নিট-ইউজি ২০২৬ বিতর্ক! ৩৭ দিনে ১২জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু, কেন কাঠগড়ায় কেন্দ্র?
India
-Ritesh Ghosh
নিট-ইউজি (NEET-UG) ২০২৬ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তার জেরে উদ্ভূত বিতর্ক ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই বিতর্কের মাঝে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হল দেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রাণহানি। মূল পরীক্ষা বাতিল এবং তা পুনর্বার গ্রহণের মধ্যবর্তী মাত্র ৩৭ দিনে অন্তত ১২ জন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং আমাদের সমাজব্যবস্থার সংবেদনশীলতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
পরীক্ষার্থীদের এই অকাল মৃত্যু দেশের বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন এবং অভিভাবকদের তীব্র চিন্তায় ফেলেছে। প্রশ্ন ফাঁসের দুর্নীতির জেরে লক্ষাধিক মেধাবী পড়ুয়া যখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ায়, তখন তাদের পরিবারের ওপরও নেমে আসে চরম মানসিক চাপ। দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করার পর যখন এই ধরণের চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনা ঘটে, তখন সেই দুঃখজনক পরিস্থিতি কিশোর বা তরুণ মন সহজে মানতে পারে না।

প্রশাসনের ঢিলেঢালা মনোভাব এবং পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থার বারংবার সিদ্ধান্ত বদল শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের চরম হতাশা এবং ভয়ের জন্ম দেয়। পরীক্ষায় দুর্নীতির কারণে আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করা অত্যন্ত কঠিন এক প্রক্রিয়া। প্রথম পরীক্ষা বাতিল থেকে নতুন পরীক্ষার নির্দেশের মধ্যবর্তী ৩৭ দিনে একের পর এক মৃত্যুর খবর আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, শিক্ষাদানের এই পরিকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
ভারতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রবেশিকা পরীক্ষা অর্থাৎ নিট-ইউজি শুধু একটি সাধারণ পরীক্ষা নয়, এটি লক্ষ লক্ষ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের স্বপ্নপূরণের চাবিকাঠি। রাজস্থানের কোটা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন বড় শহরে গড়ে ওঠা কোচিং হাবগুলিতে দিন-রাত এক করে পড়াশোনা করে শিক্ষার্থীরা। বছরের পর বছর সামাজিক জীবন ত্যাগ করে নেওয়া এই প্রস্তুতির পর যখন দুর্নীতির খবর আসে, তখন তাদের পৃথিবী এক নিমেষেই ওলটপালট হয়ে যায়।
মনোবিদদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ব্যর্থতার ভয় এবং তার সঙ্গে পারিবারিক প্রত্যাশার চাপ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক বড় ধরনের মানসিক অবসাদের সৃষ্টি করে। যখন প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে এবং পরীক্ষার দিনক্ষণ বদলে যায়, তখন তাদের মনের ওপর সৃষ্টি হওয়া চাপ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। অনেক শিক্ষার্থীই এই তীব্র টানাপোড়েন সহ্য করতে না পেরে জীবনের চরম এবং অপ্রীতিকর সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলে।
অভিভাবক এবং সমাজের একাংশের অতিরিক্ত প্রত্যাশা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। ভালো কলেজে সুযোগ না পেলে জীবন ব্যর্থ—এই ধারণাই কোমল মনগুলিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন যখন এভাবে সিস্টেমের দুর্নীতির বালুচরে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে যায়, তখন জীবন ও ভবিষ্যতের প্রতি সমস্ত মোহ হারিয়ে ফেলে দেশের এই তরুণ সম্পদরা।
তদন্তকারী দলগুলি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের হদিশ পেয়েছে, যা প্রমাণ করে যে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন এই ব্যবস্থার পেছনে কাজ করছিল। বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই অসাধু চক্র ভারতের মেধাবী পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। সরকারি নিয়ামক সংস্থাগুলির নজরদারি ও সুরক্ষার কড়াকড়ির অভাবই আজ দেশের লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের অসন্তোষ এবং দেশজুড়ে আন্দোলনের জেরে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। শিক্ষাবিদদের মতে, একটি নিরপেক্ষ এবং দায়িত্বশীল পরীক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া ভবিষ্যৎ দেশ গড়া সম্ভব নয়। এই ধরণের কেলেঙ্কারী রুখতে পরীক্ষা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ খোলনলচে বদলে ফেলা এখন সময়ের দাবি, যাতে কোনো নিষ্পাপ শিক্ষার্থীকে অসৎ উপায়ে চলা ব্যবস্থাপনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে না হয়।
এছাড়াও প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কোচিং সেন্টারে নিয়মিত মানসিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। শিক্ষার্থীদের বোঝানো প্রয়োজন যে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা জীবন যুদ্ধের একটি অংশ মাত্র, জীবনের শেষ নয়। মেধার উপযুক্ত মূল্যায়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার বিষয়টিও পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা এবং রাষ্ট্রের সবার প্রথমে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এই চরম সংকটের সময়ে পড়ুয়াদের একা না রেখে পরিবার ও বন্ধুদের সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। মেধার চেয়ে মানসিক সুস্থতা এবং জীবনের মূল্য অনেক বেশি, এই বার্তা সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মনের কথা খুলে বলা এবং পেশাদার মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া জীবনের কঠিন পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার পথ দেখাতে পারে।
যদি আপনি বা আপনার কোনো পরিচিত ব্যক্তি এমন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বা প্রচণ্ড মানসিক অবসাদের মুখোমুখি হয়েছেন, তবে অনুগ্রহ করে অবিলম্বে পেশাদারি সাহায্য নিন। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এবং এই ধরণের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে ২৪ ঘণ্টা বিনামূল্যে কিছু হেল্পলাইন চালানো হচ্ছে। আপনি যেকোনো সময় টোল-ফ্রি নম্বর ১৮০০-২০৯-৪৩৫৩ অথবা ৯৯২২০০১১২২ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।
নিট-ইউজি পরীক্ষা বিতর্ককে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া এই ধারাবাহিক ছাত্রমৃত্যুর ঘটনা ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায় হয়ে থাকবে। দেশের যুবসমাজ কোনো দেশের মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ডকেই আজ এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হচ্ছে। পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তরুণ মনগুলিকে সুরক্ষাদানের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রকে এখন থেকেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হবে।



Post Comment