লর্ডসে স্বপ্নভঙ্গ! অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে মহিলাদের টি২০ বিশ্বকাপ থেকে বিদায় ভারতের

লর্ডসে স্বপ্নভঙ্গ! অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে মহিলাদের টি২০ বিশ্বকাপ থেকে বিদায় ভারতের

Cricket

-Ritesh Ghosh

মহিলা টি২০ বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ইতিহাস হয়ে গেল ভারতীয় ক্রিকেট দলের কাছে। লর্ডসের ঐতিহাসিক গ্যালারিকে স্তব্ধ করে দিয়ে গ্রুপ পর্বের শেষ ডু-অর-ডাই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেল হরমনপ্রীত কৌরের দল। ভারতের ছুড়ে দেওয়া ১৭১ রানের লক্ষ্যমাত্রা তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া এক ওভার বাকি থাকতেই ৪ উইকেটে জয় তুলে নিল। এর ফলে আরও একবার বিশ্বমঞ্চে স্বপ্নভঙ্গ হল ভারতের।

গ্রুপ পর্বের জটিল সমীকরণ অনুযায়ী, শেষ চারে পৌঁছতে হলে ভারতকে এই ম্যাচটি বড় ব্যবধানে জিততেই হতো। দিনের শুরুতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার চার উইকেটের জয় ভারতের ওপর চাপ অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রোটিয়ারা আট পয়েন্ট নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাওয়ায় ভারতের এই টুর্নামেন্টে এগিয়ে যেতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে জিততেই হতো।

Harmanpreet Kaur dejected after T20 World Cup loss

টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় টিম ইন্ডিয়া। নির্ধারিত ২০ ওভারে ভারতের ইনিংস শেষ হয় ১৭০ রানে ৪ উইকেটের বিনিময়ে। ওপেনিং জুটিতে স্মৃতি মন্ধানা ও শেফালি বর্মা প্রথম উইকেটে ৬৬ রান যোগ করে একটি ভালো শুরু এনে দিয়েছিলেন। তবে শুরুটা আশাব্যাঞ্জক হলেও মাঝের ওভারগুলিতে রান তোলার গতি বাড়ানোর দিকে দুই ওপেনারের মধ্যেই বেশ জড়তা চোখে পড়েছে, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

স্মৃতি মন্ধানা ৩৮ রান এবং শেফালি বর্মা ৩৪ রান করে প্যাভিলিয়নে ফেরেন। ভারতের ওপেনিং জুটিতে বড় রান এলেও বলের তুলনায় রান সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম ছিল। রান রেট কখনই প্রতি ওভারে সাতের উপরে পৌঁছতে পারেনি। শেফালি বর্মা অফ-স্পিনার অ্যাশলেই গার্ডনারের ওভারে দুটি বিশাল ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন এবং মন্ধানা পেসার কিম গার্থকে পরপর দুটি বাউন্ডারি মারেন। তবে এই আগ্রাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং গতি বজায় রাখতে তাঁরা ব্যর্থ হন।

মিডল অর্ডারের হাল একাই শক্ত হাতে ধরেন ভারতীয় অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর। একদিক আগলে রেখে একটি দুর্দান্ত এবং লড়াকু অর্ধশতরান সম্পূর্ণ করেন তিনি। তবে অন্য প্রান্তের ব্যাটারদের পক্ষ থেকে তাঁকে যোগ্য সমর্থন দেওয়ার জায়গায় ব্যাপক ঘাটতি ছিল। দলগতভাবে ভারতের ব্যাটিংয়ের এই ধীরগতিই পরবর্তীতে বড় স্কোরের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। মাত্র ১৭০ রানেই ভারতের দৌড় থেমে যায়, যা অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বখ্যাত ব্যাটিং লাইন-আপের সামনে রক্ষা করার মতো মোটেই যথেষ্ট ছিল না।

১৭১ রানের টার্গেট তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়ার শুরুটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। প্রথম ওভারেই ভারতীয় ডানহাতি মিডিয়াম পেসার রেণুকা সিং ওপেনার জর্জিয়া ভলকে সাজঘরে ফেরত পাঠান। এই প্রথম উইকেটের পতনের পর গ্যালারিতে উপস্থিত ভারতীয় সমর্থকদের মাঝে উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। রেণুকার এই প্রাথমিক ধাক্কার পর বেথ মুনি ও ফোবি লিচফিল্ড মিলে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের রাশ টেনে ধরেন এবং রানের চাকা সচল রাখার চেষ্টা করেন।

মাঝের ওভারগুলিতে ভারতীয় স্পিন বিভাগ অসাধারণভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তরুণ স্পিনার শ্রী চরণী এবং অভিজ্ঞ দীপ্তি শর্মা একটি করে উইকেট নিয়ে অজিদের ব্যাটিং অর্ডারে ফাটল ধরান। শ্রী চরণী প্রথমে থিতু হওয়া ফোবি লিচফিল্ডকে আউট করেন এবং এরপর দীপ্তি শর্মা অভিজ্ঞ বেথ মুনিকে বিদায় জানালে জয় নিয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠে ভারত। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং গভীরতার সামনে এই চেষ্টা খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

পরবর্তী সময়ে মাঠে নেমে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন এলিস পেরি ও অ্যাশলেই গার্ডনার। ভারতীয় শিবিরের সমস্ত আশার আলো একে একে নিভিয়ে দেন এই দুই বিশ্বমানের ব্যাটার। ভারতীয় স্পিনার ও পেসারদের বিরুদ্ধে উইকেটের চারপাশে অনায়াসে শট খেলে তাঁরা প্রয়োজনীয় রানের গতি বজায় রাখেন। নিখুঁত ব্যাটিং প্রদর্শন করে দুজনেই নিজেদের চমৎকার অর্ধশতরান পূর্ণ করেন এবং মাত্র ১৯ ওভারেই দলকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেন।

অস্ট্রেলিয়ার এই অনবদ্য জয় তাঁদের টুর্নামেন্টের অন্যতম দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং তাঁরা সপ্তমবারের মতো বিশ্বসেরা হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। অন্যদিকে, ভারতের এই হারের পর ভারতীয় ক্রিকেট মহলে একাধিক কঠিন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে মডার্ন টি২০ ক্রিকেটের যুগে যেখানে প্রতি ওভারেই আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের প্রয়োজন, সেখানে ভারতীয় ব্যাটারদের এমন রক্ষণাত্মক মানসিকতা সমর্থকদের গভীরভাবে হতাশ করেছে। চাপের মুখে কীভাবে সেরাটা দিতে হয়, লর্ডসের মাঠে তা আরও একবার প্রমাণ করল অস্ট্রেলিয়া।

হারের এই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা টিম ইন্ডিয়াকে তাদের কৌশলগত পরিকল্পনা পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করবে। দলে পাওয়ার হিটারের অভাব এবং মাঝের ওভারগুলিতে রানের গতি হারিয়ে ফেলার পুরনো রোগ থেকে ভারতীয় ক্রিকেটকে বেরিয়ে আসতে হবে। আসন্ন আন্তর্জাতিক সফর এবং দ্বিপাক্ষিক সিরিজ শুরুর আগে ভারতের পুরো ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। হরমনপ্রীত কৌরের এই দলকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করাই এখন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Post Comment

You May Have Missed