মহাকাশে নজিরবিহীন সাফল্য! নাসার সাহসী দুই মহাকাশচারী মেরামত করলেন অচল ‘রোবোটিক বাহু’

মহাকাশে নজিরবিহীন সাফল্য! নাসার সাহসী দুই মহাকাশচারী মেরামত করলেন অচল ‘রোবোটিক বাহু’

International

-Ritesh Ghosh

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) মানবজাতির অন্যতম সেরা প্রযুক্তিগত বিস্ময় তথা রোবোটিক বাহু ‘কানাডার্ম২’ (Canadarm2) সফলভাবে মেরামত করেছেন নাসার দুই সাহসী মহাকাশচারী। ক্রিস উইলিয়ামস এবং জেসিকা মেয়ার নামের এই দুই মহাকাশচারী মহাকাশে প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা করে এই অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ মেরামতের কাজ সম্পন্ন করেন। এই সফল মেরামতের মাধ্যমে স্টেশনের একটি অন্যতম প্রধান রক্ষণাবেক্ষণ যন্ত্র পুনরায় সচল করা সম্ভব হল।

গত ২৭ মে স্বাভাবিক কক্ষপথ অভিযানের সময় প্রায় দুই দশক পুরনো এই রোবোটিক বাহুটিতে যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেয়। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কব্জির জয়েন্টে (wrist joint) যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেওয়ায় এর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে মহাকাশ স্টেশনের কার্গো মহাকাশযান নোঙর করার কাজ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই নাসার প্রকৌশলীরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই জটিল মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনা নেন।

Astronauts repairing Canadarm2 on the International Space Station

কানাডার মহাকাশ সংস্থার তৈরি এই ৫৭ ফুট দীর্ঘ এবং প্রায় দেড় হাজার কেজি ওজনের রোবোটিক বাহুটি ২০০১ সালে স্পেস শাটল অ্যান্ডেভারের মাধ্যমে প্রথম আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে স্থাপন করা হয়েছিল। এটি কেবল স্টেশনের বাইরে ভারী বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম নাড়াচাড়াই করে না, বরং মহাশূন্যে ভাসমান মহাকাশচারীদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিরাপদে পৌঁছে দিতে লিফটের মতো কাজ করে। তাই এই অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্রটির সচল থাকা মহাকাশ স্টেশনের নিত্যদিনের জটিল কর্মকাণ্ডের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

নাসার এবারের অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ত্রুটিপূর্ণ কব্জির জয়েন্টটিকে সম্পূর্ণ নতুন একটি বা খুচরো অংশ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা। মহাকাশের অতিবেগুনি রশ্মি ও শূন্য মাধ্যাকর্ষণের অত্যন্ত কঠিন পরিবেশে এই কাজ করা অত্যন্ত দুরূহ। তা সত্ত্বেও ক্রিস উইলিয়ামস এবং জেসিকা মেয়ার নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে টানা ৭ ঘণ্টা ২০ মিনিটের প্রচেষ্টায় বিকল জয়েন্টটি সফলভাবে বদলে ফেলতে সক্ষম হন।

কাজের সময় মহাকাশচারীদের অতিবেগুনি রশ্মির বিকিরণ ও মহাকাশের চরম বৈরী তাপমাত্রা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে হয়েছিল। অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্ক্রু এবং বিশেষ বৈদ্যুতিক মহাকাশীয় সরঞ্জামের সাহায্যে এই নিখুঁত মেরামতের কাজ চালানো হয়। জেসিকা মেয়ার স্টেশনের ভিতর থেকে মিশন কন্ট্রোলের সাথে যোগাযোগের সমন্বয় করছিলেন এবং ক্রিস উইলিয়ামস রোবোটিক বাহুটির মূল যান্ত্রিক অংশে নতুন জয়েন্টটি নিখুঁতভাবে বসাতে সক্ষম হন।

দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা অত্যন্ত ক্লান্তিকর এই কাজের মাঝেও মহাকাশচারীদের জন্য ছিল কিছুটা রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। জয়েন্ট প্রতিস্থাপনের পর একটি সংক্ষিপ্ত বিরতির সময় ক্রিস উইলিয়ামস মহাকাশ স্টেশনের বাইরে শূন্যে ভাসমান অবস্থাতেই ক্যামেরা বের করে মহাকাশের চোখধাঁধানো রূপ ফ্রেমবন্দি করেন। পৃথিবী থেকে শত শত কিলোমিটার উঁচুতে শূন্যে ভেসে চাঁদের এক অপরূপ ও কাল্পনিক রূপের মায়াবী ছবি তোলেন তিনি, যা পরে নাসার মাধ্যমে পুরো বিশ্বে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

