গোপন সমঝোতার অভিযোগ উড়িয়ে মার্কিন আদালতে মুখ খুললেন গৌতম আদানি, কী বললেন শিল্পপতি?

India

-Ritesh Ghosh

মার্কিন আদালতে হলফনামা পেশ করে আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহারের আবেদনে কোনও গোপন চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি ছিল না। মার্কিন বিচার বিভাগের (DOJ) মামলা খারিজের সিদ্ধান্তের পিছনে কোনও ধরনের আর্থিক লেনদেন বা সুবিধার ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা তিনি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশে জমা দেওয়া আদানির এই হলফনামাটি ভারতের এই শীর্ষ শিল্পপতির আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিউ ইয়র্কের মার্কিন জেলা আদালত গত ৮ জুলাই গৌতম আদানিকে একটি নির্দেশ দিয়েছিল। বিচারক তাঁর কাছে জানতে চান, বিচার বিভাগের মামলা প্রত্যাহারের আবেদনের পিছনে কোনও গোপন বোঝাপড়া বা সুবিধা প্রদানের বিষয় রয়েছে কিনা। সেই নির্দেশনার প্রেক্ষিতেই এই শপথপত্র জমা দেন আদানি। আদানির এই জোরালো অবস্থান মার্কিন আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় একটি বড় বাঁক তৈরি করেছে।

Gautam Adani filing affidavit in US court

হলফনামায় গৌতম আদানি বলেন, এই মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াটির সঙ্গে কোনও ধরনের গোপন লেনদেনের বিষয় জড়িত ছিল বলে তাঁর জানা নেই। ফৌজদারি অভিযোগ বাতিলের বিনিময়ে কোনও মূল্যবান জিনিস বা সুবিধা দেওয়ার কোনো চুক্তি বা প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আদানির আইনি দল আদালতে সমস্ত সংশয় দূর করার জন্য এই বক্তব্যটি লিখিত আকারে পেশ করেছে।

২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের শেষ সময়ে গৌতম আদানি ও অন্য সাতজনের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এতে অভিযোগ করা হয় যে, ভারতে বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি পাওয়ার জন্য ভারতীয় কর্মকর্তাদের প্রায় ২৫ কোটি ডলার ঘুষ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং মার্কিন বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। আদানি গোষ্ঠী প্রথম থেকেই এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করে আসছে।

সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ এই ফৌজদারি মামলাটি সম্পূর্ণ এবং চিরতরে (উইথ প্রেজুডিস) খারিজ করার আবেদন জানায়। এই আবেদন মঞ্জুর হলে মামলাটি পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। এর পরেই সংবাদমাধ্যমে জল্পনা শুরু হয় যে, আমেরিকায় আদানি গোষ্ঠীর বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির কারণেই হয়তো এই ফৌজদারি মামলা থেকে তাঁদের অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে।

বিনিয়োগের বিষয়টি স্পষ্ট করতে গিয়ে গৌতম আদানি তাঁর হলফনামায় বলেন, আমেরিকায় ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনাটি অনেক আগেই করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর এই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্যে আনা হয়, যা আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযোগের খবর জনসমক্ষে আসার আগের ঘটনা। ফলে মামলা খারিজের সঙ্গে এই বিনিয়োগের সরাসরি কোনও যোগসূত্র নেই।

আদানির আইনি পরামর্শদাতা সংস্থা ‘সালিভান অ্যান্ড ক্রমওয়েল এলএলপি’ মার্কিন বিচার বিভাগ ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (SEC) সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে। সেখানে তারা বেশ কিছু আইনি নথি ও বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন পেশ করে। আদালতের হলফনামা অনুযায়ী, আইনি দল মার্কিন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল যে সরকার চাইলে স্বাভাবিক নিয়মেই এই বিনিয়োগ প্রস্তাব বিবেচনা করতে পারে। তবে মার্কিন বিচার বিভাগ জানায় যে এই প্রস্তাব মামলা খারিজের সিদ্ধান্তে কোনও প্রভাব ফেলবে না।

গত ৪ জুলাই মার্কিন বিচার বিভাগও একটি পিটিশন দাখিল করে সংবাদমাধ্যমের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল। সরকারি কৌঁসুলিরা সাফ জানান, আদানি গোষ্ঠীর বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সঙ্গে মামলা প্রত্যাহারের কোনও সম্পর্ক নেই। তাদের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আইনি ও উপযুক্ত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে। মামলাটি বাতিলের সিদ্ধান্তের পিছনে কোনও অঘোষিত বোঝাপড়া কাজ করেনি বলেই মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

মার্কিন অ্যাসোসিয়েট ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আর. ট্রেন্ট ম্যাককটারও এই মামলা প্রত্যাহার সংক্রান্ত শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আদালতের কাছে স্পষ্ট করে বলেন, কোনও বিনিয়োগের প্রস্তাবের কারণে সিকিউরিটিজ জালিয়াতির মামলা প্রত্যাহারের খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিনিয়োগের বিষয়টি উল্লেখ না থাকলেও তিনি নিজে এই মামলা খারিজের পক্ষেই সওয়াল করতেন।

ম্যাককটার যুক্তি দেন, এই সিকিউরিটিজ প্রতারণার মামলাটি আইনিভাবে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন ছিল। কথিত অপরাধের বেশিরভাগটাই ঘটেছে ভারতে এবং ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এতে সরাসরি কোনও বেআইনি কাজের প্রমাণ পায়নি। এছাড়াও, মার্কিন বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ক্ষতির কোনও স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি। অধিকাংশ সাক্ষী ও প্রধান প্রমাণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকায় এবং অভিযুক্তদের মার্কিন আদালতে হাজির হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকায় মামলা এগিয়ে নেওয়া অসম্ভব ছিল।

এর পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের পরিবর্তিত বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের কথাও মার্কিন বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে বিদেশি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির চেয়ে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ের তদন্ত বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এই নীতিগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও মার্কিন বিচার বিভাগ ফরেন করাপ্ট প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট (FCPA)-এর আওতায় থাকা এই মামলাটিকে তাদের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

বিচারক নিকোলাস গারাউফিস এখনও এই মামলা বাতিলের চূড়ান্ত রায় দেননি। তিনি মনে করেন, বিচার বিভাগ ও আদানির আইনি দলের যুক্তি থেকে কিছু অপ্রকাশিত বোঝাপড়ার প্রশ্ন উঠতে পারে, যা আগে আদালতকে জানানো হয়নি। বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং কোনো রকম সন্দেহ দূর করতেই তিনি এই হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

মামলাটি নিয়মানুযায়ী বাতিল করার আগে মার্কিন আদালত নিশ্চিত হতে চায় যে বিচার বিভাগের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো যৌক্তিক এবং এখানে কোনও ধরনের অনৈতিক সমঝোতা হয়নি। আদানির হলফনামা এবং দু’পক্ষের আইনি বক্তব্য পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ে দেখার পরেই আদালত আগামী দিনে এই মামলা প্রত্যাহারের প্রস্তাবের ওপর চূড়ান্ত রায় দেবে।

Previous post

Ghatal Flood Like Condition: গভীর নিম্নচাপে ফুঁসছে শিলাবতী, চেনা ফর্মে ঘাটাল! ফের কী ভেসে যাবে গোটা এলাকা? চারিদিকে ত্রাহি ত্রাহি রব

Next post

ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেনের যাত্রা শুরু! রেলযাত্রার ইতিহাসে এক নতুন সবুজ বিপ্লবের সূচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী

Post Comment

You May Have Missed