সেশেলসের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত প্রধানমন্ত্রী মোদী! ভারত-সেশেলস সম্পর্কে নতুন মাইলফলক ঐতিহাসিক সফরে
International
-Ritesh Ghosh
ভারত ও দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু সেশেলসের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তীতে এক ঐতিহাসিক অনন্য সম্মানে ভূষিত হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেশেলসের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘গার্ডিয়ান অব দ্য ব্লু হরাইজন’ (Guardian of the Blue Horizon) প্রদান করা হল তাঁকে। এই প্রথম দ্বীপরাষ্ট্রটি কোনও বিদেশি রাষ্ট্রনেতাকে এমন সম্মান দিল। প্রধানমন্ত্রী সেশেলস সফরের মাঝেই এই বিশেষ আন্তর্জাতিক সম্মানটি গ্রহণ করে তা বিশ্ববাসীকে উৎসর্গ করেছেন।
সেশেলসের প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিক হারমাইনি এক রাজকীয় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাতে এই স্মারক তুলে দেন। পুরস্কার গ্রহণের পর যৌথ এক সাংবাদিক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী জানান, এই অর্জন কেবল তাঁর একার নয়, বরং ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের গর্ব। জলবায়ু রক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে ভারতের দীর্ঘকালীন দায়বদ্ধতারই আন্তর্জাতিক প্রতিফলন এই স্বীকৃতি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলার লড়াইয়ে থাকা সমস্ত দেশকে তিনি এই সম্মান উৎসর্গ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সেশেলসের নিজস্ব ৫০তম স্বাধীনতা দিবস এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গত পাঁচ দশকে ভারত ও সেশেলসের সম্পর্ক কেবল প্রথাগত বন্ধুত্বের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা রূপ নিয়েছে গভীর পারস্পরিক আস্থা, নিবিড় সহযোগিতা এবং জনকল্যাণমূলক যৌথ কর্মকাণ্ডে। দুই দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে একে অপরের পরিপূরক, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে ভারত মহাসাগর অঞ্চলের অখণ্ড সুরক্ষার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।
নতুন দিল্লির লক্ষ্য হল ভারত মহাসাগরে যৌথ সুরক্ষার পাশাপাশি সমান অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সুনিশ্চিত করা। শক্তির অসমতা নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে এই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় ভারত। এই প্রসঙ্গে ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা ডিপিআই ক্ষেত্রে ভারতের অর্জিত বিভিন্ন ডিজিটাল সাফল্য সেশেলসের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তথ্যপ্রযুক্তির এই মেলবন্ধন দ্বীপরাষ্ট্রটির আধুনিক প্রশাসনিক পরিকাঠামো গঠনে বড় ভূমিকা নেবে।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আগে দুই দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় সেশেলসের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় স্টেট হাউসে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বৈঠকে ভারতের দেওয়া ১৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশেষ অর্থনৈতিক প্যাকেজের আওতায় চালু হওয়া বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখা হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও মজবুত করতে আলোচনা করেন দুই রাষ্ট্রপ্রধান।
ভারত মহাসাগরের সামগ্রিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ও প্রগতির লক্ষ্যকে সামনে রেখেই দুই দেশের মধ্যে সামুদ্রিক সুরক্ষা চুক্তি অত্যন্ত জোরদার করা হচ্ছে। নয়া দিল্লির বৈদেশিক নীতির অন্যতম স্তম্ভ হলো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানানো। মোদী স্পষ্ট ব্যক্ত করেছেন যে, ভারত ও সেশেলসের অংশীদারিত্ব কোনো দেশের আয়তনের নিরিখে নির্ধারিত হয় না, বরং পারস্পরিক গভীর বিশ্বাস ও অভিন্ন স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে এই মজবুত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
এই সফরের সবচেয়ে বড় সাফল্য হল দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন। কৃষি, গণস্বাস্থ্য, ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা, মহাকাশ গবেষণা, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং আইনি সহযোগিতার ক্ষেত্রে এই সমঝোতা স্মারকগুলি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে সেশেলসের সামগ্রিক পরিকাঠামো উন্নয়নে ভারতের সক্রিয় অবদান আরও বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে ভারতের ইউপিআই-এর মতো ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা সেশেলসের অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করবে।
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক যাত্রাকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে একটি বিশেষ দ্বিপাক্ষিক লোগো উন্মোচন করেন দুই রাষ্ট্রনেতা। ভারত ও সেশেলসের অংশীদারিত্বের অনন্য প্রতীক হিসেবে সেশেলসে গড়ে উঠতে চলা একটি পেশাদার ও কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্রের ভার্চুয়াল শিলান্যাসও করা হয়। মূলত দ্বীপরাষ্ট্রের যুবসমাজের কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং তাদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই বিশেষ শিক্ষা কেন্দ্রটি স্থাপন করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনকল্যাণে বিশেষ অবদান রাখবে।
জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী মোদীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বই এই অনন্য সম্মান প্রাপ্তির নেপথ্যে কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক সৌর জোট (ISA), কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেজিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার (CDRI) এবং বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় গঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল বিগ ক্যাট অ্যালায়েন্স’-এর মতো জোট গঠনে ভারতের অগ্রণী ভূমিকা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তিগত দায়িত্বশীলতার লক্ষ্যে গৃহীত ‘মিশন লাইফ’ (Mission LiFE) এবং ‘এক পেড় মা কে নাম’ কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাবকে সেশেলস সরকার বিশেষভাবে বিবেচনা করেছে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভারত মহাসাগরের কৌশলগত স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা নতুন দিল্লির জন্য অত্যন্ত জরুরি। সেশেলসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে ভারতের এই নিবিড় প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আগামী দিনে আঞ্চলিক শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থায়িত্ব বজায় রাখতে বড় শক্তি হবে। পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক সংকট মোকাবিলায় দুই দেশের এই যৌথ অঙ্গীকার এশীয় ও আফ্রিকান অঞ্চলের অন্যান্য উন্নয়নশীল ছোট দেশগুলির সামনে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে।



Post Comment