এই স্পেসওয়াকটি করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক যুক্ত হল। এটি ছিল মহাকাশ স্টেশনের সচলতা নিশ্চিতকরণে পরিচালিত সর্বমোট ২৮৮তম পূর্ণাঙ্গ স্পেসওয়াক। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার বিচারে এটি জেসিকা মেয়ারের জন্য ছিল মহাকাশের শূন্যতায় হাঁটার পঞ্চম অভিযান। অন্যদিকে, ক্রিস উইলিয়ামসও নিজের মেধার প্রমাণ দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো এই গৌরবময় স্পেসওয়াকের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন।

নাসার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, মেরামত সফল হওয়ার পর কানাডার্ম২ বাহুটিকে অবিলম্বে তার পূর্বের স্বাভাবিক কার্যকলাপে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তবে এই অভিযানের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি হল, মহাকাশ স্টেশনের বাইরে খুলে নেওয়া ত্রুটিপূর্ণ কব্জির জয়েন্টটিকে খুব শীঘ্রই একটি ফিরতি মহাকাশযানে করে পৃথিবীতে ফেরত পাঠানো হবে। সেখানে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগারে এর চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব হয়।

পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা রোবোটিক জয়েন্টটিকে গবেষণাগারে উন্নত ও পুনঃসংস্করণ করার পরিকল্পনা রয়েছে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের। কারণ এই ধরনের অত্যন্ত ব্যয়বহুল রোবোটিক যন্ত্রাংশ পুনর্ব্যবহার করতে পারলে সামগ্রিক মহাকাশ অভিযানের বিশাল খরচ অনেকটাই সাশ্রয় হবে। নাসা বর্তমানে আন্তর্জাতিক লুনার গেটওয়ে বা চন্দ্র কক্ষপথের স্টেশনের জন্য যে নতুন প্রযুক্তির রোবোটিক আর্ম তৈরি করছে, সেখানেও এই গবেষণা থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যাবে।

এই ধরনের আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মিশনগুলোতে বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম জড়িয়ে থাকে। কানাডার মহাকাশ সংস্থা ও নাসার মহাকাশ বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে এই পুরো মেরামত প্রকল্পের ব্লু-প্রিন্ট বা নকশা তৈরি করেছিলেন। মহাকাশে যেকোনও বড় ধরনের মিশনকে সফল করতে বিজ্ঞানীদের মধ্যে যে বিশ্বব্যাপী সমন্বয় ও সম্মিলিত প্রয়াসের প্রয়োজন রয়েছে, তার এক সার্থক টেকনিক্যাল উদাহরণ হয়ে রইল এই অভিযানটি।

মহাকাশের অতিশীতল ও অতিউষ্ণ তাপমাত্রার চরম বৈপরীত্যে যেকোনো যান্ত্রিক কাঠামোই সময়ের সাথে সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সময়োপযোগী দূরদর্শিতা এবং মহাকাশচারীদের নিখুঁত বাস্তবায়ন দেখিয়েছে কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও মহাকাশের বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিরলস প্রচেষ্টা ও সফল মহাকাশ বিজ্ঞানের মাধ্যমে আইএসএস আগামী আরও বেশ কয়েক বছর মানবজাতির মহাকাশ গবেষণার অন্যতম সেরা ক্ষেত্র হিসেবে সগৌরবে টিকে থাকবে।

নাসার এই সফল উদ্যোগ প্রমাণ করে যে মহাকাশের কোনও জটিল সংকটই মানুষের অদম্য বিজ্ঞানচেতনার কাছে মোটেও বাধা হতে পারে না। ক্রিস উইলিয়ামস এবং জেসিকা মেয়ারের এই দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানপ্রেমীদের মহাকাশ গবেষণায় অত্যন্ত প্রবলভাবে উদ্বুদ্ধ করবে। সর্বোপরি, এই অনন্য মেরামত কার্যকরের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে মহাকাশ অভিযানের নিরাপত্তার ক্ষেত্রটি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল ও মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হল।

Previous post

Profitable Business Idea: গ্রামের ঘরে ঘরে যেন ‘পৌষমাস’, দু’হাত ভরে আয় করছেন মহিলারা! এই ব্যবসায় ‘বড়লোক’ হওয়া ঠেকানো যাবে না

Next post

শ্রেয়সের অধিনায়কোচিত ইনিংস,হাফসেঞ্চুরি করলেন অভিষেক,চাপে পড়েও প্রথম টি-২০-তে বড় রান তুলল ভারত

Post Comment

You May Have Missed