২০২৬ অর্থবর্ষে দারুণ ব্যবসা আদানি গোষ্ঠীর! নয়া পরিকল্পনা পরিকাঠামো, এআই-সহ একাধিক সেক্টরের জন্য
India
-Ritesh Ghosh
ভারতের পরিকাঠামো ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করতে চলেছে আদানি গ্রুপ। ২০২৬ অর্থবর্ষের বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) শিল্পগোষ্ঠীটি তাদের আগামী দিনগুলির নতুন রূপরেখা প্রকাশ করেছে। ‘অ্যাক্সিলারেটিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার, লিভারেজিং ইন্টেলিজেন্স’ স্লোগান নিয়ে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে দেশের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে চান তারা। গ্লোবাল মার্কেটের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে আদানি গ্রুপ তাদের দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট করেছে।
এই সুদূরপ্রসারী রূপরেখা বাস্তবায়নের প্রধান চালিকাশক্তি আদানি গ্রুপের আর্থিক অগ্রগতি। ২০২৬ অর্থবর্ষে আদানি গ্রুপ নতুন ব্যবসায়িক রেকর্ড গড়েছে। সামগ্রিকভাবে গোষ্ঠীর রাজস্বের পরিমাণ ৭.৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২.৯২ লাখ কোটি টাকায়। অপারেটিং প্রফিট বা ইবিআইটিডিএ (EBITDA) দাঁড়িয়েছে ৯৪,৮৩৪ কোটি টাকা। বার্ষিক নিট মুনাফা ১৩.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬,৩৭৬ কোটি টাকায়। এছাড়া, ১.৫ লাখ কোটি টাকারও বেশি বার্ষিক মূলধনী ব্যয় করেছে এই গোষ্ঠী।

ব্যবসায়িক মজবুতি বাড়াতে আদানি গ্রুপ এই বছর ৬৭,৯৯৫ কোটি টাকার অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো তৈরি করেছে। এছাড়া, কর্পোরেট ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ২৫,০০০ কোটি টাকার ‘রাইটস ইস্যু’ সম্পন্ন করেছে তারা। একে বিনিয়োগকারীদের আস্থার বড় নিদর্শন ও বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পর্যাপ্ত পুঁজি দেশের মাটিকে সমৃদ্ধ করতে বড় নতুন পরিকাঠামো নির্মাণে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা দেবে বলে সংস্থার মত।
আদানি গ্রুপের লক্ষ্য এখন কেবল মূলধনের প্রাপ্যতার গতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের ফোকাসে রূপান্তরিত হয়েছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে তারা নতুন ত্রি-স্তরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো চালু করেছে। গতিশীল এই ডিজিটাল জমানায় এটি সংস্থাকে সহজে মানিয়ে নিতে ও নেতৃত্ব সামলাতে সাহায্য করবে। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এবং খরচ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে আদানি গ্রুপ। ইতিমধ্যে প্রথম অফ-গ্রিড ৫ মেগাওয়াটের গ্রিন হাইড্রোজেন পাইলট প্ল্যান্ট চালু করেছে আদানি এন্টারপ্রাইজ। ২০৩২ সালের মধ্যে তাপবিদ্যুৎ ক্ষমতা ৪৫ গিগাবাইট করতে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে আদানি পাওয়ার। একইভাবে, আদানি অ্যাটমিক এনার্জির হাত ধরে সংস্থাটি পারমাণবিক শক্তির বাজারে নামছে, যেখানে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১০ গিগাবাট পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যস্থির করা হয়েছে।
পাশাপাশি ভূটানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ৫ গিগাবাট জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তুলতে চলেছে আদানি। অপর দিকে, আদানি এনার্জি সলিউশনের মোট কাজের পরিমাণ বর্তমানে ৭২,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি ঘরোয়া ব্যবহারের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে আদানি টোটাল গ্যাস ক্রমাগত কাজ করছে, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইতিমধ্যে ১১ লাখের বেশি পিএনজি রান্নার গ্যাস সংযোগ সক্রিয় করার মাইলফলক অতিক্রম করেছে।
