রিহার্সাল মিস করি না, মঞ্চ আমার স্বস্তির জায়গা, ক্যামেরার সামনে আসাটা তো দুর্ঘটনা: লোকনাথ দে
তোর্ষা ভট্টাচার্য্য, কলকাতা: মঞ্চ তাঁর ভালবাসা, পর্দায় পা রাখা, কিছুটা হঠাৎ করেই। তবে রুপোলি পর্দায় একের পর এক, ভিন্ন স্বাদের চরিত্রে অভিনয় করে বাঙালিদের প্রিয় অভিনেতার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। অভিনেতা লোকনাথ দে (Loknath Dey)। রবিবার, বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। ইতিমধ্যেই কোচবিহার রওনা দেওয়ার কথা ছিল তাঁর, কিন্তু আটকে পড়েছেন বৃষ্টিতে। সেই ফাঁকে, এবিপি লাইভ বাংলা (ABP Live) -র সঙ্গে নিজের নতুন কাজ থেকে শুরু করে, টলিউডের হাল-হকিকৎ, তাঁর হঠাৎ করে সিনেমায় পা রাখা… সবটা নিয়েই মন খোলা কথা বললেন, লোকনাথ দে।
মঞ্চেই স্বস্তি, পর্দায় আসাটা দুর্ঘটনা!
একের পর এক, বিভিন্ন চরিত্রে চমক, কী দেখে চরিত্র বাছেন অভিনেতা? লোকনাথ বলছেন, ‘ইন্ডাস্ট্রির যা অবস্থা, তাতে চরিত্র বাছাবাছির খুব একটা বেশি জায়গা থাকে না। তবে থিয়েটারের অভ্যাস থেকে দেখি, গল্পটায় চরিত্রের কতটা গুরুত্ব রয়েছে। কোনও চরিত্রের গভীরতা খুব বেশি থাকে, কোনও চরিত্র আবার খুবই হালকা। মোটের ওপর পছন্দ হলে, কাজ করতে রাজি হই।’ থিয়েটারের ভিত কী চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বা অভিনয়ে কাজে লাগে? লোকনাথ বলছেন, ‘ক্যামেরায় অভিনয় করতে গেলেই যে থিয়েটারে অভিনয় করতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত পর্দার তারকা রয়েছেন, যাঁরা কখনও মঞ্চে অভিনয় করেননি। তবে আমাদের মতো মানুষ, যাঁরা কখনও ক্যামেরায় কাজ করব দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি.. তাঁদের একটু সুবিধা হয়। আমার পর্দায় আসাটা তো একেবারে হঠাৎ করেই..’। সেটা কীভাবে? লোকনাথ বলছেন, ‘এটা হল মূলত লকডাউনের সময়ে। আমি ফ্রিল্যান্স থিয়েটার করতাম, সেটাই আমার রুটিরুজি। লকডাউনের সময় সেই রোজগারটুকুও বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক বছর বাইরে থেকে অভিনেতাদের নিয়ে সিনেমা করাটা কার্যত বন্ধ ছিল। সেই সময়েই অনির্বাণ বলে ‘মন্দার’-এর কথা। ও আমার ছোট ভাইয়ের মতো.. রাজি হয়ে যাই। ‘মন্দার’ জনপ্রিয়তা পায়, তারপরে একের পর এক কাজ আসতে থাকে। সেই সময়ে থিয়েটার পুরোদমে শুরু হয়নি। পর্দায় অভিনয় করতে করতেই অনেকগুলো কাজ করে ফেললাম।’
‘পিআর’ না থাকলে কাজ পাওয়া যায় না টলিউডে?
