কেন প্রাক্তন তৃণমূলী শুখেন্দুশেখরদের তিনজনকে রাজ্যসভার টিকিট? দলের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কী বললেন দিলীপ ঘোষ?

West Bengal

-Ritesh Ghosh

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে তিন প্রাক্তন তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদের বিজেপিতে যোগদান এবং তৎক্ষণাৎ তাঁদের রাজ্যসভার টিকিট প্রাপ্তি। তৃণমূল ছেড়ে সদ্য পদ্মশিবিরে আসা সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইকের হাত ধরেই এখন রাজ্য রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নতুন মোড় নিয়েছে। এই তিন হেভিওয়েট নেতার টিকিট পাওয়ার ঘটনাটি দলীয় কর্মীদের মাঝেও তুমুল কৌতুহলের জন্ম দিয়েছে।

রাজ্যে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বারবার একটি বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, দলে কোনওভাবেই ‘তৃণমূলীকরণ’ হতে দেওয়া যাবে না। পুরোনো কর্মীদের মর্যাদা ও দীর্ঘদিনের ত্যাগ স্বীকারকে গুরুত্ব দেওয়াই হবে দলের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর এই পুরোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে দলের অন্দরেই তুমুল প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

Former TMC leaders join BJP before Rajya Sabha polls

কর্মীদের এই ক্ষোভ ও অসন্তোষ ধামাচাপা দিতে কার্যত আসরে নামতে হয়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে। দীর্ঘদিন ধরে দল করা স্থানীয় নেতাকর্মীদের শান্ত রাখা এবং একই সঙ্গে নতুন আগত হেভিওয়েটদের যোগ্য সম্মান নিশ্চিত করার মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে বঙ্গ বিজেপি। এই দ্বিমুখী টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই রাজ্য রাজনীতিতে বিজেপির রণকৌশল এখন সর্বস্তরে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সাধারণ কর্মীদের ক্ষোভকে হালকাভাবে না নিলেও নেতৃত্ব এখন কেন্দ্রীয় নির্দেশের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।

দলীয় অসন্তোষ প্রশমনে দিলীপ ঘোষের স্পষ্ট বার্তা

তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া নিয়ে দলের অন্দরে যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে অবশেষে মুখ খুলেছেন রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। এদিন রবিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি দলের কর্মী ও সমর্থকদের শান্ত থাকার পরামর্শ দেন। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি অত্যন্ত দূরদর্শী ও সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছেন রাজ্যের এই প্রভাবশালী মন্ত্রী।

দিলীপ ঘোষ স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, সাধারণ ও পুরোনো কর্মীদের এই ধরনের সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তিত হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, বিষয়টির ভালো-মন্দ এবং সুদূরপ্রসারী ভালো দিকগুলো নির্ধারণ করেছে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তিনি বলেন, “তাঁরা রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন। সাংসদ থাকতে চান। মোদীজির জন্য কাজ করতে চান। সেকথা আমাদের জানিয়েছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে তো কোনও অপরাধমূলক মামলা নেই। আগে যা হয়েছে, হয়েছে। এখন তাঁদের আমরা ফের কাজ করার সুযোগ দিচ্ছি।”

রাজ্যসভায় দলের শক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দিলীপ ঘোষ আরও যোগ করেন, “আমাদেরও তো রাজ্যসভায় লোক লাগবে। যেসব কর্মীরা এটা নিয়ে বেশি ভাবনাচিন্তা করছেন, তাঁদের বেশি ভাবার দরকার নেই। ওটা আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বুঝে নেবে।” তাঁর এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, রাজ্যসভায় নিজেদের শক্তি মজবুত করতে কোনও রাজনৈতিক আপস করতেও পিছপা হচ্ছে না পদ্মশিবির।

তৃণমূল ত্যাগ ও রাজ্যসভা থেকে ইস্তফা পর্ব

২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের অভাবনীয় ভরাডুবির পর থেকেই শাসকদলের অন্দরে ফাটল চওড়া হতে শুরু করে। দলের খারাপ ফলের পর প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রথম রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন সুখেন্দুশেখর রায়। তাঁর নেওয়া এই সিদ্ধান্তের পর তৃণমূলের অন্দরে শোরগোল শুরু হয়ে যায়। একের পর এক শীর্ষ নেতা একই পথ অবলম্বন করেন, যার ফলে রাজ্য রাজনীতি এক নতুন সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড়ায়।

সুখেন্দুশেখর রায়ের ইস্তফার পরই রাজ্যসভার সাংসদ পদ ছেড়ে দেন সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইক। সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছিল কোয়েল মল্লিকের নামও। তাঁরা প্রত্যেকেই সংসদের উচ্চকক্ষে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। পদত্যাগের মাত্র এক মাসের মধ্যেই তাঁরা সল্টলেকের বিজেপি সদর দফতরে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গেরুয়া পতাকা হাতে তুলে নেন এবং রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের হাত ধরে দলে যোগ দেন।

আসন্ন নির্বাচন ও জয়ী হওয়ার সমীকরণ

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিজেপি কার্যালয়ে এই তিন হেভিওয়েট নেতার আনুষ্ঠানিক যোগদানের পরই কেন্দ্রীয় বিজেপির তরফ থেকে রাজ্যসভার আসন্ন উপনির্বাচনের জন্য এই তিন প্রাক্তনের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আগামী ২৪ জুলাই এই শূন্য আসনগুলোর জন্য ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

বর্তমান বিধানসভার সংখ্যাতত্ত্বের দিকে তাকালে এটা স্পষ্ট যে, এই নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থীদের জয় একেবারেই নিশ্চিত। কোনওরকম অঘটন না ঘটলে সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব ও প্রকাশ চিক বরাইক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই জয় লাভ করতে চলেছেন। ফলে এই তিন নেতা পুনরায় রাজ্যসভায় ফিরে যাচ্ছেন ঠিকই, তবে এবার তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় প্রতীক সম্পূর্ণ বদলে যাচ্ছে। ঘাসফুল ছেড়ে পদ্মশিবিরের জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁদের এই নতুন যাত্রা রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে।

Post Comment

You May Have Missed