমরা ভিন্ন রকমের গান গাইতাম। বোনের সঙ্গে এমন করার কথা ভাবতেই পারি না আমি।” একটি অনুষ্ঠানে একই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন লতা ও আশা। সেখানে লতা বলেন, “আশা আমার বোন। চার বছরের ছোট। কিন্তু বরাবর আমাকে জ্বালিয়ে এসেছে। তবে আমি ক্ষমা করে দিই।” জবাবে আশা বলেন, “ক্ষমা তো করতেই হবে। মা-বাবাই তো ক্ষমা করে।”

১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ওপি নাইয়ারের হাত ধরে বহু গান গাওয়ার সুযোগ হয় আশার। প্রথম বড় সাফল্য পান বিআর চোপড়ার ‘নয়া দওর’ ছবিতে, ১৯৫৭ সালে। মহম্মদ রফির সঙ্গে গাওয়া ‘মাঙ্গ কে সাথ তুমহারা’, ‘সাথী হাথ বড়ানা’ , ‘উড়ে জব জব জুলফে তেরি’ রাতারাতি খ্যাতি এনে দেয় আশাকে। ওপি নাইয়ারের হাত ধরেই আশা নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলেন বলে কথিত রয়েছে। দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বলেও শোনা যায়। তবে পেশাগত জীবনে তাঁদের জুটি সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছিল। একসঙ্গে ‘আইয়ে মেহরবান’ (হাওড়া ব্রিজ), ‘আও হুজুর তুমকো'(কিসমত), ‘উড়ে জব জব জুলফে তেরি'(নয়া দওর), ‘ইশারোঁ ইশারোঁ মেঁ’ (কাশ্মীর কি কলি)র মতো যুগান্তকারী গান সৃষ্টি করেন। 

১৯৭২ সালের ৫ অগাস্ট ওপি নাইয়ারের থেকে আলাদা হয়ে যান আশা। কেন ওই সিদ্ধান্ত নেন, তা খোলসা করেননি আশা। তবে ওপি নাইয়ার একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমি জ্যোতিশশাস্ত্র বুঝি। জানতাম ওর থেকে আলাদা হতে হবে। কিছু ঘটনা আহতও করেছিল আমাকে। আমিই ছেড়ে যাই। এখন ৭৬ বছর বয়সে বলতে পারি, আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিল আশা। আমার দেখা সেরা মানুষ ও।” 

স্বনামে পরিচিত হয়ে ওঠা

এর পর একে একে সুরকার রবি, খইয়ম, সচিন দেব বর্মন, রাহুল দেববর্মনের সঙ্গে জুটি বাঁধেন আশা। ‘চৌধভি কা চাঁদ’-এর জন্য গীতা দত্তকে চেয়েছিলেন রবি। কিন্তু গুরু দত্ত চেয়েছিলেন আশাকে। আশার প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি সচিন দেব বর্মন। লতার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল তাঁর। সেই সময় আশাকে নিয়ে একের পর ছবিতে কাজ করেন তিনি, ‘নও দো গ্যারা’, ‘কালা পানি’, ‘কালা বাজার’, ‘সুজাতা’। 

আশা যখন দুই সন্তানের মা, রাহুল দেব বর্মন তথা পঞ্চম তখন দশক শ্রেণিতে পাঠরত। সেই সময় প্রথম সাক্ষাৎ দু’জনের। পড়াশোনা ছেড়ে সঙ্গীতচর্চায় চলে আসেন পঞ্চম। জুটি বাঁধেন আশার সঙ্গে। ‘তিসরি মঞ্জিল’ ছবিতে প্রথম একসঙ্গে কাজ তাঁদের। আশার সহযোগিতায় একের পর এক পরীক্ষা নিরীক্ষা চালান পঞ্চম, ক্য়াবারে থেকে রক, ডিস্কো থেকে গজল, কিছু বাদ যায়নি। সাতের দশকে পঞ্চম এবং আশা সঙ্গীতের দুনিয়ায় ঝড় তোলেন। ‘পিয়া তু অব তো আজা’ (কারওঁয়া), ‘দম মারো দম’ (হরে রাম হরে কৃষ্ণ), ‘দুনিয়া মেঁ লোগোঁ কো’ (অপনা দেশ) সাফল্যের শিখরে পৌঁছন তাঁরা। আটের দশকে যখন ‘মেরা কুছ সামান’, ‘কতরা কতরা’ গান বাঁধছেন পঞ্চম, সেই সময়ও আশা ছিল তাঁর প্রথম পছন্দ। 

পঞ্চমের হাত ধরেই বাংলায় একের পর এক জনপ্রিয় গান গাওয়ার সুযোগ পান আশা। সেই তালিকায় রয়েছে ‘মহুয়ায় জমেছে আজ মন গো’, ‘চোখে চোখে কথা বলো’, ‘চোখে নামে বৃষ্টি’, ‘যাব কি যাব না’, ‘যেতে দাও আমায় ডেকো না’, ‘বাঁশি শুনে কি ঘরে থাকা যায়’, ‘সন্ধেবেলায় তুমি আমি’। বাপ্পি লাহিড়ি, ইল্লেইয়ারাজা, মদন মোহন, এ আর রহমান, জয়দেব, শঙ্কর-জয়কিষাণ, অনু মালিক-সব প্রজন্মের সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকারদের জন্য গান গেয়েছেন আশা। অজস্র অ্যালবাম তৈরি করেছেন। 

