অনশনরত সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবনতিতে দিল্লির হাইকোর্টের কড়া নির্দেশ, নড়েচড়ে বসল কেন্দ্র
India
-Ritesh Ghosh
দিল্লির যন্তর মন্তরে আমরণ অনশনে বসা লাদাখের খ্যাতনামা পরিবেশ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগপ্রকাশ করল দিল্লি হাইকোর্ট। ওয়াংচুকের চিকিৎসার জন্য জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে দায়ের হওয়া একটি আবেদনের শুনানিতে আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, এই দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। তাঁর স্বাস্থ্য নিয়মিত পরীক্ষা করার জন্য এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতে কেন্দ্রকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।
জাতীয় স্তরের মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’ (NEET)-এর অনিয়ম ও দুর্নীতির নৈতিক দায় স্বীকার করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়েছেন সোনম ওয়াংচুক। গত ২৮ জুন থেকে তিনি যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের জন্য এই অনশন আন্দোলন শুরু করেন। ইতিমধ্যেই তাঁর অনশন ১৯ দিন অতিক্রম করায় তাঁর শারীরিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে শুরু করেছে, যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে তাঁর সমর্থক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে।

প্রধান বিচারপতি দেবেন্দ্র কুমার উপাধ্যায় এবং বিচারপতি তেজস কারিয়ার সমন্বয়ে গঠিত দিল্লি হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে এই চাঞ্চল্যকর মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানির সময় বেঞ্চ সরকারি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে মন্তব্য করে, “আমরা চাই এই ব্যক্তির স্বাস্থ্য নিয়মিত সরকারি চিকিৎসকদের দ্বারা পরীক্ষা করা হোক। চিকিৎসকদের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে যদি কোনও ওষুধের প্রয়োজন হয়, তবে দয়া করে কর্তৃপক্ষ দ্রুত হস্তক্ষেপ করুক।”
শুনানি চলাকালীন কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে আশ্বস্ত করে বলেন, কেন্দ্র ইতিমধ্যেই ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার দিকে কড়া নজর রাখছে। সরকারি চিকিৎসকদের একটি দল ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন। মেহতা আশ্বাস দেন, কর্তব্যরত চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী সোনম ওয়াংচুকের সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত ধরনের চিকিৎসা সহায়তা ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং সদা তৎপর রয়েছে।
সলিসিটর জেনারেলের এই আশ্বাস দেওয়ার পর দিল্লি হাইকোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে মামলাটি নিষ্পত্তি করে দেয়। আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দেয় যে, ওয়াংচুকের শারীরিক পরিস্থিতি প্রতিদিন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ক্লিনিক্যালি নিরীক্ষণ করতে হবে এবং তাঁর শারীরিক সংকট দেখা দিলে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সমাজকর্মী রাকেশ কুমার সাইনি এই জনস্বার্থ মামলাটি দায়ের করে ওয়াংচুকের জীবনের সুরক্ষার্থে তাঁকে প্রয়োজনে হাসপাতালে স্থানান্তরিত ও জোরপূর্বক তরল পুষ্টি দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন।
দীর্ঘ ১৯ দিন ধরে টানা অনশন চালানোর ফলে সোনম ওয়াংচুকের শরীরে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তাঁর স্বাস্থ্য তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রবীণ জেনারেল ফিজিশিয়ান ডঃ সতীশ লাম্বা এক বিবৃতিতে তাঁর শারীরিক অবস্থার বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেছেন। চিকিৎসকের রিপোর্ট অনুযায়ী, অনশন শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত সোনম ওয়াংচুকের ওজন প্রায় ৯ কেজিরও বেশি হ্রাস পেয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
| শারীরিক পরিমাপ (Clinical Parameter) | বর্তমান রিডিং (Current Level) | প্রভাব ও মন্তব্য (Health Impact) |
|---|---|---|
| শরীরের ওজন (Weight) | ৫৬.৬৫ কেজি | শেষ ২৪ ঘণ্টায় ৫০০ গ্রাম এবং অনশন শুরুর পর থেকে ৯ কেজির বেশি ওজন কমেছে। |
| রক্তচাপ (Blood Pressure) | ১০৫/৬১ mmHg | স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম, যা দীর্ঘ উপবাসের কারণে দুর্বলতার ফলে হয়েছে। |
| রক্তে শর্করা (Blood Sugar) | ৮০ mg/dL | শর্করার মাত্রা নিম্নমুখী হওয়ার কারণে ক্লান্তি ও শারীরিক অসাড়তা দেখা দিতে পারে। |
| অক্সিজেন স্যাচুরেশন (SpO2) | ৯৭ শতাংশ | আপাতত সন্তোষজনক এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা স্থিতিশীল রয়েছে। |
ডাক্তার সতীশ লাম্বা জানিয়েছেন, ওয়াংচুকের ওজন এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৬.৬৫ কেজিতে, যার মধ্যে শেষ ২৪ ঘণ্টাতেই তাঁর ওজন কমেছে ৫০০ গ্রাম। তাঁর রক্তচাপ এই মুহূর্তে ১০৫/৬১ এমএমএইচজি এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ ৮০ মিলিগ্রাম প্রতি ডেসিলিটার। চিকিৎসকদের মতে, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ৯৭ শতাংশ থাকলেও দীর্ঘ অনশনের ধকল তাঁর শরীরের প্রধান অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির ক্ষতি করতে পারে।
মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট ইউজি- ২০২৬’ (NEET-UG)-র প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ফলাফল সংক্রান্ত নানা অনিয়মকে কেন্দ্র করে গোটা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সোনম ওয়াংচুকের প্রধান দাবি হল, দেশের লাখ লাখ মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এভাবে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের এই চূড়ান্ত ব্যর্থতার প্রতিবাদে এবং এর নৈতিক দায়ভার প্রমাণের দাবিতেই তিনি যন্তর মন্তরের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এই কঠিন অনশনের পথ বেছে নিয়েছেন।
এর আগে লাদাখের পরিবেশ রক্ষা এবং লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতাভুক্ত করার দাবিতে ২১ দিনের দীর্ঘ আমরণ অনশন পালন করেছিলেন ওয়াংচুক। সেই সময় তাঁর অহিংস আন্দোলন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। আর এবার গোটা দেশের লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ রক্ষা এবং জাতীয় স্তরের পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার দাবিতে তাঁর এই আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। যন্তর মন্তরে অভিভাবক, পড়ুয়া ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এসে তাঁর প্রতি সংহতি প্রকাশ করছেন।
Post Comment