‘মমতার জন্যই বাংলায় বিজেপির বাড়বাড়ন্ত’! বিস্ফোরক রেবন্ত রেড্ডি, অস্বস্তি বিরোধী জোটে
India
-Ritesh Ghosh
জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধী জোটের সমীকরণ যখন এক নতুন মোড় নিচ্ছে, ঠিক তখনই তেলাঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক আলোড়ন তৈরি হল। কংগ্রেসের এই হেভিওয়েট নেতার দাবি, তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং শাসনপ্রণালীর খামতির কারণেই পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নিজেদের জমি শক্ত করতে পেরেছে। সর্বভারতীয় স্তরে বিরোধী ঐক্য বজায় রাখার চেষ্টার মধ্যেই এই আক্রমণাত্মক মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই নতুন বিতর্ককে উস্কে দিয়েছে।
হায়দরাবাদে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে রেবন্ত রেড্ডি সাফ জানান, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তেলাঙ্গানার তুলনা চলে না। তাঁর মতে বঙ্গে যেভাবে তৃণমূল রাজত্বে বিজেপি ক্রমশ প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে উঠে এসেছে, তেমন পরিস্থিতি তেলাঙ্গানায় তৈরি হতে দেওয়া হবে না। রাজ্যে নিজের সরকারের কাজের ওপর আস্থা রেখে তিনি দাবি করেন, কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীন সেখানে বিজেপির পক্ষে কোনওভাবেই জমি দখল করা সম্ভব নয়।

তেলাঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন যে, তৃণমূল কংগ্রেসের জনবিরোধী নীতি ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম শিবির অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করেছে। কংগ্রেসের হাত শক্ত থাকলে কোনও দক্ষিণ বা পূর্বের রাজ্যে বিজেপি এই ধরনের রাজনৈতিক সুযোগ নিতে পারবে না। তাঁর এই দাবি মূলত বিরোধী শিবিরের অন্দরেই তৃণমূলের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে।
কংগ্রেস নেতার এই কড়া ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কংগ্রেসের সর্বভারতীয় নেতৃত্ব যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিচ্ছেন, সেখানে দলের একজন মুখ্যমন্ত্রীর এমন মন্তব্য সর্বভারতীয় কংগ্রেসের অন্দরেও অস্বস্তি বাড়িয়েছে।
রাজনৈতিক সূত্রের খবর, লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সম্প্রতি নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতির পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করে সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানান। অন্যদিকে, দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে কালীঘাট তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ইউপিএ চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধীর মধ্যে আন্তরিক সৌজন্য বিনিময় হতে দেখা গিয়েছে। এই শীর্ষস্তরের সমঝোতার আবহে রেবন্তের এই আক্রমণ দলের সমন্বয়ের অভাবকেই স্পষ্ট করে দিচ্ছে।
বলা ভালো, দিল্লিতে লোকসভা নির্বাচনের পরবর্তী রণকৌশল নির্ধারণে একযোগে কাজ করার বার্তা দিয়েছিলেন বিরোধী শিবিরের নেতারা। সেই বৈঠকের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছিলেন। একইভাবে তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও রাহুল গান্ধীর আলোচনা হয়েছিল বঙ্গে বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং জোটের কৌশল নিয়ে।
মহাজোটের এই টানাপোড়েনের মাঝে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রেবন্ত রেড্ডির এই বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নীতির পরিপন্থী। তবে তেলাঙ্গানার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের রাজ্যে বিজেপির উত্থান রুখতে অত্যন্ত কড়া বার্তা দিতে চেয়েছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, বিজেপির মোকাবিলায় দক্ষিণের মাটিতে কংগ্রেস অন্যান্য আঞ্চলিক দলের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গে সাম্প্রতিক বিধানসভা ভোটের ফলাফল এবং তৃণমূলের পরাজয়ের পর বিজেপির সরকার গঠন জাতীয় রাজনীতিতে এক বিরাট বদল এনেছে। এই জয়ের সুবাদে বিজেপি যখন দেশের পূর্বপ্রান্তে নিজেদের শক্তি জাহির করছে, তখন তেলাঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী দেশের বাকি অংশের আঞ্চলিক শক্তিগুলির সঙ্গে এক লাইনে দাঁড়াতে নারাজ। তিনি স্পষ্ট করতে চেয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের মতো প্রশাসনিক ব্যর্থতার ইতিহাস তেলাঙ্গানায় পুনরাবৃত্তি হবে না।
এদিকে তেলাঙ্গানায় নিজেদের ভিত সুসংহত করতে রেবন্ত রেড্ডির এই ‘আগ্রাসী’ ভঙ্গি কেবল বিজেপির বিরুদ্ধেই নয়, বরং বকলমে অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলির শাসন ক্ষমতার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। তেলাঙ্গানায় কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখাই এখন রেবন্তের প্রধান লক্ষ্য। এর জন্য প্রয়োজনে তিনি দলের জাতীয় স্তরের মিত্রদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পিছপা হচ্ছেন না, যা তৃণমূল শিবিরের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
যদিও রেবন্ত রেড্ডির এই আক্রমণের পর তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এখনও কোনও বড়সড় আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি, কিন্তু দলের নীচু স্তরে এই নিয়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্ব মনে করছেন, এই ধরনের মন্তব্য জোটধর্মের পরিপন্থী। যে সময়ে দল বিরোধী ঐক্যকে আরও মজবুত করতে চাইছে, সেই সময়ে শরিক দলের মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে এমন উক্তি রাজনৈতিকভাবে অনভিপ্রেত ও ক্ষতিকর।
অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তৃণমূল ও কংগ্রেসের এক মঞ্চে থাকা নিয়ে শুরু থেকেই পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় স্তরে দুই দলের বোঝাপড়ায় বিস্তর জটিলতা ছিল। প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব বঙ্গে তৃণমূলের সঙ্গে আসন সমঝোতা বা রাজনৈতিক জুটিতে বরাবরই আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। এবার খোদ তেলাঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা সেই দ্বৈরথকেই জাতীয় স্তরে আবার উস্কে দিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে এই ধরনের বক্তব্য আসলে এই রাজ্যের সাধারণ কংগ্রেস কর্মীদের মনোভাবেরই সামাজিক প্রতিফলন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মূল কারণ খুঁজতে গিয়ে যেভাবে খোদ কংগ্রেসের দলীয় মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূলের শাসন প্রণালী ও দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন, তা আগামী দিনে বিজেপি বিরোধী জোটে এক মারাত্মক ফাটল ধরাতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিরোধী জোটের ভবিষ্যৎ এবং দেশের বড় রাজ্যগুলিতে বিজেপির মোকাবিলায় কংগ্রেস কতটা সফল হবে, তা আগামী দিনই বলবে। তবে রেবন্ত রেড্ডির এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দিল যে, কেন্দ্রের জোটের সমীকরণ যাই হোক না কেন, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের স্থানীয় নেতৃত্ব নিজেদের স্বার্থেই আঞ্চলিক শক্তিগুলির উপর চাপ বজায় রাখার কৌশল নিয়ে চলতে চান।



Post Comment