ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেনের যাত্রা শুরু! রেলযাত্রার ইতিহাসে এক নতুন সবুজ বিপ্লবের সূচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী

India

-Ritesh Ghosh

ভারতীয় রেলের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ও পরিবেশবান্ধব অধ্যায়ের সূচনা হল। হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত রেল শাখায় ভারতের প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল চালিত ট্রেনের যাত্রার সূচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই গ্রিন রেল প্রযুক্তির হাত ধরে সবুজ ও দূষণমুক্ত গণপরিবহণ ব্যবস্থার এক সম্পূর্ণ নতুন যুগে প্রবেশ করল ভারত। পরিবেশ দূষণ রোধে এটি ভারতীয় রেলের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

জিন্দ থেকে গোহানা হয়ে সোনিপত রুটের এই পাইলট প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হল ভারতীয় রেলের মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রেল নেটওয়ার্কে হাইড্রোজেন শক্তি ব্যবহারের ব্যবহারিক উপযোগিতা যাচাই করা। এই সফল উদ্বোধনের মাধ্যমে ভারত এখন জার্মানি, জাপান, চিন এবং আমেরিকার মতো বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশের এলিট ক্লাবে নিজের নাম লেখাল, যারা রেল পরিবহণে অত্যন্ত সফলভাবে হাইড্রোজেন প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রয়োগ ঘটিয়েছে।

India s first indigenous hydrogen-powered train inaugurated by PM Modi

পরিবেশবান্ধব এই ট্রেনটির নকশা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করা হয়েছে ভারতের রিসার্চ ডিজাইন অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশন বা আরডিএসও (RDSO)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। এই বিশেষ প্রকল্পটি ভারত সরকারের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি ‘জাতীয় গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন’-এর অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি আগামী দিনে কয়লা ও ডিজেল চালিত ট্রেনের বিকল্প হিসেবে ভারতীয় রেলের সবুজায়নকে ত্বরান্বিত করবে।

প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় হাইড্রোজেন গ্যাসের কার্যক্ষমতা অনেক বেশি। সাধারণ ডিজেল যেখানে প্রতি কেজিতে প্রায় ৪৩ মেগাজুল শক্তি উৎপন্ন করে, সেখানে প্রতি কেজি হাইড্রোজেন থেকে প্রায় ১২০ মেগাজুল শক্তি পাওয়া সম্ভব। এই বিপুল শক্তির কারণে হাইড্রোজেন ট্রেনের পারফরম্যান্স প্রথাগত ডিজেল ইঞ্জিনের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। পাশাপাশি এটি ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকারক কার্বন কণার পরিমাণ প্রায় শূন্যে নেমে আসে।

এই ট্রেনের মূল চালিকাশক্তি হল ১,২০০ কিলোওয়াটের একটি ‘প্রোটন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেন ফুয়েল সেল’ বা পিইএমএফসি (PEMFC)। ট্রেনের ছাদে হাইড্রোজেন ড্রাইভিং পাওয়ার কারের ভেতরে উচ্চ চাপে সংকুচিত হাইড্রোজেন গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি থাকে। সিলিন্ডার থেকে হাইড্রোজেন গ্যাস যখন ফুয়েল সেলে প্রবেশ করে, তখন প্ল্যাটিনাম অনুঘটকের সাহায্যে হাইড্রোজেন অণুগুলি ভেঙে প্রোটন ও ইলেকট্রনে বিভক্ত হয়। এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন ইলেকট্রনের নিয়ন্ত্রিত প্রবাহই ট্রেন চালানোর প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ শক্তি তৈরি করে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া চলাকালীন চারপাশের বাতাস থেকে নেওয়া অক্সিজেন হাইড্রোজেনের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে। এই বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর একমাত্র উপজাত পদার্থ হিসেবে বেরিয়ে আসে সামান্য জলীয় বাষ্প এবং উত্তাপ। এখানে কোনো রকম দহন বা ধোঁয়া তৈরি হয় না, যার ফলে কোনও কার্বন নিঃসরণ ঘটে না। এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি সম্পূর্ণ নীরব এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে অত্যন্ত সহায়ক।

এখানেই শেষ নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার পাশাপাশি ট্রেনের জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য একটি অত্যাধুনিক শক্তি সঞ্চয় পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এই ট্রেনে উন্নত লিথিয়াম আয়রন ফসফেট বা এলএফপি (LFP) ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে। ট্রেনটি যখন ব্রেক কষে, তখন উৎপন্ন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বা ‘রিজেনারেটিভ ব্রেকিং এনার্জি’ এই ব্যাটারিতে সঞ্চিত হয়। পরবর্তীতে ট্রেনটি যখন দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করে, তখন এই শক্তি বাড়তি শক্তি হিসেবে কাজ করে ও হাইড্রোজেনের ব্যবহার অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

