বারুইপুরের বর্বরতা ছাড়িয়ে গিয়েছে সব মাত্রা! ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ফুটে উঠল নিষ্ঠুরতার চিত্র
West Bengal
-Ritesh Ghosh
দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বারুইপুরে ষষ্ঠ শ্রেণীর এক স্কুলছাত্রীকে পাশবিক অত্যাচার করে খুনের ঘটনায় শিউরে উঠছে গোটা রাজ্য। সম্প্রতি এই ঘটনায় যে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট সামনে এসেছে, তা চিকিৎসকদেরও চমকে দিয়েছে। রিপোর্টে উঠে এসেছে নৃশংসতার এক চরম রূপ। পুলিশ ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সূত্র অনুযায়ী, ওই নাবালিকাকে মৃত অবস্থায় নয়, বরং জীবিত ও সংজ্ঞাহীন অবস্থাতেই বস্তাবন্দি করে পুকুরের জলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
নির্যাতন ও নির্মম নৃশংসতার এই বীভৎসতায় এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। জানা গিয়েছে, গত শনিবার দুপুরে এক জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে হাসিমুখে বেরিয়েছিল ওই নাবালিকা। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও সে আর সুস্থভাবে নিজের ঘরে ফিরে আসেনি। এরপর রবিবার সকালে স্থানীয় একটি পুকুরে একটি সন্দেহজনক বস্তা ভাসতে দেখে পুলিশে খবর দেওয়া হয় এবং উদ্ধার হয় তার নিথর দেহ।

চিকিৎসকদের দেওয়া প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্টে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, তা দেখে শিউরে উঠছেন দুঁদে পুলিশ আধিকারিকরাও। রিপোর্টে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নাবালিকার ফুসফুসের ভfতরে কাদা মিশ্রিত জল পাওয়া গিয়েছে। ফরেনসিক বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনও মৃতদেহকে জলে ফেলা হলে ফুসফুসের ভিতরে বাইরে জল প্রবেশ করতে পারে কিন্তু তার শ্বাসনালী দিয়ে ফুসফুসের গভীরে কাদা ঢোকা সম্ভব নয়।
একমাত্র জীবিত অবস্থায় কেউ যদি জলের নিচে গিয়ে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা চালায়, তবেই কাদা ও জল ফুসফুসের গভীরে পৌঁছতে পারে। এই অকাট্য প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, নির্যাতনের পর নাবালিকাকে যখন বস্তাবন্দি করে পুকুরে ছুড়ে ফেলা হয়, তখনও সে বেঁচে ছিল। চিকিৎসকদের অনুমান, অতিরিক্ত নির্যাতনের জেরে হয়তো সে অসাড় ছিল, কিন্তু তার হৃদস্পন্দন সচল ছিল।
জলে তলিয়ে যাওয়ার আগে ষষ্ঠ শ্রেণীর ওই ছাত্রীর ওপর যে পাশবিক অত্যাচার নেমে এসেছিল, তার স্পষ্ট চিহ্ন ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে। ধৃতদের হিংস্রতার কারণে তার মাথায় এবং যৌনাঙ্গে অত্যন্ত গুরুতর চোটের চিহ্ন রয়েছে। ভারী কোনও লোহার রড বা পাথর জাতীয় বস্তু দিয়ে তার মাথায় উপুর্যপরি আঘাত করা হয়েছিল বলেই চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা এবং এর ফলে চরম অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ঘটেছিল।
এই চরম মধ্যযুগীয় বর্বরতার ঘটনায় রাজ্য জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠার পর কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে প্রশাসন। ঘটনার গুরুত্ব ও স্পর্শকাতরতার কথা বিবেচনা করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরাসরি নির্দেশে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি এবং প্রমাণের স্বার্থে ছয়জন দক্ষ পুলিশ আধিকারিকের সমন্বয়ে গঠিত এই দল সমস্ত আইনি প্রক্রিয়াকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
তদন্তকারী দল ইতিমধ্যেই বারুইপুরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘটনার মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। অপরাধের জাল কতটা ছড়িয়ে রয়েছে তা জানতে ওই এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এই ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ মদত দেওয়া ও প্রমাণ লোপাটের চেষ্টার অভিযোগে প্রভাস মণ্ডল এবং দিবাকর সর্দার নামের আরও দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে অনেক নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
বারুইপুরের এই পৈশাচিক ঘটনা বাংলার নারী নিরাপত্তা বিশেষ করে নাবালিকাদের সুরক্ষার উপরে অত্যন্ত কঠিন এক প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিয়েছে। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই রণক্ষেত্রের রূপ নেয় বারুইপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা। অভিযুক্তদের গ্রেফতার এবং কঠিনতম শাস্তির দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা দফায় দফায় বিক্ষোভ দেখান। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে এখনও বিশাল পুলিশ মোতেয়েন রয়েছে যাতে কোনও বড় ধরনের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে।
গোয়েন্দাদের অনুমান অনুযায়ী, মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দার ও তার সঙ্গীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত উপায়ে প্রমাণ চিরতরে মুছে দিতে চেয়েছিল। মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যেই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গভীর রাতে বস্তাবন্দি করে দেহ পুকুরের তলানিতে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু ময়নাতদন্ত এবং ফরেনসিক ল্যাবের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার রিপোর্টে সমস্ত সন্দেহ অপরাধীদের দিকেই ঘুরে গিয়েছে। পুলিশ এখনও এলাকায় সিসিটিভি ফুটেজ এবং টাওয়ার ডাম্প প্রযুক্তি ব্যবহার করে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের কাজ চালাচ্ছে।
তদন্তের স্বার্থে সিটের সদস্যরা নাবালিকার সেই বান্ধবী এবং তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলছেন যার জন্মদিনের উদযাপনে যাওয়ার কথা ছিল মেয়েটির। ঘটনার দিন রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় কেউ তাকে দেখেছিল কিনা অথবা অপরিচিত কারও স্কুটারে বা গাড়িতে তাকে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল কিনা, তা জানার জন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের সন্ধান চালানো হচ্ছে। পুলিশ হেফাজতে ধৃতদের মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করার পরিকল্পনাও রয়েছে আইনি কর্তাদের।
ফুলের মতো ফুটফুটে একটি তরতাজা শিশুর এমন যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবার এবং সমগ্র এলাকায়। অভিযুক্তদের এমন পৈশাচিক আচরণের কথা জানতে পেরে স্থানীয় মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। পরিবারের সদস্যদের একমাত্র দাবি, পুলিশ ও প্রশাসন যেন অতি দ্রুত চার্জশিট পেশ করে ফাস্ট ট্র্যাক আদালতে এই মামলার স্পিডি ট্রায়াল শুরু করে এবং দোষীদের ফাঁসির সাজা নিশ্চিত করে।


Post Comment