কলকাতার রাজপথে যোগের জোয়ার! মোদীর হাত ধরে ১২তম আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে ইতিহাস গড়ল বাংলা

কলকাতার রাজপথে যোগের জোয়ার! মোদীর হাত ধরে ১২তম আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে ইতিহাস গড়ল বাংলা

Kolkata

-Ritesh Ghosh

কলকাতার রেড রোডে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হল দ্বাদশ আন্তর্জাতিক যোগ দিবস। রবিবার সকালে এই মেগা যোগ শিবিরের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গের বুক জুড়ে এমন অভূতপূর্ব এবং স্বতঃস্ফূর্ত গণ-যোগাযোগের চিত্র দেখা গেল, যেখানে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ খোলা আকাশের নিচে মোদীর সঙ্গে যোগাসনে অংশ নেন।

সকাল সাড়ে ছ’টায় রাজভবন (যা বর্তমানে লোক ভবন নামে পরিচিত) থেকে যাত্রা শুরু করে রেড রোডের অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান রাজ্যের রাজ্যপাল আর এন রবি, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, কেন্দ্রীয় আয়ুষ মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতাপরাও যাদব সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কলকাতার রাজপথ এদিন এক ভিন্ন আধ্যাত্মিক আবহে মেতে ওঠে।

PM Narendra Modi leading mass Yoga Day event Kolkata

অনুষ্ঠানে সমবেত দেশবাসীকে সম্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যোগ শুধুমাত্র কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সুস্থ জীবন নিশ্চিত করে না, বরং এটি সমগ্র বিশ্বের ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। ২১ জুনকে বছরের দীর্ঘতম দিন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যোগ সারা বিশ্বকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং এটি মানুষকে একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে আসার কাজ করে।

বাংলার মহান মনীষীদের স্মরণ করে নরেন্দ্র মোদী বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে এসে যোগ দিবসের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া তাঁর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ঋষি অরবিন্দের জীবনদর্শনের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, স্বামী বিবেকানন্দই প্রথম বিশ্বমঞ্চে যোগের মহাত্ম্য তুলে ধরেছিলেন এবং ঋষি অরবিন্দ যোগকে আধ্যাত্মিকতার সংযোগসূত্র হিসেবে দেখিয়েছেন।

এবারের আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের মূল ভাবনা বা থিম ছিল সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগ। এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বয়স বাড়লেও মানুষের ভেতরের কাজের ক্ষমতা বা সম্ভাবনা যাতে হ্রাস না পায়, যোগের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। তিনি আহ্বান জানান, আমাদের সকলের লক্ষ্য হওয়া উচিত ৫০ বছর বয়সে পৌঁছেও ৩০ বছরের মতো কর্মক্ষম থাকা।

নিয়মিত যোগচর্চার সুফলের কথা মনে করিয়ে দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, এটি শরীরকে নমনীয় করে এবং দৈনন্দিন ক্লান্তি দূর করে ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার করে। এটি আমাদের মানসিক চাপমুক্ত রাখতে এবং জীবনযাত্রার নানাবিধ রোগ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। মোদী জোর দিয়ে বলেন, সুস্থ বার্ধক্যের এই দর্শন কেবল প্রবীণদের জন্য নয়, বরং সব বয়সী মানুষের জন্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একটি সংস্কৃত শ্লোক উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুষম আহার, পরিমিত জীবনযাপন এবং সময়মতো ঘুম ও জাগরণের ভারসাম্যই মানুষের জীবনকে যোগের মাধ্যমে সফল করে তোলে। যোগ কেবল শারীরিক কসরত নয়, এটি আমাদের মানসিক স্থিরতার পথও দেখায়। মোদী বলেন, যোগ আমাদের সঠিক ও ভুলের পার্থক্য শেখায় এবং এর মাধ্যমেই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

শুধুমাত্র একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দিবসকে সীমাবদ্ধ না রেখে একে প্রাত্যহিক জীবনের অংশ করতে প্রধানমন্ত্রী যোগ ৩৬৫ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। এই বিশেষ দিনে একটি ১০০ দিনের অনলাইন যোগ কর্মসূচির সূচনা করা হয়েছে, যেখানে বিশ্বের ১৩০টি দেশের মানুষ অংশ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিময় বিশ্ব গড়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পশ্চিমবঙ্গে এর আগে কখনো এত বড় আকারে বা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালিত হয়নি। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই পরিবর্তনের পেছনে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন। কোনো দলের নাম না নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এর আগে রাজ্য সরকার এই দিবসের উদযাপনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়নি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে এবং আজ বাংলার এক কোটিরও বেশি মানুষ যোগ দিবসের উদযাপনে যোগ দিয়েছেন।

রেড রোডের এই ঐতিহাসিক সমাবেশ প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগ নিয়ে আগ্রহ এখন তুঙ্গে। রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই শিবিরে সমাজের সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। মোদীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আট থেকে আশি, সকলকেই বিভিন্ন জটিল ও সহজ আসন অনুশীলন করতে দেখা যায়।

রেড রোডে যোগ ব্যায়ামের সেশন শেষ করার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পরবর্তী গন্তব্য ছিল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, সকাল সোয়া নয়টা নাগাদ তিনি সেখানে পৌঁছান। দেশের আত্মনির্ভরতার শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে তিনি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত নৌবাহিনীর তিনটি সর্বাধুনিক যুদ্ধজাহাজ— আইএনএস দুনগিরি, আইএনএস সংশোধক এবং আইএনএস অগ্রয়কে দেশের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।

নৌসেনার প্রযুক্তিগত শক্তি বৃদ্ধির অন্যতম মাইলফলক হিসেবে এই তিনটি রণতরীর অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই যুদ্ধজাহাজগুলি ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরো মজবুত করবে। এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর, প্রধানমন্ত্রী গঙ্গাপাড়ের এই শহর তথা পশ্চিমবঙ্গ থেকে সকাল ১১টা নাগাদ দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হন।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফর পশ্চিমবঙ্গের বুকে যেমন এক নতুন আধ্যাত্মিক জাগরণ সৃষ্টি করল, তেমনি জাতীয় প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও যোগ করল নতুন মাত্রা। কলকাতার রেড রোড থেকে শুরু করে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর পর্যন্ত মোদীর রবিবারের কর্মসূচিগুলি একদিকে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বার্তা দেয় এবং অন্যদিকে দেশের সুরক্ষিত ও শক্তিশালী ভবিষ্যতের দিকে এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিশ্চিত করে।

Previous post

8th Pay Commission: এবার DA বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আসতে পারে শীঘ্রই ? কতটা বাড়বে বেতন?

Next post

Weekly Weather Update: বঙ্গোপসাগর থেকে হু হু করে ঢুকছে জলীয় বাষ্প, উত্তরে প্রবল বৃষ্টির অশনি, দক্ষিণে ঝেঁপে বৃষ্টি, রইল সপ্তাহের ওয়েদার আপডেট

Post Comment

You May Have Missed