যন্তরমন্তরে উত্তাল বিক্ষোভ! শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দিনভর থালা-চামচ বাজিয়ে চলল অভিনব প্রতিবাদ
India
-Ritesh Ghosh
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একের পর এক পরীক্ষা বাতিল ও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া প্রতিবাদ আন্দোলন ভিন্ন মোড় নিচ্ছে। কোকরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকে আয়োজিত এই বিক্ষোভে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। তবে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরে প্রতিবাদের সময়সীমা বাড়াতে অস্বীকার করায় আন্দোলনকারী ও প্রশাসনের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। জুনের এই প্রচণ্ড গরমেও শত শত শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে সরব হয়েছেন।
সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের নেতৃত্বে বহু শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী এই বিক্ষোভে যোগ দেন। পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় যে, বিকেল ৫টার পর আর বিক্ষোভের অনুমতি নেই। কিন্তু আন্দোলনকারীরা তাঁদের দাবিতে অনড় থাকেন। সিজেপি নেতৃত্বের তরফ থেকে জানানো হয়, যতক্ষণ না শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করছেন, ততক্ষণ তাঁরা এই ধরণা মঞ্চ ছাড়বেন না। তবে প্রশাসন আইনি নিয়মের বাইরে যেতে রাজি হয়নি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দিল্লি পুলিশ শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভস্থল খালি করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। পুলিশ কর্মীদের একটি বড় দল ধরণা স্থলে প্রবেশ করে ছাত্রছাত্রীদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। অধিকাংশ বিক্ষোভকারী চলে গেলেও অভিজিৎ দিপক এবং আইসা (AISA) সমর্থিত কিছু ছাত্রনেতা মঞ্চেই অবস্থান করছেন। কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে পুলিশের তরফে কোনও জোর খাটানোর খবর মেলেনি।
বিক্ষোভকারীদের মূল ক্ষোভ দেশের চলমান পরীক্ষা ব্যবস্থার অরাজকতা এবং প্রশ্ন ফাঁসের একের পর এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। আন্দোলনকারীদের দাবি, বারবার পরীক্ষা বাতিল ও দুর্নীতির কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে পড়েছে। এই ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে অবিলম্বে নিজ পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।
পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি আন্দোলনকারীরা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের হতাশার কথাও তুলে ধরছেন। যন্তর মন্তরের এই অবস্থান কেবল কোনো একটি পরীক্ষার বিষয় নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলা সরকারি ব্যবস্থার ত্রুটিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। সিজেপি দাবি করছে, সরকারের তরফ থেকে কোনো রকম গড়িমসি বরদাস্ত করা হবে না।
ধর্ণামঞ্চে বক্তব্য রাখার সময় অভিজিৎ দিপক প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, “সারা দেশ থেকে আসা তরুণরা এখানে মিলিত হয়েছে। আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকারের জন্য লড়াই করছি। যতক্ষণ না বিচার মিলছে, আমরা যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ অবস্থান চালিয়ে যেতে চাই।” তিনি পুলিশকে এই প্রতিবাদের অনুমতি বাড়ানোর আহ্বান জানান এবং গ্রেপ্তার করা হলে নিজেই প্রথম কারাবরণ করবেন বলে ঘোষণা করেন। তাঁর এই বক্তব্য ছাত্রছাত্রীদের ও সমর্থকদের মধ্যে চরম উদ্দীপনার সৃষ্টি করে।
এই প্রতিবাদের আগে সিজেপি-র পক্ষ থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অভিযোগ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে একটি স্বচ্ছ সমাধানের আবেদন করা হয়েছে। চিঠির মাধ্যমে পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থাকে সংস্কার করার দাবিতে সরকারের উচ্চতম মহলের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
এবারের আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর ব্যতিক্রমী প্রকাশভঙ্গি। এদিন সাধারণ ডাফলি বা স্লোগানের পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের অনেককেই আরশোলার মুখোশ পরে প্রতিবাদ জানাতে দেখা যায়। তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আওয়াজ সরকারের কানে পৌঁছে দিতে সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা সমর্থকদের বাড়ি থেকে থালা ও চামচ নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সেই আহ্বান সাড়া দিয়ে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী থালা ও চামচ বাজিয়ে যন্তর মন্তরের বাতাস কাঁপিয়ে তোলেন। তাঁদের হাতে ছিল বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড। যার মধ্যে অন্যতম ছিল, “বধিরদের শোনাতে হলে গলার আওয়াজ অনেক জোরে হতে হবে”। তরুণ প্রজন্মের এই সৃজনশীল অথচ তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দিল্লির রাজপথে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক দ্বাদশ শ্রেণীর কৃতী ছাত্র, যিনি নিয়মতান্ত্রিক সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁর কথায় এই আন্দোলনের গভীরতা প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, “সব যুদ্ধ কেবল জেতার জন্য লড়া হয় না। কিছু যুদ্ধ এই বার্তা দিতে লড়া হয় যে কেউ অন্তত অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল।” এই ক্ষোভ কোনো রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য নয়, বরং নিজের হৃত ভবিষ্যৎ ফিরে পাওয়ার লড়াই, যা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী অনুভব করেন।
কোনো রাজনৈতিক দলের প্রথাগত নিয়ন্ত্রণ বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের পরিকল্পনা থেকে এই আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। দিল্লির এই ছাত্র আন্দোলনের নেপথ্যে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা দ্রুতই একটি সংগঠিত রূপ ধারণ করে।
বিক্ষোভে উপস্থিত দিল্লির এক জননীতি বিশেষজ্ঞ এই পরিবর্তনের ধারাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় যে অসন্তোষের জন্ম হয়েছিল, তা আজ রাজপথে নেমে এসেছে। এর কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ছক নেই। এটি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত এবং সাধারণ তরুণদের নিজেদের লড়াই। এ কারণেই দলমত নির্বিশেষে মানুষ এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হতে পেরেছেন।”
তরুণদের এই জমায়েতকে সমর্থন জানাতে যন্তর মন্তরে উপস্থিত হয়েছিলেন দিল্লি হাইকোর্টের আইনজীবী দিলশাদ চৌধুরী। তিনি পরীক্ষা ব্যবস্থার করুণ দশার কথা উল্লেখ করে বলেন, “শিক্ষা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যা চলছে। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস এবং পরীক্ষার চূড়ান্ত অনিয়ম যেন সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। এখন নাগরিক ও আইনি প্রতিবাদের মাধ্যমে এই অব্যবস্থার অবসান ঘটাতে হবে।”
যদিও পুলিশ ধরণা স্থল থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবুও আন্দোলনকারীদের মনোভাব অনমনীয়। এই আন্দোলন কেবল যন্তর মন্তরের চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রমশ ডালপালা মেলছে। শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদের রেশ দেশজুড়ে পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখার বিতর্ককে আরও উস্কে দিল।



Post Comment