ঘাত-প্রতিঘাত সয়েও প্রাণচঞ্চল

পেশাগত জগতে সাফল্যে শিখরে পৌঁছেছেন যেমন, আশার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কম কাটাছেঁড়া হয়নি। বাড়ি থেকে পালিয়ে গণপতরাওকে বিয়ে করেছিলেন আশা। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে শ্বশুরবাড়িতে তাঁর উপর অত্য়াচার শুরু হয় বলে জানা যায়। সন্দেহবাতিক গণপতরাও আশাকে বাড়ি থেকে বেরও করে দেন। দুই সন্তানকে কোলে নিয়ে, তৃতীয় সন্তানকে গর্ভে নিয়ে সেই সময় বাপের বাড়ি ফিরে যান আশা। ১৯৬০ সালে গণপতরাওয়ের সঙ্গে সম্পর্কে ইতি টানেন। ১৯৮০ সালে পঞ্চমের সঙ্গে সাতপাকে বাঁধা পড়েন আশা। পঞ্চমের বাড়ির আপত্তি ছিল বিয়েতে, বিশেষ করে সচিন দেব বর্মনের স্ত্রী আশাকে পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না। পঞ্চন বয়সেও পাঁচ বছরের ছোট ছিলেন আশার থেকে। তবে আশা এবং পঞ্চম, দু’জনেরই সেটি দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। ১৯৭১ সালে রীতা পটেলের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে পঞ্চমের। একটা সময় পর আশা এবং পঞ্চমও আলাদা থাকতে শুরু করেন। তবে প্রায়শই পঞ্চমের স্মৃতিতে ডুব দিতেন আশা। পঞ্চমের মৃত্যুর পর এক সাক্ষাৎকারে বলতে শোনা যায়, “স্বামী বলব না, আমার খুব ভাল বন্ধু। ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করত, আর আমিও চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতাম।” পঞ্চমের কথা মনে পড়লে কী করেন জানতে চাওয়া হলে আশা গেয়ে শোনান, ‘মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পড়া হ্যায়’।

আশার বড় ছেলে হেমন্ত ভোঁসলে প্থম জীবনে পাইলট ছিলেন। পরবর্তীতে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ছেলের সঙ্গেও কাজ করেছেন আশা। ১০১৫ সালে ক্যান্সার আক্রান্ত হেমন্ত মারা যান। আশার মেয়ে বর্ষা ২০১২ সালে আত্মঘাতী হন। ছোট ছেলে আনন্দই মায়ের কাজকর্ম দেখতেন। আশার নাতি চৈতন্য ওরফে চিন্টু ভারতের প্রথম পুরুষ ব্যান্ড ‘আ ব্যান্ড অফ বয়েজে’এর সদস্য। 

সুদীর্ঘ কেরিয়ারে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন আশা। ১৯৮১ সালে ‘উমরাও জান’ ছবিতে গাওয়া ‘দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়’ এবং ১৯৮৬ সালে ‘ইজাজত’ ছবির জন্য গাওয়া ‘মেরা কুছ সামান’ গানের জন্য জাতীয় পুরস্কার পান। গ্র্যামি পুরস্কারের জন্যও চার বার মনোনীত হন তিনি। ‘দাদাসাহেব ফালকে’, ‘পদ্ম বিভূষণ’, ‘বঙ্গ বিভূষণ’, ‘মহারাষ্ট্র ভূষণ’ সম্মানও পেয়েছেন আশা।  

আজীবন সঙ্গীত সাধনাতেই মগ্ন ছিলেন আশা। তবে সঙ্গীতের পাশাপাশি, রান্নাও তাঁর বড় প্রিয় ছিল। আশার হাতের কড়াই গোস্ত, বিরিয়ানির আবদার করতেন তারকারাও। একটি সাক্ষাৎকারে আশা জানিয়েছিলেন, গানের জগতে কিছু না হলে রান্নাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতেন তিনি। নিজের রেস্তরাওঁ খুলেছিলেন আশা। দুবাই, কুয়েত, ব্রিটেনেও তাঁর রেস্তরাঁ রয়েছে। তবে নবতিপর আশা জীবনসায়াহ্নে পৌঁছেও মনে মনে আজও কিশোরীই ছিলেন। হাজারো ঝড়-ঝাপটা সয়ে মুখে হাসি লেগে থাকত। 

Previous post

Assembly Election News: প্রথম দফার ১৫২ আসনে পুরুষ ভোটারের তুলনায় কম মহিলা ভোটার! তথ্য প্রকাশ নির্বাচন কমিশনের

Next post

উড়তে উড়তে আমেরিকার যুদ্ধজাহাজের কাছে, আরবসাগরে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে বিমান, নাটকীয় পরিস্থিতি

Post Comment

You May Have Missed