বিশ্বকাপে শক্তিশালী স্পেনকে রুখে দিয়ে রূপকথা লিখল ‘অচেনা’ কেপ ভার্দে

বিশ্বকাপে শক্তিশালী স্পেনকে রুখে দিয়ে রূপকথা লিখল ‘অচেনা’ কেপ ভার্দে

Football

-Ritesh Ghosh

ফুটবল মাঠে মাঝেমধ্যেই এমন কিছু রূপকথা তৈরি হয়, যা দীর্ঘকাল মানুষের মনে এক গভীর ছাপ রেখে যায়। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে তেমনই এক অবিশ্বাস্য মহাকাব্য লিখে ফেলল ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দে। গ্রুপ ‘এইচ’-এর ম্যাচে ইউরোপের অন্যতম ফুটবল পরাশক্তি স্পেনের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র করে ফুটবল বিশ্বকে রীতিমতো চমকে দিল আটলান্টিক মহাসাগরের এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি।

ম্যাচের পর মাঠের যে দৃশ্য দেখা গেল, তাতে মনে হচ্ছিল কেপ ভার্দে যেন ড্র নয়, গোটা ট্রফিটাই ঘরে তুলেছে। মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার একটি দেশের পক্ষে প্রাক্তন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের আটকে এক পয়েন্ট ছিনিয়ে নেওয়া নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাদের এই ঐতিহাসিক রাত বহু প্রজন্ম পর্যন্ত পরম গর্বের সঙ্গে স্মরণে রাখবে দেশবাসী।

Cape Verde players celebrate historic draw against Spain

ম্যাচের শুরু থেকেই প্রত্যাশামতো বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল স্পেন। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় রেখে একের পর এক ধারালো আক্রমণ আছড়ে পড়ছিল কেপ ভার্দের রক্ষণভাগে। কিন্তু প্রথমবার ফুটবলের এই মহাযজ্ঞে খেলতে আসা ‘ব্লু শার্কস’রা যে এতো সহজে জমি ছাড়ার পাত্র নয়, তা তারা প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দিয়েছিল।

স্প্যানিশ স্ট্রাইকারদের সমস্ত মরিয়া প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিল কেপ ভার্দের ডিফেন্ডারদের অনমনীয় মনোভাব ও অকুতোভয় রণকৌশল। প্রতিটি আক্রমণ প্রতিহত করতে তারা নিজেদের শরীর ছুড়ে দিচ্ছিল। নিখুঁত ট্যাকল আর ঠান্ডা মাথার সুসংহত ডিফেন্সের সামনে কার্যত বার বার খেই হারিয়ে ফেলছিলেন স্পেনের নামী তারকারা, যাঁদের পায়ের জাদু দেখার জন্য দর্শকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন।

কেপ ভার্দের এই অবিস্মরণীয় লড়াইয়ের নেপথ্যে তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল অনবদ্য দলগত সংহতি এবং তাদের গোলরক্ষকের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স। গোলপোস্টের নিচে যেন এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। স্পেনের ফুটবলাররা বেশ কয়েকবার নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি করলেও তাঁর বিশ্বস্ত গ্লাভস প্রতিবার কেপ ভারদেকে বিপদমুক্ত করেছে এবং দলকে এনে দিয়েছে কাঙ্ক্ষিত গৌরব।

ম্যাচের সময় যত এগোচ্ছিল, কেপ ভার্দের খেলোয়াড় ও তাদের সমর্থকদের আত্মবিশ্বাস ততই বাড়ছিল। স্টেডিয়ামে উপস্থিত এক চিলতে আফ্রিকান সমর্থক দলের উল্লাস খেলোয়াড়দের বাড়তি অক্সিজেন জোগাচ্ছিল। ম্যাচের রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, তখন স্প্যানিশ শিবিরে নেমে আসে চরম হতাশা এবং কেপ ভার্দের ফুটবলাররা আনন্দে আত্মহারা হয়ে মাঠেই উল্লাসে ফেটে পড়েন।

বিশ্ব মানচিত্রে এক চিলতে দ্বীপের ইতিহাস

ভৌগোলিক দিক থেকে কেপ ভার্দে বা ‘কাবো ভার্দে’ একটি অনন্য ও শান্ত রাষ্ট্র। পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল উপকূল থেকে প্রায় ৫৭০ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত দশটি মনোরম আগ্নেয় দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দেশটি। ছবির মতো সুন্দর আদিম সৈকত, প্রবাল প্রাচীর, পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং মনোরম রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ার জন্য এই অঞ্চলের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে。