দেশীয় প্রযুক্তিতে নতুন রূপে সেজে ওঠা ১০ কোচের এই হাইড্রোজেন ট্রেনে রয়েছে দুটি হাইড্রোজেন ড্রাইভিং পাওয়ার কার এবং আটটি সাধারণ ট্রেলার কোচ। ট্রেনটিতে একসঙ্গে প্রায় ২,৬০০ জন যাত্রী অত্যন্ত নিরাপদে ও আরামদায়কভাবে যাতায়াত করতে পারবেন। এই দ্রুতগামী ট্রেনের সর্বোচ্চ ডিজাইন গতিবেগ ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার হলেও, বর্তমান ট্র্যাকে যাত্রী সুরক্ষার স্বার্থে ট্রেনটিকে সর্বোচ্চ ৭৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিবেগে চালানোর ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

যাত্রী সুবিধার্থে ও বোঝার সুবিধার্থে ট্রেনের প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটি নিচে একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হল।

প্রযুক্তিগত দিক বিস্তারিত তথ্য
কোচের বিন্যাস ১০টি কোচ (২টি পাওয়ার কার এবং ৮টি ট্রেলার কোচ)
সর্বোচ্চ যাত্রী ধারণ ক্ষমতা প্রায় ২,৬০০ জন যাত্রী
ডিজাইন ও ট্রায়াল গতিবেগ ডিজাইন ১১০ কিমি/ঘণ্টা এবং ট্রায়াল গতিবেগ ৭৫ কিমি/ঘণ্টা
ফুয়েল সেলের ধরণ ও ক্ষমতা ১,২০০ কিলোওয়াট পিইএমএফসি (PEMFC)
রিফুয়েলিং স্টেশন জিন্দ (হরিয়ানা), ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৩,০০০ কেজি

নতুন এই ট্রেনের যাত্রা সচল রাখতে হরিয়ানার জিন্দ জংশনে ভারতের বৃহত্তম হাইড্রোজেন স্টোরেজ এবং রিফুয়েলিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। এই স্টেশনটিতে একসঙ্গে প্রায় ৩,০০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হাইড্রোজেন গ্যাস মজুত রাখার আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। এই সম্পূর্ণ রিফুয়েলিং পরিকাঠামোটি ভারতের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভস সেফটি অর্গানাইজেশন (PESO)-র কাছ থেকে আইনগত ও কারিগরি অনুমোদন পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মানদণ্ড যেমন NFPA-2 এবং ISO 19880 কঠোরভাবে মেনে এই হাইড্রোজেন রিফুয়েলিং স্টেশনটি পরিচালনা করা হবে। এই উন্নত পরিকাঠামোটির সামগ্রিক নিরাপত্তা স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করেছে জার্মানির বিখ্যাত নিরাপত্তা যাচাইকারী সংস্থা ‘টুভ সুড’ (TUV SUD)। ফলে হাইড্রোজেন রিফুয়েলিংয়ের মতো অতি সংবেদনশীল কাজে নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো খামতি রাখা হয়নি। প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা এই স্টেশনটিকে নিবিড় নজরদারিতে রাখা হবে।

অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা এড়াতে ট্রেনটিতে বসানো হয়েছে অত্যন্ত সংবেদনশীল হাইড্রোজেন লিক ডিটেক্টর এবং থার্মাল বা ফ্লেম সেন্সর। এছাড়াও স্বয়ংক্রিয় হাইড্রোজেন গ্যাস শাট-অফ ভালভ এবং ককপিটে লোকো পাইলটদের সতর্ক করার জন্য রিয়েল-টাইম স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উদ্বোধনী এবং প্রাথমিক ধাপের পরীক্ষাগুলির সময় যেকোনও পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রেনের ভেতরে সর্বদা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কারিগরি দলের সদস্যরা উপস্থিত থাকবেন।

জিন্দ, গোহানা এবং সোনিপত স্টেশনের যাত্রী পরিবহণের পাশাপাশি এই ট্রেনটি ভারতীয় রেলকে সবুজ জ্বালানি ব্যবহারের দিকে এক ধাপ এগিয়ে দিল। রেল কর্তৃপক্ষ আগামী দিনে দেশের আরও কয়েকটি সেকশনে এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ককে কার্বন-মুক্ত করার যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ভারতীয় রেল গ্রহণ করেছে, এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সেই অভিমুখে অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করল।

Previous post

গোপন সমঝোতার অভিযোগ উড়িয়ে মার্কিন আদালতে মুখ খুললেন গৌতম আদানি, কী বললেন শিল্পপতি?

Next post

মুর্শিদাবাদে রেল দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য রেলের, তদন্ত কমিটি গড়ে কড়া পদক্ষেপ

Post Comment

You May Have Missed