তৃণমূলের অন্দরে ক্ষমতার চূড়ান্ত লড়াই, মমতা বনাম ঋতব্রত, কার হাতে থাকতে চলেছে ঘাসফুল?

তৃণমূলের অন্দরে ক্ষমতার চূড়ান্ত লড়াই, মমতা বনাম ঋতব্রত, কার হাতে থাকতে চলেছে ঘাসফুল?

West Bengal

-Ritesh Ghosh

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ক্ষমতার লড়াই এবার সরাসরি পৌঁছে গেল ভারতের নির্বাচন কমিশনের দরজায়। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠী— উভয় পক্ষই এখন নিজেদের ‘আসল’ তৃণমূল বলে দাবি করছে। দলের রাশ শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণ করতে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন আইনি ও রাজনৈতিক সংকট। দুই শিবিরের সমান্তরাল কর্মসমিতি গঠন এবং কমিশনকে চিঠি পাঠানোর ঘটনায় ঘাসফুল শিবিরের এই ভাঙন এবার চূড়ান্ত রূপ নিল।

সোমবার নিউটাউনের এক অভিজাত হোটেলে বিশেষ সাংগঠনিক অধিবেশন ডেকে নতুন জাতীয় ওয়ার্কিং কমিটি ঘোষণা করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন অংশটি। দলের সংবিধানের ২০ নম্বর ধারাকে হাতিয়ার করে তারা দাবি করে, প্রতি তিন বছর অন্তর দলের কর্মসমিতি পুনর্গঠন বাধ্যতামূলক। কিন্তু ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনও নতুন কমিটি গড়া হয়নি। এই সাংবিধানিক শূন্যতার যুক্তি খাড়া করেই তারা নতুন জাতীয় কমিটি গড়ে নিজেদের আসল দাবিদার হিসেবে দাবি করেছে।

Mamata Banerjee and Ritabrata Banerjee rivalry inside TMC

ঋতব্রতর ডাকা এই হেভিওয়েট বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ফিরহাদ হাকিম এবং অরূপ রায়ের মতো পরিচিত মুখ। যেখানে সর্বসম্মতিক্রমে অরূপ রায়কে এই নতুন জাতীয় কর্মসমিতির চেয়ারপার্সন ঘোষণা করা হয়। এই কমিটিতে স্থান পেয়েছেন ফিরহাদ হাকিম, বিপ্লব মিত্র, রথীন ঘোষ, স্নেহাশিস চক্রবর্তী ও আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ২৯ জন সদস্য। দলের নতুন কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে আখরুজ্জামানকে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই নতুন কমিটিকে কমিশনের খাতায় নথিভুক্ত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঋতব্রত।

বিদ্রোহী শিবিরের এই চালের পাল্টা হিসেবে কোনও সময় নষ্ট করেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঋতব্রতদের বৈঠক ও প্রস্তাব পেশ করার প্রক্রিয়া চলাকালীনই তিনি নির্বাচন কমিশনে নতুন জাতীয় ওয়ার্কিং কমিটির পাল্টা তালিকা পাঠিয়ে দেন। এই নতুন তালিকায় চেয়ারপার্সন হিসেবে নিজের সই রেখেছেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই নতুন সমীকরণ অনুযায়ী, সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে, সাম্প্রতিক এই রদবদলে বাদ পড়েছেন একসময়ের প্রিয় অরূপ বিশ্বাস।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠানো নতুন কমিটিতে রাজ্য সভানেত্রীর পদে রাখা হয়েছে প্রবীণ নেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মনোনীত হয়েছেন ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেন। দলের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শুভাশিস চক্রবর্তীকে। কিছুদিন আগেই ৫ জুন ঘোষিত তালিকায় অরূপ বিশ্বাসের নাম থাকলেও, শেষ মুহূর্তের চূড়ান্ত তালিকা থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এই সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের অপর পক্ষের নেতৃত্বকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন। অডিট এবং দলীয় তহবিলের বিষয়ে স্বচ্ছতা আনার জন্য তারা বিশেষ অডিটর নিয়োগ করার দাবি তুলে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছেন। এছাড়া দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও উঠেছে বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকে। কে আসল তৃণমূল এবং কার দখলে থাকবে দলীয় তহবিল— এই নিয়ে দুই শিবিরের মধ্যে লড়াই এখন আদালত ও নির্বাচন কমিশনের বারান্দা পর্যন্ত গড়াবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দল ভাঙার এই অধ্যায়ে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর। অতীতে মহারাষ্ট্র বা বিহারে দলীয় প্রতীক ও নাম কার দখলে থাকবে তা নিয়ে বহু টানাপোড়েন দেখা গিয়েছে। শিবসেনা বা এনসিপির মতো দলে যে ধরনের তীব্র ক্ষমতার লড়াই দেখা গিয়েছিল, বাংলার শাসক দলেও পরিস্থিতি এখন ঠিক সেই পথেই এগোচ্ছে। ঋতব্রত ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে পাঠানো সমান্তরাল তালিকার আইনি বৈধতা এবার খতিয়ে দেখবে কমিশন।

Previous post

কখনও বাড়ছে, কখনও কমছে সোনার দাম; ৭ হাজারের বেশি কমল রুপোর দাম, ২৩ জুন কলকাতায় কত হল দাম?

Next post

July 6 Declared State Holiday: সব স্কুলে গেল সরকারের তরফ থেকে বড় নির্দেশ, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিনে ৬ জুলাই সরকারি ছুটি ঘোষণা

Post Comment

You May Have Missed