তারাতলায় গোডাউনের নকশা অনুমোদনে সই খোদ ফিরহাদের, কাউকে ছাড়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

তারাতলায় গোডাউনের নকশা অনুমোদনে সই খোদ ফিরহাদের, কাউকে ছাড়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

Kolkata

-Ritesh Ghosh

তারাতলায় নির্মীয়মাণ গোডাউন ভেঙে পড়ার ঘটনাকে নিয়ে বিধানসভায় কলকাতা পুরসভার ভূমিকা নিয়ে সরব হলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তিনি সরাসরি রাজ্য সরকার ও পুর কর্তৃপক্ষকে কাঠগড়ায় তোলেন। নিখোঁজ ও নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি এই ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।

তারাতলার ওই নির্মীয়মাণ বহুতলটি ভেঙে পড়ার কারণে এখন পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং অন্তত ২০ জন গুরুতর জখম অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই ভয়াবহ বিপর্যয় কোনও সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনিক স্তরে চরম দুর্নীতি ও গাফিলতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি অভিযোগ করেন, কলকাতা পুরসভার উদাসীনতার কারণেই একের পর এক নিরীহ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে।

Suvendu Adhikari addressing Taratala warehouse collapse in Assembly

বিধানসভায় দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, কলকাতা পুরসভা গত জানুয়ারি মাসের ১৭ তারিখ তারাতলার এই গোডাউন তৈরির নকশা বা প্ল্যানে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিল। ঘটনার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি অধিবেশনে কিছু নথিপত্রও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ওই অনুমোদনের কপিতে কলকাতা পুরসভার তৎকালীন মেয়র তথা বর্তমান মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের স্বাক্ষর রয়েছে। শুধু তাই নয়, নকশাটির সরকারি অনুমোদনে সংশ্লিষ্ট বিভাগের একাধিক উচ্চপদস্থ ইঞ্জিনিয়ারের সই রয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন।

পুরসভার ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “প্ল্যানের অনুমোদনে আমিনুর শেখ (সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার), নির্মলেন্দু সরকার (অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার), রঞ্জন দাসের (কার্যনির্বাহী ইঞ্জিনিয়ার) সই রয়েছে। রয়েছে প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সই। কাউকে ছাড়া হবে না।” তিনি অভিযোগ করেন, নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কীভাবে এমন একটি দুর্বল কাঠামোর অনুমোদন দেওয়া হল, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া জরুরি। ইতিমধ্যেই এই বিপর্যয়ের ঘটনায় জড়িয়ে থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তৃণমূল সরকারের আমলের বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে সরাসরি নিশানা করে বিরোধী দলনেতা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “টাকা নিতে নিতে সিটি অফ জয় কলকাতাকে মৃত্যুপুরী বানিয়েছে আগের তৃণমূল সরকার। এটা আপনাদের পাপের ফল। একাধিক দুর্ঘটনা থেকে কোনও শিক্ষা নেননি। এখানে প্রাক্তন মেয়রের সই আছে। কাউকে ছাড়া হবে না।” তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, পুরসভার দায়িত্বশীল আধিকারিক হোক বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, দোষী কাউকেই যাতে আড়াল করার চেষ্টা না করা হয়।

এখানেই শেষ নয়, কলকাতা পুরসভার অভ্যন্তরে বাড়ি বা বাণিজ্যিক ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি ‘কালী’ নামে এক রহস্যময় ব্যক্তির প্রসঙ্গ টেনে এনে বিধানসভায় শোরগোল ফেলে দেন। তাঁর দাবি, এই ব্যক্তির সবুজ সংকেত ছাড়া পুরসভায় কোনও গুরুত্বপূর্ণ ফাইলের কাজ এগোয় না। এই চক্রের পেছনে থাকা প্রভাবশালীদের মুখোশ খুলে দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

রহস্যময় এই চরিত্রের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী অধিবেশনে বলেন, “কলকাতা পুরসভায় কী হয়েছে আমরা জানি না? কালীকে ধরলেই সব তথ্য বেরিয়ে আসবে। কালী না বললে কোনও প্ল্যান হয় না। কালীই বাইপাসের ধারে তৃণমূল ভবন বানাচ্ছে। এফআইআর হয়েছে, ব্যবস্থা নিচ্ছি।” তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চাপানউতোর শুরু হয়েছে এবং শাসক শিবিরের ওপর চাপ অনেকটাই বাড়ল বলে মনে করা হচ্ছে।

তারাতলা দুর্ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসনের উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন উঠে এসেছে। শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, কলকাতার মতো একটি মেগাসিটিতে এত বড় একটি বিপর্যয় ঘটার পর উদ্ধারকাজের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তি কেনেনি পুরসভা। আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় অতীতে একাধিক বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে পুরসভা কোনও অত্যাধুনিক উদ্ধারকারী যন্ত্র কেনেনি বলে দাবি করেন তিনি।

প্রযুক্তি ও আধুনিক যন্ত্রাংশের ঘাটতির কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কোনও অত্যাধুনিক যন্ত্র কেনেননি। বাংলার ক্ষতি করে দিয়ে গিয়েছেন।” তাঁর দাবি, পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করেছিল যে শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকাজের জন্য সেনাবাহিনীর সাহায্য চাইতে বাধ্য হতে হয় প্রশাসনকে। সেনাবাহিনীর বিহার রেজিমেন্ট তাদের বিশেষ উদ্ধারকারী দল ও উন্নত মানের আধুনিক যন্ত্র নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর পরই উদ্ধারকাজ দ্রুত গতি পায়।

তবে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া সমস্ত কর্মীদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে ভোলেননি শুভেন্দু অধিকারী। এই কঠিন পরিস্থিতিতে রাতদিন ধরে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন, বিশেষ করে ভারতীয় সেনাবাহিনী, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF), কলকাতা পুলিশ এবং সিভিল ডিফেন্সের সকল জওয়ান ও আধিকারিকদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। তাঁদের সুশৃঙ্খল ও দ্রুত পদক্ষেপের ফলেই বহু মানুষকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

Previous post

অনেকটা সস্তা হয়ে গেল সোনা, ১২ হাজারের বেশি কমল রুপোও, ২৫ জুন কত হল এই দুই ধাতুর দাম?

Next post

Sovandeb Chatterjee: ঋতব্রতদের নাম থাকলেও বিধানসভার বিএ কমিটিতে জায়গা পেলেন না কালীঘাট-ঘনিষ্ঠ তৃণমূল শিবিরের কেউ, বিবেচনার আশ্বাস অধ্যক্ষের

Post Comment

You May Have Missed