তাহলে এখন কী, মঞ্চের থেকে পর্দাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন লোকনাথ? অভিনেতা বলছেন, ‘একেবারেই না। মঞ্চ আমার স্বস্তির জায়গা, সিনেমা-সিরিজ করাটা তো নিছক দুর্ঘটনা। এখনও কোনও সিনেমার অফার আসলে, আমি আগে থিয়েটারের সঙ্গে কথা বলি। জীবনে কখনও রিহার্সাল মিস করিনি আমি। সবসময় বলি, আমি নাটকেরই লোক। টলিউডে কাজ করি বটে, তবে জাঁকজমক, চাকচিক্যের সঙ্গে অভ্যস্থ হতে পারিনি এখনও।’ টলিউডের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছেন? হেসে অভিনেতা বললেন, ‘চেষ্টা করি না। নিজের মতো করেই কাজ করি। একটা সময় শুনতাম, টলিউডে পিআর না করে কাজ পাওয়া যায় না। সেটা কিছুক্ষেত্রে সত্যি, আমি দেখেছি ভিউজ় আর রিল দেখে কাস্টিং হতে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তা হয়নি। যাঁরা রিলস করেন, তাঁদের জন্য যেমন চরিত্র থাকে, তেমন চরিত্র আমাদের মতো মানুষদের জন্যও থাকে। ফলে ‘পিআর’ না করে টলিউডে কাজ পাওয়া যায় না, এই কথাটা অন্তত আমার ক্ষেত্রে খাটেনি।’
কেন রাজি হয়েছিলেন ‘স্বর্গরথ সরগরম’-এ অভিনয় করতে?
সদ্য ‘প্ল্যাটফর্ম এইট’ (Platform 8)-এ মুক্তি পেয়েছে, ‘স্বর্গরথ সরগরম’। এই গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছেন লোকনাথ। কেন এই চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হয়েছিলেন তিনি? লোকনাথ বলছেন, ‘এখন প্রায় সব গল্পেই এত ভায়োলেন্স, এত রক্ত.. সেই জায়গা থেকে এই চরিত্রটা আমায় খুব টেনেছিল। কেমন একটা মাটির গন্ধ লেগে রয়েছে চরিত্রটায়। সেটাই আমায় সবচেয়ে বেশি টেনেছিল। একটা গ্রামের প্রেক্ষাপটে এমন একটা চরিত্র, যাদের আমি হয়তো ছোটবেলাতে দেখেওছি.. সেটা আমার বেশ আকর্ষণীয় লেগেছিল। পাশাপাশি, আমি এই প্ল্যাটফর্মে এর আগেও ২টো কাজ করেছি। তারই একটার স্ক্রিনিংয়ে গিয়ে এই চরিত্রটার অফার পাই। চিত্রনাট্য পড়তে চাইলে, আমায় ২টো এপিসোড পাঠানো হয়। সেটা পড়ে খুব ভাল লেগেছিল।’
রাজ্যে পালাবদল, টলিউডে পরিবর্তন এল?
রাজ্যে পালাবদল হল, টলিউডে তার কতটা প্রভাব পড়ল? লোকনাথ বলছেন, ‘কী হবে, তা এখনও জানি না। তবে কী হয়েছিল, সেটা জানি। এই পরিবেশেই অনেক কাজ করেছি। তবে টলিউড আর ইন্ডাস্ট্রি ছিল না, একটা ক্লাবে পরিণত হয়েছিল। সেই ক্লাবের ঘনিষ্ঠ কারা, সেই মতোই কাজ পেতেন। এমন কিছু মানুষ ইন্ডাস্ট্রিতে ছড়ি ঘোরাতেন, যাঁদের অভিনয়ের সঙ্গে আদৌ কোনও যোগ নেই! বহু মানুষই চেয়েছিলেন, এই পরিস্থিতির অবসান ঘটুক। কিন্তু পালাবদলের পরে যাঁরা টলিউডের দায়িত্ব পেয়েছেন, তাঁরা অভিনয়েরই মানুষ। তাই আশা করছি, টলিউডে কাজের উন্নতি হবে। ছবির সংখ্যা কমে যাচ্ছে, সিনেমাহল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে.. এগুলোকে তো বন্ধ করতে হবে। কাজ করতে হবে। নতুন সরকারের স্লোগান ছিল, ‘ভয় নয়, ভরসা।’ আমরা শুধু সেই ভরসাটাই রাখতে পারি। আশা করতে পারি যে, কাজের উন্নতি হবে। তার বাইরে আমাদের হাতে আর কিছুই তো নেই।’
Bikram Chatterjee: নিরুপায় হয়ে অনেক কিছু মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছিলাম, যাঁরা বিরোধিতা করতেন, কাজ চলে যেত: বিক্রম



Post Comment