বিজেপির শেষ দেখে ছাড়বেন! তৃণমূলের ডামাডোল নিয়েও বিস্ফোরক মমতা
Kolkata
-Ritesh Ghosh
কালীঘাট তৃণমূল কংগ্রেসের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও দীর্ঘদিনের বিধায়ক মদন মিত্র আচমকা দল ছেড়ে তৃণমূলেরই বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়ার পরেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। হেভিওয়েট এই নেতার দলত্যাগের পর আর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সরাসরি ময়দানে নেমেছেন কালীঘাট তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তড়িঘড়ি ফেসবুক লাইভে এসে তিনি কেবল দলত্যাগীদেরই নিশানা করেননি, বরং কড়া ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছেন বিজেপি বিরুদ্ধেও।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তোপ দেগে মদন মিত্র তৃণমূলের অন্দরে থাকা বিদ্রোহী শিবিরে নিজের জায়গা নিশ্চিত করেছেন, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের এই নাটকীয় শিবির বদল প্রসঙ্গে মদন মিত্র মন্তব্য করেছেন যে, তিনি আসলে বিধানসভায় শুধু নিজের বসার ঘরটি পরিবর্তন করেছেন মাত্র। তবে এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে একটি প্রধান শর্ত ছিল, যা দল মেনে নেয়নি। মদন মিত্রের দাবি ছিল, দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে অন্তত ছয় মাসের জন্য সমস্ত রাজনৈতিক দায়িত্ব ও পদ থেকে দূরে সরে যেতে হবে।

মদন মিত্রের এই বিদায়ে তৃণমূলের যে বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না, তা স্পষ্ট করে দিতে নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে সুর চড়িয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বিজেপিকে টার্গেট করে দাবি করেছেন, কেন্দ্রীয় শাসক দল অত্যন্ত নোংরা উপায়ে তাঁর ক্ষতি করার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং রাজনৈতিকভাবে শেষ করতে চাইছে। অত্যন্ত ক্ষুব্ধ কণ্ঠে নেত্রী লাইভে বলেন, “বিজেপি চেয়েছিল আমার যেন হার্ট অ্যাটাক হয়। কিন্তু আমি ওদের শেষ দেখে ছাড়ব, তার আগে আমার কিছু হবে না।” রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই চালানের হুঙ্কার দেন তিনি।
দল থেকে মদন মিত্র বিদায় নেওয়ার সময় দলনেত্রীর ভাইপোর বিরুদ্ধেই সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে সম্পূর্ণ আস্থার সাথে দাঁড়িয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তের পিছনে অভিষেকের কোনও দায় নেই। আসলে মদন মিত্রের পরিবারকে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ইডি যেভাবে তলব করেছিল, সেই চাপের মুখে পড়েই তিনি ভয় পেয়ে দল ছেড়েছেন। দলনেত্রীর স্পষ্ট বক্তব্য, পরিবারকে ইডি ও সিবিআইয়ের হাত থেকে বাঁচাতেই এই পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
অভিষেকের রাজনৈতিক একাগ্রতার প্রশংসা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, যখনই দলের ওপর আক্রমণ আসে, তখনই বিজেপি অভিষেককে কেবল অজুহাত হিসেবে দাঁড় করায়। তিনি জানান, অভিষেকের পরিবারের সদস্যদের একের পর এক সমন পাঠানো সত্ত্বেও তিনি মাথা নত করেননি। নেত্রী বলেন, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে অজুহাত করা হয়েছে। ওর পরিবারের সকলকে টানা ডাকা হচ্ছে। ও চাইলে বিজেপি-র সাথের আপস করে অনেক সহজেই স্বস্তি পেতে পারত। কিন্তু ও যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালায়নি।” দলের জন্য বীরের মতো লড়াই চালানোর জন্য অভিষেকের সমস্ত ছোটখাটো ভুলকে তিনি মার্জনাও করে দিয়েছেন।
দলত্যাগীদের সরাসরি ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে উল্লেখ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন। মমতা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বজায় রাখার স্বার্থে তিনি কখনও নিজের ‘বিবেক’ এবং নীতি বিক্রি করবেন না। তাঁর অভিযোগ, যারা বর্তমানে আদর্শ ত্যাগ করে অন্য শিবিরে চলে যাচ্ছেন, তারা প্রত্যেকেই কোনও না কোনওভাবে কেন্দ্রীয় পুলিশ এবং তদন্তকারী এজেন্সির আতঙ্কে ভুগছেন। নিজেদের বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পত্তি ও পুরনো ভুলভ্রান্তি ঢাকতেই তারা এই পথ বেছে নিচ্ছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও দাবি করেন, মোদী সরকারের কেন্দ্রীয় এজেন্সির অপপ্রয়োগের কারণেই তৃণমূলের কিছু দুর্বলচিত্তের নেতা আজ আত্মসমর্পণ করছেন। তিনি বিরোধীদের মনে করিয়ে দেন, এখনও লোকসভা এবং রাজ্যসভা মিলিয়ে তাঁর দলের ১৮ জন শক্তিশালী সাংসদ লড়াই চালাচ্ছেন। যারা দল ছেড়ে গিয়েছেন বা বিদ্রোহী শিবিরের ‘সেটিং কোম্পানি’-তে নাম লিখিয়েছেন, তারা সকলেই আদতে ইডি এবং পুলিশের ভয়ে এই আপসের খেলায় মেতেছেন যা বাংলার সাধারণ মানুষ কোনওভাবেই মেনে নেবে না।
মদন মিত্রের মতো একজন পুরনো সতীর্থের তৃণমূল ত্যাগ করার ঘটনায় শাসক দলের প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ও দুঃখপ্রকাশ করেছেন। তবে একই সঙ্গে প্রবীণ এই নেতা মেনে নিয়েছেন, বর্তমান সময়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির মানসিক চাপ সামলানো সাধারণ মানুষের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মদনের পরিবারকে এই তদন্তের আওতায় টানার ফলেই তাঁর মধ্যে এই অনীহা ও দলের প্রতি ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন।
শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জানান, মদন মিত্রের দল ছেড়ে যাওয়া অত্যন্ত অনভিপ্রেত এবং এর কোনও প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু ইডি যখন তাঁর স্ত্রী এবং দুই ছেলেকে হুট করে তলব করে পাঠায়, তখন একজন সংসারী মানুষ হিসেবে মদন মিত্র স্বাভাবিকভাবেই মানসিক ভারসাম্য ও মনের জোর হারিয়ে ফেলেছিলেন। কেন্দ্রীয় এজেন্সির তীব্র পারিবারিক ও মানসিক চাপ কাটানোর উপায় হিসেবেই মদন শেষ পর্যন্ত এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা বাস্তব পরিস্থিতির নিরিখে অত্যন্ত স্পষ্ট।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ধরনের ভাঙাগড়া চিরপরিচিত হলেও মদন মিত্রের মতো প্রভাবশালী নেতার সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে দলের প্রবীণ ও নবীন নেতাদের একটি বড় অংশ মনে করছে, নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অদম্য লড়াইয়ের ইচ্ছাশক্তির সামনে এই দলবদল কোনো বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারবে না। সামনের দিনগুলিতে রাজ্য রাজনীতি ঠিক কোন দিকে মোড় নেয় এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই চাপ কীভাবে তৃণমূল সামাল দেয়, সেটাই এখন দেখার বড় বিষয়।
Post Comment