দীর্ঘ নির্বাসনের অবসান! প্রায় দুই দশক পর কলকাতায় পা রাখছেন বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন

দীর্ঘ নির্বাসনের অবসান! প্রায় দুই দশক পর কলকাতায় পা রাখছেন বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন

Kolkata

-Ritesh Ghosh

প্রায় ১৯ বছর পরে ফের কলকাতার মাটিতে পা রাখতে চলেছেন খ্যাতনামা লেখিকা তসলিমা নাসরিন। আগামী ১ অগাস্ট কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহ রবীন্দ্রসদনে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে তাঁর যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। মৌলবাদবিরোধী সচেতনতার ডাক দিয়ে এই সভার আয়োজন করেছে ‘সেক্যুলার মিশন’ ও ‘এইচআরবিএফএফ’ নামের সংগঠন। নির্বাসিত এই লেখিকার বাংলায় প্রত্যাবর্তনের খবরটি সামনে আসতেই রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মহলে জোরদার চর্চা শুরু হয়েছে।

এদিন তসলিমা নাসরিন নিজেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট শেয়ার করে কলকাতায় ফেরার এই ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর এই ঘোষণায় দুই বাংলার সাহিত্যপ্রেমী এবং মুক্তমনা মানুষের মধ্যে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৭ সালে উত্তাল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির জেরে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। সেই ঘটনার ১৮ বছরের বেশি সময় পর তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।

Renowned writer Taslima Nasreen returns to Kolkata event

কলকাতা ছাড়ার সেই উত্তাল ইতিহাস এবং ২০০৭ সালের স্মৃতি

তসলিমা নাসরিনের কলকাতা ছাড়ার ইতিহাস এক চরম নাটকীয়তায় ভরা। ২০০৩ সালে তাঁর বিতর্কিত আত্মজীবনী ‘দ্বিখণ্ডিত’ প্রকাশের পর রাজ্যে বড়সড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তৎকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। যদিও পরবর্তীকালে কলকাতা হাইকোর্ট সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। কিন্তু বিতর্ক সেখানেই শেষ হয়নি। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার রাস্তায় তসলিমার বিরুদ্ধে বড় ধরনের হিংসাত্মক প্রতিবাদ দেখায় কিছু কট্টরপন্থী সংগঠন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেই সময় কলকাতায় সেনা মোতায়েন পর্যন্ত করতে হয়েছিল। তসলিমা নাসরিনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রশাসন তাঁকে কার্যত রাতারাতি কলকাতা থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। প্রথমে জয়পুর এবং পরে তাঁকে দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ভারতের বাইরে কিংবা দিল্লির কড়া নিরাপত্তাবলয়ে জীবন কাটিয়েছেন। তবে তাঁর মন পড়েছিল কলকাতার অলিতে-গলিতেই, যা তিনি বারবার তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন।

দীর্ঘ নির্বাসন এবং কলকাতার প্রতি তসলিমা নাসরিনের টান

তসলিমা নাসরিন বরাবরই দাবি করে এসেছেন যে কলকাতা তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি। মাতৃভাষা বাংলা হওয়ার কারণে এই শহরের জল-হাওয়া এবং সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর আত্মিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এত বছর ধরে তাঁকে এই শহরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। দিল্লির অস্থায়ী আবাসে থাকলেও তিনি সবসময়ই কলকাতায় ফেরার জন্য আকুলতা প্রকাশ করেছেন। তাই এবারের এই আমন্ত্রণ তাঁর কাছে কেবল একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া নয়, বরং এক দীর্ঘ লড়াইয়ের জয় হিসেবেই দেখছেন তাঁর অনুরাগীরা।

