প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে! লর্ডসেই কি শেষবার ভারতের হয়ে মাঠে নামবেন রোহিত শর্মা?
Cricket
-Ritesh Ghosh
আর নাকি প্রয়োজন নেই রোহিত শর্মার। তাঁকে ভবিষ্যতের জন্য নাকি আর ভাবা হচ্ছে না। এমনটা তাঁকে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে। ফলে ভারতীয় ক্রিকেটের আরও একটি বর্ণময় যুগের সম্ভবত অবসান ঘটতে চলেছে। আগামী ১৯ জুলাই লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের তৃতীয় তথা শেষ ওয়ানডে ম্যাচটি হতে পারে রোহিত শর্মার আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের শেষ ম্যাচ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সূত্রে এমন চাঞ্চল্যকর খবরই সামনে এসেছে।
জানা গিয়েছে, ভারতের এই কিংবদন্তি ওপেনারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিসিসিআইয়ের নির্বাচক কমিটি একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্বাচকেরা রোহিতকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন মেকওভারের স্বার্থে তাঁরা এবার সামনের দিকে তাকাতে চান।

বিসিসিআই-এর নির্বাচক কমিটি গত সপ্তাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে রোহিত শর্মা ও দলের বর্তমান প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে এই কঠিন বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। নির্বাচকমণ্ডলী রোহিতকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চলমান এই ওয়ানডে সিরিজ শেষ হওয়ার পর থেকে তাঁকে আর জাতীয় দলের ওডিআই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
নির্বাচকমণ্ডলী মূলত ভারতীয় ব্যাটিং অর্ডারের শীর্ষে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব আনতে চাইছেন। তরুণ ও প্রতিভাবান বাঁ হাতি ওপেনার যশস্বী জয়সওয়ালের মতো খেলোয়াড়দের ওডিআই ফরম্যাটে নিয়মিত সুযোগ দিতে নির্বাচকেরা অত্যন্ত আগ্রহী। যশস্বী ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক স্তরে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন এবং দলে জায়গা পাকা করার জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন। ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপকে পাখির চোখ করে নির্বাচকেরা এখন থেকেই সম্পূর্ণ তরুণ একটি দল গড়ে তুলতে চাইছেন।
তবে বিসিসিআই-এর এই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তকে রোহিত শর্মা সহজে মেনে নিতে পারেননি বলেই সূত্রের খবর। ইংল্যান্ড সফর চলাকালীনই রোহিত বোর্ডের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে এই বিষয়ে নিজের আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন। নিজের ফিটনেস নিয়ে বিশেষ কাজ করার পর রোহিত ভারতের মাটিতে আরও কিছুদিন ওয়ানডে ফরম্যাটে খেলতে চেয়েছিলেন। নির্বাচকেরা বিষয়টিকে অত্যন্ত সম্মান জানালেও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে রাজি হননি, ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন রোহিতের কোর্টেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
গত কয়েক বছরে রোহিত শর্মা ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বিভিন্ন ফরম্যাট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ২০২৪ সালের ২৯ জুন বার্বাডোজে ভারতকে ঐতিহাসিক টি-২০ বিশ্বকাপ ট্রফি এনে দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি আন্তর্জাতিক টি-২০ ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণা করেন। এরপর ২০২৫ সালের ৭ মে ইংল্যান্ড সফরের প্রাক্কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে টেস্ট দল থেকেও নিজের বিদায় নিশ্চিত করেছিলেন।
ওয়ানডে ফরম্যাটে রোহিতের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য ও অধিনায়কত্বও গত বছরই শেষ হয়েছিল। বিসিসিআই টিম ম্যানেজমেন্টের পরামর্শে তরুণ ওপেনার শুভমান গিলকে ওডিআই দলের নতুন অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করে ভারতের ক্রিকেটে নেতৃত্ব পরিবর্তনের দ্বিতীয় ধাপটি কার্যকর করেছিল। নির্বাচকদের মূল পরিকল্পনা ছিল সিনিয়রদের জায়গা থেকে সরিয়ে শুভমান গিলের অধীনে এক নতুন দল বিশ্বকাপের জন্য ধীরে ধীরে তৈরি করা।
ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ওপেনার এবং অধিনায়ক হিসেবে রোহিত শর্মার নাম চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপে রোহিত যেভাবে ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা এক নতুন ঘরানার সৃষ্টি করেছিল। ইনিংসের শুরু থেকে বোলারদের চরম আক্রমণ করার যে সাহসী সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন, তা সম্পূর্ণ ওয়ানডে ফরম্যাটে ভারতের খেলার আগ্রাসী ধরনকেই বদলে দিয়েছিল।
রোহিতের তৈরি করা সেই প্রথা ভাঙা আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের ব্লুপ্রিন্ট ব্যবহার করেই ভারত ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে একের পর এক ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠেছিল। যদিও সেবার ফাইনালে হারতে হয়েছিল, তবে সেই একই নির্ভীক ক্রিকেটের দর্শনকে তিনি ২০২৪ সালের টি-২০ বিশ্বকাপেও বহন করে নিয়ে যান। তাঁর সেই সুযোগ্য নেতৃত্বে দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিশ্বমঞ্চে ট্রফি তুলে ধরেছিল ভারতীয় দল।
কিন্তু ক্রিকেটের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় সবথেকে বড় তারকারও ফর্মের গ্রাফ এক সময়ে নিম্নমুখী হয়। সাম্প্রতিক কয়েকটি ম্যাচে রোহিত শর্মার ইনিংসে আগের মতো স্ট্রাইক রেট বা স্বাচ্ছন্দ্য দেখা যায়নি। কার্ডিফে দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচে তার ব্যাট থেকে আসা ২৬ রানের ইনিংসটি খেলতে তিনি খরচ করেছেন ৪৭টি বল। রোহিতের মতো স্বভাবজাত বিধ্বংসী ব্যাটারের এই ধীরগতির রক্ষণাত্মক ইনিংস নির্বাচকদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তকে আরও বেশি জোরালো করে তুলেছে।
ফলে লর্ডসের ঐতিহাসিক মাঠেই হয়তো শেষবারের মতো ভারতের নীল জার্সিতে ওপেন করতে নামবেন ‘হিটম্যান’। তাই ১৯ জুলাইয়ের এই ম্যাচটি আর শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি হতে চলেছে কোটি কোটি ভারতীয় ক্রিকেট ভক্তের জন্য এক চরম আবেগপূর্ণ ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বিদায়ের আগে ব্যাট হাতে লর্ডসে রোহিতের আরেকটি তাণ্ডব দেখার অপেক্ষায় থাকবে গোটা বিশ্ব।
রোহিতের ওয়ানডে কেরিয়ারের ইতি ঘটার খবরটি কেবল একজন কিংবদন্তির বিদায় নয়, এটি ভারতীয় ক্রিকেটের সোনালী ট্রিনিটির অবসানের দিকে আর একটি পদক্ষেপ। নির্বাচকদের এই কঠোর ও কঠিন সিদ্ধান্ত ভারতীয় দলকে একটি নতুন এবং নবীন রূপ দিতে চলেছে। ওডিআই ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই মারকুটে ওপেনারের চিরকালীন উত্তরাধিকার তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য একটি উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা হিসেবে আগামী বহু বছর ধরে অক্ষুণ্ণ থাকবে।
Post Comment