নিটে জালিয়াতি রুখতে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ টেলিগ্রাম! পুনঃপরীক্ষার আগে বড়সড় পদক্ষেপ
India
-Ritesh Ghosh
আগামী ২১ জুনের নিট ইউজি (NEET UG 2026) পুনঃপরীক্ষার ঠিক আগে বড়সড় পদক্ষেপ করল প্রশাসন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ভুয়ো দাবি ও দেশজুড়ে জালিয়াতি রুখতে জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামের ব্যবহারে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ২২ জুন পর্যন্ত ভারতে এই তথ্য পরিষেবাটি সীমিত থাকবে। পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনোভাবেই যাতে কোনো অবাঞ্ছিত বিভ্রান্তি বা গুজব না ছড়ায়, তা নিশ্চিত করতেই প্রশাসনের এই কড়া পদক্ষেপ।
পরীক্ষায় স্বচ্ছতা ও কঠোর নিরাপত্তা বজায় রাখতে জাতীয় পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা বা এনটিএ (NTA) ইতিমধ্যেই একটি অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়েছে। রবিবার সামাজিক এক্স হ্যান্ডেলে সতর্কবার্তা জারি করে তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনও বাস্তব সুযোগই নেই। সমস্ত পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের কোনো ধরনের মিথ্যা গুজবে কান না দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে এই বিজ্ঞপ্তিতে।

বেশ কিছুদিন ধরেই টেলিগ্রামের একাধিক চ্যানেলে পরীক্ষার প্রশ্ন পাইয়ে দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। এনটিএ-র নজরদারিতে এমন বেশ কিছু সন্দেহজনক চ্যানেলের সন্ধান মেলে। বিশেষভাবে চিহ্নিত ‘পেপার লিকড নিট’, ‘রি-নিট ২০২৬’, ‘প্রাইভেট মাফিয়া’ এবং ‘রি নিট মাফিয়া’-র মতো গ্রুপগুলি সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় থেকে পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছিল।
তদন্তকারী গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, এই প্রতারক চক্রগুলি শুধু যে সমাজমাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁসের অসত্য দাবি ছড়াচ্ছিল তাই নয়, প্রশ্নপত্রের গোপন প্রতিলিপি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মেটাতে কয়েক হাজার থেকে শুরু করে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার ফাঁদ পেতেছিল। এনটিএ ফের স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কঠোর সরকারি সুরক্ষাবলয়ের বাইরে এই ধরনের কোনো প্রশ্নপত্র আসার কোনো অবকাশ নেই এবং এই সব দাবি সম্পূর্ণ জালিয়াতি।
তবে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, নিছক মিথ্যা দাবি করাই নয়, বরং টেলিগ্রামের একটি বিশেষ কারিগরি বৈশিষ্ট্যের সুবিধা নিয়ে এই অপরাধীরা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করছিল। টেলিগ্রামে এডিট অপশনের অপব্যবহার করেই এই পুরো প্রতারণার খেলা সাজানো হয়েছিল। এর মাধ্যমে আগে পাঠানো বার্তাগুলি পরবর্তীকালে পরিবর্তন করে নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করা অত্যন্ত সহজ হচ্ছিল, যা পরে প্রশাসনের নজরে আসে।
জালিয়াতির এই অভিনব কৌশলটির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছে জাতীয় পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা। প্রতারকরা পরীক্ষা শুরুর বেশ কয়েক ঘণ্টা বা দিন আগে একটি সাধারণ শুভেচ্ছাবার্তা বা ফাঁকা ফাইল গ্রুপে পোস্ট করে রাখত। এরপর আসল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর, সেই পুরনো পোস্টটিকে এডিট করে তার জায়গায় আসল পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ছবি বা পিডিএফ ফাইল আপলোড করে দিত। এর ফলে পুরনো মেসেজ করার আসল সময়টি অপরিবর্তিতই থেকে যেত।