উদ্যোক্তাদের তরফে জানানো হয়েছে, আগামী ১ অগাস্টের এই অনুষ্ঠানটি মূলত মৌলবাদবিরোধী এবং মুক্তচিন্তার সপক্ষে একটি বড় পদক্ষেপ। সমাজের নানা স্তরের কবি, লেখক ও সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তিত্বরা এই সভায় উপস্থিত থাকবেন। উদ্যোক্তারা তসলিমা নাসরিনকে ‘মৌলবাদ বিরোধী প্রতিবাদের অগ্নিসম প্রতীক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মতে, স্বাধীন চিন্তা প্রকাশের অধিকারে বিশ্বাসী মানুষের জন্য তাঁর এই উপস্থিতি অত্যন্ত জোরালো বার্তা দেবে।

সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলের প্রতিক্রিয়া

তসলিমা নাসরিনের এই প্রত্যাবর্তনের খবরে কলকাতার বুদ্ধিজীবী এবং সাহিত্য মহলেও শুরু হয়েছে আলোচনা। একাংশের মতে, একজন মুক্তমনা লেখকের নিজের মাতৃভাষার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ফিরে আসার অধিকার রয়েছে। এতদিন পর তাঁর কলকাতায় আসা আসলে মুক্ত চিন্তারই জয়। তবে অন্য এক অংশের মনে ভয়ও রয়েছে, এই আগমনকে কেন্দ্র করে কোনও নতুন সামাজিক বা রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হবে না তো?

এই বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, ২০০৭ সালের বামফ্রন্ট শাসনের সঙ্গে বর্তমান সময়ের পরিস্থিতির অনেক ফারাক রয়েছে। তবে যেকোনও ধরনের অনভিপ্রেত পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন কতটা সতর্ক থাকবে, তা নিয়েই আলোচনা চলছে। তসলিমার আগমনকে ঘিরে রবীন্দ্রসদনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় হতে চলেছে। উদ্যোক্তারা আশাবাদী যে অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হবে এবং বাংলার মানুষ সংস্কৃতিপ্রেমের পরিচয় দেবেন।

মুক্ত চিন্তা ও বাক-স্বাধীনতার লড়াইয়ে তসলিমা নাসরিন

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশে মৌলবাদীদের রোষানলে পড়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন লেখিকা। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘লজ্জা’র মাধ্যমে ধর্মীয় কট্টরপন্থার কড়া সমালোচনা করে তিনি বিতর্ক উসকে দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই তাঁর নির্বাসিত জীবনের শুরু। সুইডেন, জার্মানি, আমেরিকা ঘুরে অবশেষে তিনি ভারতে এসে আশ্রয় খোঁজেন। ভাষার টানেই তিনি কলকাতায় থাকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ২০০৭ সালের ঘটনা তাঁর সেই স্বপ্ন ভেঙে দেয়।

দীর্ঘ এই কঠিন যাত্রাপথেও তসলিমা নাসরিনের ধারালো কলম কখনও থমকে যায়নি। সামাজিক মাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমের স্তম্ভে তিনি প্রতিনিয়ত নারী অধিকার, কুসংস্কার এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে নিজের মত প্রকাশ করে চলেছেন। অনেকেই মনে করেন, শত বাধা ও ভয়ের মুখেও তাঁর এই অবিচল লড়াই আগামী প্রজন্মের সৃজনশীল চিন্তাবিদদের অনুপ্রেরণা জোগায়।

১ অগাস্টের অনুষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত কেমন রূপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে সকলের। তসলিমা নাসরিনের দীর্ঘদিনের লালিত কলকাতায় ফেরার স্বপ্ন এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ পেতে চলেছে। তবে এই ঘটনা কেবল একজন নির্বাসিত লেখিকার শহরে ফেরা নয়, বরং তা মুক্তচিন্তা এবং বাকস্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করতে চলেছে।

Previous post

Major IPS & WBPS Change: ADG CID পদ থেকে সরানো হল সুপ্রতিম সরকারকে, নয়া দায়িত্বে নটরাজন রামেশ বাবু, রাজ্য পুলিশের ৩৩ পদে রদবদল

Next post

চালু হল নতুন পোর্টাল, এবার খুব সহজেই দেখতে পাবেন নিজের প্রভিডেন্ট ফান্ড ক্লেমের স্টেটাস

Post Comment

You May Have Missed