ইডির বড় পদক্ষেপ! তৃণমূলের ৪৪০ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ, নেপথ্যে কোন রহস্য?

West Bengal

-Ritesh Ghosh

আর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইন বা পিএমএলএ-র অধীনে তৃণমূল কংগ্রেসের মূল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে থাকা ৪৪০ কোটি টাকা ফ্রিজ করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। দলীয় অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ১৬০ কোটি টাকার অত্যন্ত সন্দেহজনক লেনদেনের হদিশ মেলার পরেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার রাজ্যের একাধিক জায়গায় ম্যারাথন তল্লাশি অভিযান চালানোর পর এদিন কেন্দ্রীয় এজেন্সির পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার দিনভর কলকাতার সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, রাজারহাট-নিউটাউন এবং তার আশপাশের একাধিক এলাকায় বিশেষ অভিযান চালায় ইডির একাধিক টিম। তল্লাশির মূল লক্ষ্য ছিল বেসরকারি চার্টার্ড বিমান পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা ‘কেয়ারওয়েল অ্যাভিয়েশন’-এর মালিক তথা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ীর অফিস এবং বাসস্থান। সেখান থেকেই তদন্তকারীদের হাতে এই বিস্ফোরক আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য ও নথিপত্র আসে।

Enforcement Directorate officials investigating financial irregularities in bank accounts

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি, তৃণমূলের নিজস্ব দলীয় তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দফায় দফায় ওই বিমান সংস্থা এবং তার সহযোগী বিভিন্ন সংস্থার অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৬০ কোটি টাকার এই সন্দেহজনক লেনদেনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। রাজনৈতিক দলের অ্যাকাউন্ট থেকে বেসরকারি বিমান সংস্থার অ্যাকাউন্টে এই বিপুল টাকা কেন গেল, তার কোনও সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

কীভাবে চলত রহস্যময় বিমান কেনাবেচার চক্র?

তদন্ত প্রক্রিয়ায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, দলীয় তহবিল থেকে পাওয়া ওই ১৬০ কোটি টাকা ব্যবহার করেই ‘কেয়ারওয়েল অ্যাভিয়েশন’ একটি ব্যক্তিগত জেট বিমান এবং একটি অত্যাধুনিক অগাস্টা হেলিকপ্টার ক্রয় করেছিল। সাধারণ নিয়ম এড়িয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের তহবিল দিয়ে একটি বেসরকারি সংস্থার এমন বিলাসবহুল বিমান কেনা অত্যন্ত নজিরবিহীন ঘটনা বলে মনে করছেন ফরেনসিক আর্থিক অডিটর এবং ইডির কর্মকর্তারা।

ঘটনাক্রমের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হল, তৃণমূলের তহবিল থেকে সংগৃহীত টাকায় কেনা ওই বিমান এবং হেলিকপ্টারটিকেই আবার তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতাদের যাতায়াতের জন্য নিয়মিত ভাড়া দেওয়া হতো। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ অন্যান্য ভিআইপি নেতারা প্রায়শই এই কপ্টার ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ, ঘুরেফিরে তৃণমূলের টাকায় কেনা আকাশযান আবার তৃণমূলকেই কয়েক গুণ বেশি ভাড়ায় দেওয়া হতো।

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা আশঙ্কা করছেন, এটি আসলে দলীয় তহবিলের কালো টাকা অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার বা কোনও নির্দিষ্ট মহলে পাচার করার একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত জাল চক্রান্ত ছিল। ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে উদ্ধার করা লেনদেনের বিবরণে দেখা গিয়েছে, এই অর্থ লেনদেন কেবল একটি একক সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর পিছনে আরও একাধিক ভুয়ো বা শেল কোম্পানির যোগসূত্র রয়েছে।

তৃণমূলের তীব্র প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের অভিযোগ

ইডির পক্ষ থেকে এত বিশাল পরিমাণ অর্থ ফ্রিজ করার ঘটনার পর স্বভাবতই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব। দলের পক্ষ থেকে জারি করা এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে থাকা প্রতিটি তহবিলের বিবরণ অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং আইনি নিয়মের মধ্যে রয়েছে। দলের সমস্ত দান এবং আর্থিক অনুদানের নথি নিয়মিতভাবে ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং আয়কর দফতরের কাছে জমা দেওয়া হয়।