বন্দর পরিচালনায় বিশ্বমানের আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছে আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোন (APSEZ)। ২০২৬ অর্থবর্ষে গোষ্ঠীটি ৫০০ মিলিয়ন টনের বেশি পণ্য খালাস পরিচালনা করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই ধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে ১ বিলিয়ন টনে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের মুন্দ্রা বন্দর বিশ্বের শীর্ষ ২৫টি বন্দরের তালিকায় প্রবেশ করেছে এবং কেরলের ভিঝিনজাম বন্দর প্রথম বছর সফলভাবে ১০ লাখ টিইইউ হ্যান্ডেল করেছে।
আকাশপথের পরিকাঠামোতেও আদানির বড় পদক্ষেপ দৃশ্যমান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নভি মুম্বই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সফলভাবে কার্যকরী হয়েছে। এই বিমানবন্দরটির বার্ষিক প্রায় ৯০ মিলিয়ন যাত্রী পরিবহনের ক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া গুয়াহাটি বিমানবন্দরেও একটি নতুন অত্যন্ত আধুনিক টার্মিনাল গড়ে তোলা হয়েছে। এই আধুনিক সংযোগ ব্যবস্থা আগামী দিনে দেশের যাতায়াত ক্ষেত্রকে উন্নত করার পাশাপাশি সামগ্রিক পর্যটন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যকেও বড় বুস্ট প্রদান করবে।
ভবিষ্যতের চাহিদার কথা মাথায় রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ গিগাবাট ক্ষমতার ডেটা সেন্টার তৈরির বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে আদানি গ্রুপ। এই কাজের গতি বাড়াতে তারা বড় অংশীদারিত্বে প্রবেশ করেছে গুগল-এর সঙ্গে। বিশাখাপত্তনমে একটি গিগাবাইট স্কেলের বিশাল ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা হবে। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত নেটওয়ার্ক বৈশ্বিক ডেটা প্রসেসিং আরও গতিশীল করার পাশাপাশি দেশের এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রকেও ব্যাপক শক্তি জোগাবে।
প্রতিরক্ষা ও উৎপাদন ও অন্যান্য ভারি বিভাগেও আদানি অত্যন্ত সক্রিয়। খনি পরিষেবার ক্ষমতা ১৪৫ এমটিপিএ এবং সিমেন্ট উৎপাদনে বার্ষিক ক্ষমতা ১১০ এমএমটিপিএ-তে উন্নীত হয়েছে। সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বৈশ্বিক টেক জায়ান্ট লিওনার্দো এবং এমব্রায়েরের সঙ্গে বড় চুক্তি করেছে আদানি ডিফেন্স। এর লক্ষ্য দেশীয় অ্যারোস্পেস মেকিং চাঙ্গা করা এবং উন্নত মানের ড্রোন ও আধুনিক বিমান প্রতিরোধী যুদ্ধের উন্নত সরঞ্জাম দেশের মাটিতেই তৈরি করা।
ব্যবসায়িক প্রসারের পাশাপাশি আদানি ফাউন্ডেশন ৩০ বছর পূর্ণ করে ২২টি রাজ্যের প্রায় ১ কোটি মানুষের কাছে সাহায্য নিয়ে পৌঁছেছে। জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে মুম্বই ও আহমেদাবাদে গড়ে উঠছে বিশেষ ‘আদানি হেলথ সিটি’। এই প্রকল্পগুলির লক্ষ্য বহুমুখী আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও গবেষণা ত্বরান্বিত করা। পাশাপাশি বিহারে চোখের নিখরচায় চিকিৎসার মতো কাজ গ্রাম স্তরে করা হচ্ছে এবং যুবকদের বিশেষ কাজের উপযোগী শিক্ষাদানের প্রভূত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ভারতের গ্রামীণ অঞ্চলে প্রায় ১.২৫ লক্ষের বেশি যুবক-যুবতীকে কর্মক্ষেত্রের নতুন দিশা দেখানো সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্রে দেশ গড়ার লক্ষ্যে আদানি গ্রুপ তাদের দূরদর্শী পরিকল্পনার সফল প্রয়োগ করতে চায়। বাস্তব পরিকাঠামোর পরতে পরতে প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেশের অর্থনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে বিশ্ব দরবারে মজবুত পজিশনে আনাই এখন আদানি গ্রুপের মূল পাখির চোখ, যা দেশের প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধিকে ব্যাপক ত্বরান্বিত করবে।



Post Comment