এই সামান্য কারচুপির মাধ্যমে বাইরের মানুষের কাছে মনে হতো যে, প্রশ্নপত্রটি পরীক্ষা শুরু হওয়ার বহু আগেই ওই নির্দিষ্ট চ্যানেলে ফাঁস হয়েছিল। এই ভুয়ো প্রমাণ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর মনে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করাই ছিল চক্রটির মূল লক্ষ্য। এই কারিগরি ত্রুটি বা লুপহোল সম্পূর্ণ বন্ধ করতেই কেন্দ্রের তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স মন্ত্রক থেকে কড়া নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
মন্ত্রকের পক্ষ থেকে দেশজুড়ে দুটি পৃথক নির্দেশ জারি করা হয়েছে। প্রথম নির্দেশ অনুযায়ী, পরীক্ষা ও তার পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে ২২ জুন পর্যন্ত ভারতে সাময়িকভাবে টেলিগ্রামের অ্যাক্সেস সীমিত করা হয়েছে। দ্বিতীয় নির্দেশে বলা হয়েছে, ৩০ জুন পর্যন্ত ভারতে পূর্ববর্তী যেকোনো মেসেজ পরিবর্তন বা এডিট করার পরিষেবা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রাখতে হবে এই মেসেজিং সংস্থাকে, যাতে ভুয়ো ইতিহাস তৈরি করা না যায়।
টেলিগ্রাম ভিত্তিক এই সাইবার জালিয়াতি রুখতে অনেকদিন ধরেই সমন্বয় সাধন করে কাজ করছে দেশের কেন্দ্রীয় সংস্থা ইন্ডিয়ান সাইবার ক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টার বা আই৪সি (I4C)। বিভিন্ন রাজ্যের গোয়েন্দা পুলিশ ও এনটিএ-র যৌথ ইনপুটের ওপর ভিত্তি করে আই৪সি ইতিমধ্যে বিপুল সংখ্যক ক্ষতিকর গ্রুপ, বট এবং বিভ্রান্তিকর চ্যানেল সামাজিক মাধ্যম থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে এবং তাদের আইডেন্টিটি ট্র্যাকিং শুরু করেছে।
আইনি সক্রিয়তার নজির হিসেবে গত ৯ জুন বিহার পুলিশের আর্থিক অপরাধ শাখা বা ইকোনমিক অফেন্সেস ইউনিট (EOU) নিট পরীক্ষার্থীদের সতর্ক করে এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। পাশাপাশি গুজরাতের আহমেদাবাদ সিটি সাইবার ক্রাইম ব্রাঞ্চ এক কুখ্যাত আন্তঃরাজ্য সাইবার প্রতারক চক্রের পর্দাফাঁস করে তাদের গ্রেপ্তার করেছে। এই দলটি মোট ৮টি টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি টাকার অবৈধ আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করেছে বলে প্রামাণ্য নথি পাওয়া গেছে。
পুলিশের সাইবার অপরাধ দমন শাখার আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ওই অপরাধী গোষ্ঠীটি মাত্র এক মাসের মধ্যে প্রায় এক হাজার নিট পরীক্ষার্থীর মোবাইল নম্বরে সরাসরি যোগাযোগ করে তাদের ফাঁদে ফেলার চক্রান্ত করেছিল। পড়াশোনার প্রয়োজনে অনেক সাধারণ ও প্রকৃত শিক্ষার্থী টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে থাকেন। সাময়িকভাবে অ্যাপের উপর এই নিষেধাজ্ঞা জারির কারণে তাদের যে অসুবিধা পোহাতে হচ্ছে, তার জন্য এনটিএ আন্তরিক দুঃখপ্রকাশ করেছে।
নিট পরীক্ষার মতো এত বড় জাতীয় স্তরের প্রবেশিকার স্বচ্ছতা ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে না দেওয়ার স্বার্থে এই কঠোর পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২১ জুনের পুনঃপরীক্ষাটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নিরপেক্ষ পরিবেশেই সম্পন্ন করার সবরকম ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে সংস্থার শেষ বার্তা—কোনো প্রলোভন বা গুজবে কান না দিয়ে শান্ত মাথায় নিজের প্রস্তুতিতে ভরসা রেখেই পরীক্ষা দিতে যাওয়া উচিত।



Post Comment