সমাজমাধ্যমে তৃণমূলের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত এবং আইনবিরুদ্ধ চক্রান্তের অংশ। তৃণমূল স্পষ্ট করেছে যে, বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করতেই এবং প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে অপব্যবহার করা হচ্ছে। এই বেআইনি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা খুব শীঘ্রই আদালতের দারস্থ হয়ে যথাযোগ্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

এদিকে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারীরা এই অ্যাকাউন্টটির ওপর নজরদারি বাড়িয়ে অন্যান্য আর্থিক দুর্নীতির গভীরতা অনুসন্ধানের কাজ শুরু করেছেন। ইডির পক্ষ থেকে গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে যে, রাজ্যের পূর্ববর্তী শিক্ষা নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতি কিংবা গরু পাচার চক্রের বেআইনি কালো টাকা কোনওভাবে এই রাজনৈতিক দলের মূল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকিয়ে সেটিকে বৈধ করার বা সাদা করার চেষ্টা করা হয়েছিল কি না।

তদন্তের গতিপ্রকৃতি ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ

বিগত পাঁচ বছরের ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট এবং আয়ব্যয়ের বিশদ খতিয়ান চেয়ে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়েছে ইডি। ব্যাঙ্কগুলিকে স্পষ্ট নির্দেশিকা দিয়ে বলা হয়েছে যেন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তৃণমূলের এই বিতর্কিত মূল অ্যাকাউন্ট থেকে কোনওরকম নতুন ডেবিট লেনদেন করতে দেওয়া না হয়। এর ফলে দলের দৈনন্দিন প্রশাসনিক খরচ চালানোতেও বড় বাধা সৃষ্টি হবে।

এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও আইনি ঘটনার জেরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক রণাঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্ব দাবি তুলছেন যে, এই বিপুল বেআইনি আর্থিক লেনদেনের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় অবিলম্বে তৃণমূলের সামগ্রিক নির্বাচন কমিশন রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা উচিত। অন্যদিকে বাম দলগুলিও এই অস্বচ্ছ বিমান চুক্তি নিয়ে নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

তদন্তের মূল বিষয় ইডি-র দাবি ও পদক্ষেপ
ফ্রিজ হওয়া মোট অর্থ তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ৪৪০ কোটি টাকা
সন্দেহজনক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১৬০ কোটি টাকা (কেয়ারওয়েল অ্যাভিয়েশনকে দেওয়া)
অভিযুক্ত সংস্থা কেয়ারওয়েল অ্যাভিয়েশন ও সহযোগী সংস্থাগুলি
ক্রয়কৃত সম্পত্তি ১টি ব্যক্তিগত বিমান এবং ১টি অগাস্টা হেলিকপ্টার
তৃণমূলের আইনি অবস্থান নির্বাচন কমিশন ও আয়কর দফতরে সমস্ত তহবিলের হিসাব জমা দেওয়া আছে

ইডি ইতিমধ্যেই ‘কেয়ারওয়েল অ্যাভিয়েশন’-এর উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের তলব করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই মামলা সংক্রান্ত সমস্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ট্রানজেকশন আইডি এবং আইপি অ্যাড্রেস ফরেনসিক বিশ্লেষকদের দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদর দফতরে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের নোডাল অফিসার এবং বিমান সংস্থার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে জানা গিয়েছে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, এই মামলার জল অনেক দূর গড়াবে। যদি ইডির অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়, তবে তা বাংলার রাজনীতিতে এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। অন্যদিকে তৃণমূল যদি একে রাজনৈতিক চক্রান্ত প্রমাণের আইনি লড়াইয়ে জয়ী হতে পারে, তবে তা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলনের ধার অনেক বাড়িয়ে দেবে।

তদন্ত প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং আদালতের সম্ভাব্য রায়ের ওপরই এখন তৃণমূলের এই বিশাল অঙ্কের দলীয় তহবিলের মোক্ষ ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তীব্র রাজনৈতিক বাদানুবাদ এবং আইনি টানাপোড়েনের আবহে এই তীব্র বিতর্কিত মামলাটি যে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে অত্যন্ত গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে চলেছে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

Post Comment

You May Have Missed