ছোট দেশ হলেও আফ্রিকান অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে কেপ ভার্দের একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। শান্ত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশের জন্য এটিকে মহাদেশটির অন্যতম স্থিতিশীল গণতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশটির রাজধানী প্রেইয়া অত্যন্ত সুগঠিত এবং এটি সান্তিয়াগো দ্বীপে অবস্থিত। শান্ত রাজনীতির পরিবেশ এবং চমৎকার আইনশৃঙ্খলার কারণে সারা পৃথিবীতেই দেশটির বেশ সুনাম রয়েছে।

দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেস এবং প্রধানমন্ত্রী উলিসেস কোরেয়া ই সিলভার প্রশাসনিক নেতৃত্বে এই দ্বীপরাষ্ট্রটি বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মেলে ধরছে। বিশেষ করে পর্যটন শিল্পে দেশটি অসাধারণ উন্নতি করছে। তবে স্পেনের মতো ফুটবল পরাশক্তিকে রুখে দেওয়ার পর এখন এই নয়নাভিরাম দেশটিকে নিয়ে বিশ্ববাসীর কৌতূহল যে আরও অবধারিতভাবে বেড়ে যাবে, তা বলাই বাহুল্য।

ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও পর্যটনের হাতছানি

কেপ ভার্দে কেবল তার লড়াকু ফুটবল দিয়ে নয়, বরং তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন দিয়েও বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ করতে পারে। ক্রোল সংস্কৃতির সংমিশ্রণে তৈরি এই দেশের নিজস্ব শৈলী অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। বিশেষ করে সেখানকার মিষ্টি ও বিষাদমাখা ‘মর্না’ গানের বিশেষ কদর রয়েছে, যা বিশ্বখ্যাত পর্তুগিজ ভাষার গায়িকা সেসারিয়া ইভোরা আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।

সংস্কৃতির পাশাপাশি এই দেশের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যাভ্যাসও অত্যন্ত চমৎকার ও জিভে জল আনা। বিভিন্ন মিষ্টি আনাজ, শাকসবজি, বিন ও মাংস বা মাছের টুকরো দিয়ে ধিমে আঁচে রান্না করা বিখ্যাত পুষ্টিকর স্টু ‘কাচুপা’ হলো কেপ ভার্দের অত্যন্ত ভালোবাসার জাতীয় খাবার। এছাড়া তাজা সামুদ্রিক মাছের হরেক রকম পদও পর্যটকদের কাছে সমান জনপ্রিয়।

ভ্রমণপিপাসু মানুষদের কাছে কেপ ভার্দে চিরকালই গভীর আকর্ষণের এক কেন্দ্রবিন্দু। নীল জলরাশির রোমাঞ্চ উপভোগের জন্য ‘সাল আইল্যান্ড’ যেমন সেরা জায়গা, তেমনই বিশাল বালিয়ারি ও সামুদ্রিক কচ্ছপ দেখার জন্য পর্যটকরা যান ‘বোয়া ভিস্তা’ দ্বীপে। ট্রেকিং প্রেমীদের পছন্দের জায়গা হলো ‘সান্তো আন্তো’ আর সংস্কৃতির স্বাদ পেতে অনেকে ভিড় জমান ঐতিহাসিক শহর ‘মিন্ডেলো’তে।

স্পেনের বিরুদ্ধে এই অভাবনীয় ফলাফলের পর বহু ফুটবলপ্রেমী নতুন করে এই দ্বীপরাষ্ট্রটির খোঁজ শুরু করেছেন। বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে কেপ ভার্দের এই লড়াই যেন সেই পুরোনো উক্তিটিকেই মনে করিয়ে দেয়— ‘আকারে কী আসে যায়, লড়াইয়ের মানসিকতাটাই আসল খেলা।’ আফ্রিকার এই প্রতিনিধিরা বুঝিয়ে দিল যে, কেবল নাম বা জৌলুস দিয়ে সবুজ মাঠ জেতা যায় না।

বিশ্বকাপের মূল পর্বে অন্যতম আন্ডারডগ হিসেবে পা রেখেছিল এই দল। কিন্তু একটি রূপকথার ম্যাচের পরই বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে এক গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা অর্জন করে নিল তারা। কোনো বড় নামের অহংকার ছাড়া কেপ ভার্দের এই অদম্য জেদ ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে এবং বিশ্ববাসীকে অনুপ্রেরণা জোগাবে।

Post Comment

You May Have Missed