তারাতলার ঘটনায় গ্রেফতার ৩, ড্রোন উড়িয়ে চলল তল্লাশি
West Bengal
-Ritesh Ghosh
তারাতলার গোডাউন বিপর্যয়ের সময় ভিতরে ও আশেপাশে বেশ অনেকজন শ্রমিক কাজ করছিলেন। ছাদ ও দেওয়াল ভেঙে পড়ার তীব্র শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা, আর চোখের পলকে ধূলিসাৎ হয়ে যায় নির্মীয়মান বহুতল।
স্থানীয় সূত্রে খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন আশেপাশের মানুষ ও পুলিশকর্মীরা। ধ্বংসস্তূপের বিপুল ওজন এবং জটিল কাঠামোর কারণে উদ্ধারকাজ শুরু করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। খবর পেয়ে একের পর এক প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা সেখানে পৌঁছতে শুরু করেন। রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এবং পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সশরীরে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে তারাতলায় যান।

পরিস্থিতির গুরুত্ব আন্দাজ করে সরাসরি নবান্ন থেকে উদ্ধারকাজের তদারকি শুরু করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি প্রতিটি পদক্ষেপের খতিয়ান নিতে থাকেন। বুধবার দুপুর আড়াইটে নাগাদ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মুখ্যসচিব মনোজকুমার আগরওয়ালের জরুরি বৈঠক ও ফোনালাপ হয়। বিপর্যয়ের গভীরতা বিচার করে উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সাহায্য নেওয়ার ব্যাপারে একযোগে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় নবান্নের তরফে।
মুখ্যমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তারাতলার দুর্ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছয় সেনাবাহিনীর একটি সুদক্ষ দল। দমকল বাহিনী ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর পাশাপাশি সেনা জওয়ানরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করেন। মূলত কংক্রিটের ভারী স্ল্যাব ও লোহার বিম কেটে নিচে অবরুদ্ধ হয়ে থাকা মানুষদের দ্রুত বের করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে।
ভেঙে পড়া ওই বহুতলের ধ্বংসস্তূপের ঠিক কোন অংশে কতজন শ্রমিক জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তা নিখুঁতভাবে জানার জন্য প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়। উদ্ধারকারী দলগুলি কংক্রিটের নিরেট পরত ফুটো করার জন্য ভার্টিকাল ড্রিলিং পদ্ধতি অবলম্বর করছে। এর পাশাপাশি পুরো এলাকার উপর নজরদারি চালাতে এবং সম্ভাব্য প্রাণের সন্ধান পেতে ব্যবহার করা হচ্ছে চালকবিহীন ড্রোন ক্যামেরা।
ধ্বংসস্তূপের গভীতে চাপা পড়ে থাকা জীবিত মানুষদের গন্ধ শুঁকে শনাক্ত করার জন্য নামানো হয়েছে দুটি বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত স্নাইফার ডগ। রাত নেমে আসার পরেও উদ্ধারকাজে কোনও ঢিলেমি দেখা যায়নি। হ্যালোজেন লাইটের আলোয় উদ্ধারকারী দলগুলি অবিরাম কাজ করে চলেছে। দুর্ঘটনাস্থলে স্বয়ং স্বরাষ্ট্রসচিব ও মুখ্যসচিব উপস্থিত থেকে কাজের তদারকি করার পাশাপাশি দফায় দফায় জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সাথে বৈঠক করছেন।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সোজা চলে যান ঘটনাস্থলে। পরে এসএসকেএম হাসপাতালে। যেখানে উদ্ধার হওয়া আহত শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে চিকিৎসাধীন শ্রমিক ও তাঁদের পাশে থাকা আত্মীয়দের সাথে কথা বলে শারীরিক অবস্থার তদারকি করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, আহতদের চিকিৎসার সমস্ত ব্যয়ভার সরকার বহন করবে এবং তাঁদের দ্রুত আরোগ্যের জন্য সবরকম চেষ্টা করা হবে।
হাসপাতাল চত্বরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তারাতলার ওই গোডাউনে কর্মরত শ্রমিকদের সিংহভাগই প্রতিবেশী রাজ্য বিহারের মুঙ্গের জেলার বাসিন্দা। এই বিপদের সময় তাঁদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। তবে কাজ করার সময় ঠিক কতজন শ্রমিক ওই নির্দিষ্ট সময়ে বহুতলের ভিতরে কর্মরত ছিলেন, তার কোনও সঠিক তালিকা বা তথ্য উদ্ধারকারীদের কাছে ছিল না।
এই ঘটনার তদন্তে নেমে প্রকৃত সত্য খুঁজে বের করতে কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজারকে কড়া নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, যে সমস্ত ঠিকাদার বা সরবরাহকারী শ্রমিকদের কাজে এনেছিলেন, তাঁদের অবিলম্বে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। কতজন শ্রমিক সেখানে ছিলেন, কতজন নিখোঁজ এবং কতজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তা এই জেরার মাধ্যমেই দ্রুত স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া নির্দেশের মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যেই অতীব সক্রিয় হয়ে ওঠে কলকাতা পুলিশ। লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ ও স্থানীয় থানার সমন্বয়ে একটি বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে এই ভয়াবহ ঘটনার প্রেক্ষিতে একটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়। তদন্তের স্বার্থে বেহেরা ব্রাদার্স নামের নির্মাণ সংস্থার খোঁজে কলকাতার বিভিন্ন ঠিকানায় তল্লাশি চালানো হয়েছে।
এই সাড়া জাগানো অভিযানের পর তারাতলার গুদাম ধ্বংসের ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তিন জনকে গ্রেফতার করেছে লালবাজার পুলিশ। ধৃতদের নাম সৈয়দ মহম্মদ গুলজার, মহম্মদ আতাউল এবং সুভাষ চৌধুরী। এদের প্রত্যেককেই নিজেদের হেফাজতে নিয়ে গোডাউনের দুর্বল নির্মাণ পরিকাঠামো এবং অনুমোদনহীন কাজ নিয়ে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ করছেন কলকাতা পুলিশের উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা আধিকারিকরা।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, ধৃত সৈয়দ মহম্মদ গুলজার ওই গোডাউনের অবৈধ কাজটির সাইট সুপারভাইজার হিসেবে নিযুক্ত ছিল। অন্যদিকে, মহম্মদ আতাউল ও সুভাষ চৌধুরী বিহার থেকে টাকার বিনিময়ে শ্রমিক সরবরাহ বা ভেন্ডার হিসেবে কাজ করত। ধৃতদের জেরা করে নির্মাণের মূল নকশা এবং অনুমোদন সংক্রান্ত নথির খোঁজ চালাচ্ছে পুলিশ। এই বিপর্যয়ের অন্তরালে থাকা মূল অপরাধীদের শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর প্রশাসন।



Post Comment