গ্রেফতার তৃণমূল নেতা দেবরাজ চক্রবর্তী! পুরুলিয়া থেকে পাকড়াও করল পুলিশ
West Bengal
-Ritesh Ghosh
বিধাননগর পুরনিগমের প্রাক্তন মেয়র পারিষদ তথা প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা দেবরাজ চক্রবর্তীকে গ্রেফতার করল রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)। পুরুলিয়ার সদর থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টে তার দায়ের করা আগাম জামিনের আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ার পরেই অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই পদক্ষেপ করল পুলিশ। এই ঘটনায় উত্তর ২৪ পরগনা জেলা তো বটেই, সামগ্রিকভাবে রাজ্য রাজনীতিতেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
বেশ কিছুদিন ধরেই গ্রেফতারির হাত থেকে বাঁচতে নানা ধরনের আইনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তৃণমূল নেতা দেবরাজ। তবে শেষরক্ষা হল না। উচ্চ আদালত তার আর্জি প্রত্যাখ্যান করার পর থেকেই তার গতিবিধির উপর কড়া নজরদারি রাখছিলেন তদন্তকারীরা। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে এসটিএফের একটি বিশেষ দল পুরুলিয়ায় হানা দেয়। সেখান থেকে তাকে আটক করার পর রাতেই কলকাতায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং গ্রেফতারির খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

বঙ্গ রাজনীতিতে দেবরাজ চক্রবর্তী ও তার স্ত্রী অদিতি মুন্সি অত্যন্ত পরিচিত নাম। বিশিষ্ট লোকসঙ্গীত শিল্পী অদিতির বিপুল জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে এই দম্পতি এলাকায় নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন বলে অভিযোগ। তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেই এই প্রভাবশালী দম্পতির বিরুদ্ধে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে, যা শেষপর্যন্ত তাঁদের বড়সড় আইনি সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় সবচেয়ে গুরুতর বিষয়টি হল বিপুল পরিমাণ বেনামি সম্পত্তি হস্তান্তর। অভিযোগ উঠেছে, ভোটের ঠিক আগে অদিতি মুন্সি এবং তাঁর স্বামী দেবরাজ তাদের মালিকানাধীন অন্তত ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তি অত্যন্ত গোপনে আত্মীয়স্বজন, ঘনিষ্ঠ মহল ও পরিচিতদের নামে স্থানান্তর করেছেন। শুধু তাই নয়, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে ভোটে দাঁড়ানোর সময় অদিতি মুন্সি তাঁর নির্বাচনী হলফনামায় নিজের সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য অনেক কম দেখিয়েছেন বলেও অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল।
এর বাইরেও রাজারহাট, গোপালপুর এবং বাগুইআটি থানা এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে তোলাবাজি, বেআইনি সিন্ডিকেট চালানো এবং জোরপূর্বক জমি দখলের মতো একাধিক অভিযোগ রয়েছে দেবরাজের বিরুদ্ধে। স্থানীয় স্তরে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সব অসামাজিক কর্মকাণ্ডের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেবরাজের নামই বারবার উঠে এসেছে। এই সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখার পরেই পুলিশের তরফে কঠোর পদক্ষেপ করা হয়েছে।
গ্রেফতারির আশঙ্কা তৈরি হতেই এই রাজনীতিক দম্পতি নিজেদের বাঁচার তাগিদে কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেন। তাদের হয়ে সওয়াল করেছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী তথা বর্ষীয়ান বাম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। গত ২৪ জুন বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। অদিতি ছাড় পেলেও দেবরাজের রেহাই মেলেনি।
শুনানি শেষে বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত জানান যে অদিতি মুন্সির চার মাসের শিশুসন্তান রয়েছে। এই মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদালত অত্যন্ত সহানুভূতি দেখিয়ে তাঁর আগাম জামিন মঞ্জুর করেছে। তবে অদিতির বিদেশ যাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং পাসপোর্ট অবিলম্বে নিম্ন আদালতে জমা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও নিজের নির্বাচনী ক্ষেত্র হওয়া সত্ত্বেও বাগুইআটি থানা এলাকায় আগামিদিনে তাঁর প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আদালত। অন্যদিকে, দেবরাজ চক্রবর্তীর আগাম জামিনের আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে হাইকোর্ট। ফলে কোনও আইনি ঢাল না থাকায় রাজ্য পুলিশের এসটিএফ-এর পক্ষে তাকে গ্রেফতারিতে কোনও বাধা ছিল না।



Post Comment