লেবাননে ভয়াবহ অবস্থা অব্যাহত! ইজরায়েলি বিমান হামলায় মৃত ৪৭

লেবাননে ভয়াবহ অবস্থা অব্যাহত! ইজরায়েলি বিমান হামলায় মৃত ৪৭

International

-Ritesh Ghosh

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের অবসান ঘটাতে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক চুক্তির রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও রক্তক্ষয়ী হয়ে উঠল লেবানন। বৃহস্পতিবারের এই চুক্তির ঠিক পরদিনই লেবানন জুড়ে ইজরায়েলি বিমান হামলায় কমপক্ষে ৪৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই ভয়াবহ হামলায় আরও ৯৭ জন গুরুতর জখম হয়েছেন, যার ফলে নতুন করে ক্ষোভের ও আশঙ্কার আগুন জ্বলছে সমগ্র আরব বিশ্বে।

ভয়াবহ এই বিমান হামলার পাল্টা জবাব দিয়েছে লেবাননের বৃহত্তম সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাও। তাদের একের পর এক লুকনো হামলায় শুক্রবার ৪ জন ইজরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। এই চরম উত্তেজনা ও রক্তপাতের মাঝেই অবশ্য শুক্রবার বিকেলে আমেরিকা ও ইজরায়েলের তরফে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আমেরিকার এক শীর্ষ কূটনীতিক জানিয়েছেন, দুই পক্ষই আপাতত যুদ্ধ থামাতে এবং লেবাননের বেসামরিক শান্তি বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে।

Smoke rises from South Lebanon village after Israeli airstrikes

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রক জানিয়েছে, ইজরায়েলি বায়ুসেনা বৃহস্পতিবার রাতে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়ে জেলাকে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে তীব্র হামলা চালায়। ইজরায়েলি সেনা দাবি করেছে যে, তারা হিজবুল্লা সংশ্লিষ্ট ৮০টি গোপন সামরিক ঘাঁটিতে সফল আঘাত হেনেছে এবং বহু সশস্ত্র যোদ্ধাকে খতম করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই তীব্র বিমান যুদ্ধের খেসারত দিতে হচ্ছে মূলত নিরীহ শিশু এবং সাধারণ মানুষদের।

নাবাতিয়ে জেলার স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তাঁদের এলাকার হারুফ গ্রামে ৯ জন, হাবুশ গ্রামে ৭ জন এবং আল-দুওয়ের গ্রামে এক শিশুসহ ৬ জনের নির্মম মৃত্যু হয়েছে। লেবাননের সরকারি সংবাদ সংস্থা এই বোমাবর্ষণকে যুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর ও অন্ধকার রাত বলে বর্ণনা করেছে। একের পর এক শক্তিশালী রকেট ও বোমার আঘাতে কেঁপে উঠেছিল ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলি, যা মুহূর্তের মধ্যে এলাকাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।

এদিকে হিজবুল্লা ইজরায়েলের এই আগ্রাসনের প্রত্যুত্তরে লড়াইয়ের মাঠে পালটা প্রতিরোধের কথা জানিয়েছে। তাদের অফিশিয়াল বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশকারী একদল ইজরায়েলি সেনাকে ফাঁদ পেতে আটকে ফেলেছিল তারা। সেখানে নিখুঁত নিশানার গাইডেড মিসাইলের সাহায্যে তিনটি ইজরায়েলি যুদ্ধ ট্যাঙ্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ইজরায়েলি পদাতিক বাহিনীকে লক্ষ্য করে অবিরাম ভারী রকেট ও কামানের গোলা ছুড়েছে হিজবুল্লা যোদ্ধারা।

বৃহস্পতিবার আমেরিকা ও ইরানের তরফ থেকে যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে স্থায়ী শান্তি রক্ষা করা। এই চুক্তিতে লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও বৈশ্বিক সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য উভয় পক্ষকে আগামী ৬০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে, যাতে করে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও স্থায়ী শান্তিপূর্ণ সমাধান সূত্রে পৌঁছানো সম্ভব হয়।

কিন্তু ইজরায়েলের চরমপন্থী নেতারা ইরানের বিরুদ্ধে হওয়া চুক্তির বিষয়টিকে একেবারেই ভালো চোখে দেখছেন না। সামরিক বাহিনীর ৪ সদস্যের মৃত্যুর খবর আসতেই দেশের কট্টরপন্থী সুরক্ষামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির হুঙ্কার দিয়ে বলেন, “সমস্ত লেবাননকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া উচিত”। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, ওয়াশিংটনের চাপের মুখে নিজেদের সেনাদের জীবন নিয়ে কোনো রকম আপস করবে না তেল আবিব। এই অত্যন্ত কট্টর মন্তব্য বিশ্ব মঞ্চে সমালোচনার ঝড় তুলেছে।

মার্কিন প্রশাসনের উপ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স অবশ্য নেতানিয়াহু মন্ত্রিসভার কট্টরপন্থী সদস্যদের এমন চরম উসকানিমূলক কথাকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, কোনো দেশই কেবল নরমেধ যজ্ঞ বা নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে নিজের দেশের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। তিনি অতি-ডানপন্থী ইজরায়েলি নেতাদের বাস্তব পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বোঝার পরামর্শ দিয়ে আমেরিকার সমর্থন হারানোর আশঙ্কার কথাও স্পষ্ট ভাষায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

যুদ্ধবিরতি সাময়িকভাবে কার্যকর করার বিষয়ে সমঝোতা হলেও ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মানসিকতা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক রয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিহত সেনাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে হিজবুল্লাকে চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। নেতানিয়াহু বলেন, ইজরায়েলি সেনাদের রক্ত ঝরানোর মূল্য হিজবুল্লাকে দিতেই হবে। সেনাকে পূর্ণ শক্তি নিয়ে লেবাননের ওপর প্রত্যাঘাত করার জন্য পূর্বের নির্দেশ বহাল রেখেছেন তিনি।

নেতানিয়াহুর এই একগুঁয়ে মনোভাব তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হবু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়াতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। ট্রাম্প এর আগেই লেবানন নিয়ে ইজরায়েলের আগ্রাসী সমর নীতির খোলাখুলি সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, ফ্রান্সের বিদেশমন্ত্রী জিন-নোয়েল ব্যারাট আন্তর্জাতিক নিয়মের ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার চুক্তিকে ইজরায়েলি সরকারের অবশ্যই সম্মান জানানো উচিত।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ভয়াবহ যুদ্ধের কবলে পড়ে লেবাননে মানবিক বিপর্যয় এখন চরমে পৌঁছেছে। লেবানন সরকারের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৯০০-রও বেশি সাধারণ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও প্রায় ১১ হাজার ৬০০ জন। যুদ্ধের কারণে ভিটেমাটি হারিয়েছেন প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ, যাঁদের দিন কাটছে অতি কষ্টে। দক্ষিণ লেবাননের প্রায় ৫ শতাংশ জমি বর্তমানে ইজরায়েলের দখলে রয়েছে।

যদিও মার্কিন কূটনীতিকরা আগেই স্পষ্ট করেছিলেন যে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত হিসেবে লেবানন থেকে ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহার বাধ্যতামূলক নয়। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের অনিশ্চয়তা কাটেনি। তবে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে সাধারণ লেবাননবাসী এই যুদ্ধবিরতিকে শেষ খড়কুটো হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন। কিন্তু রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আদৌ স্থায়ী শান্তি ফিরে আসবে কিনা, তা নিয়ে গভীর সংশয়ী আন্তর্জাতিক মহল।

Post Comment

You May Have Missed