NEET-UG 2026: পরীক্ষাকেন্দ্রে কড়া নজরদারি, রবিবার নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয়ে দেশজুড়ে পরীক্ষা
India
-Ritesh Ghosh
গত ৩ মে আয়োজিত মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট-ইউজি’ (NEET-UG)-র প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তোলপাড় হয়েছিল। সেই ধাক্কা সামলে দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা তীব্র উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ২১ জুন, রবিবার দেশজুড়ে পুনরায় এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। দেশ ও বিদেশের মোট ৫৬৫টি কেন্দ্রে ২২.৭৯ লক্ষেরও বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরীক্ষার্থী জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।
পরীক্ষা বাতিলের পর থেকে কেন্দ্রের মোদী সরকার এবং পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা ‘ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি’ (এনটিএ)-র বিরুদ্ধে লাগাতার অসন্তোষ ও ছাত্র বিক্ষোভের আবহ তৈরি হয়েছিল। এই পরীক্ষা ঘিরে লাখো পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ যেমন জড়িয়ে রয়েছে, তেমনই জড়িয়ে রয়েছে এনটিএ-র বিশ্বাসযোগ্যতাও। সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতে এবং একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জালিয়াতিমুক্ত পরীক্ষা উপহার দিতে এবার সর্বোচ্চ মানের কঠোর পদক্ষেপ করা হয়েছে।

এনটিএ-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের পরীক্ষায় কোনওরকম ফাঁকফোকর রাখতে চায় না তারা। তাই প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে কড়া নজরদারির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মোট ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ৫৬০টি সিসিটিভি ক্যামেরা সচল থাকবে এই পরীক্ষার জন্য। দেশের প্রায় ৯৫ হাজার পরীক্ষা কক্ষের প্রত্যেকটিতে অন্তত একটি করে হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরা বসানো হয়েছে, যার ওপর দিল্লির সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম থেকে নজর রাখা হবে।
এবারের নজরদারি শুধু সাধারণ ক্যামেরার ওপর সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জালিয়াতি রুখতে এবার সিসিটিভি ফুটেজ রিয়েল টাইমে বিশ্লেষণ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) টুল। পরীক্ষাকক্ষে কোনো পরীক্ষার্থী বা পরিদর্শকের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফেসিয়াল অ্যানালিটিকস অ্যালগরিদম সঙ্গে সঙ্গে তা চিহ্নিত করবে এবং অ্যালার্ট জারি করবে।
পরীক্ষার সময় পরীক্ষাকেন্দ্রে মোবাইল ফোন বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে কারচুপি রুখতে দেশজুড়ে মোট ৫১,৩১১টি হাই-পাওয়ার জ্যামার মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া, নজরদারি জোরদার করতে প্রতিটি পরীক্ষাকক্ষে অন্তত দু’জন করে পরিদর্শক উপস্থিত থাকবেন। কেন্দ্রে সশরীরে উপস্থিত থাকা ৬,৭০০ জন পর্যবেক্ষক ছাড়াও প্রায় ১০০ জনের বেশি ভার্চুয়াল পর্যবেক্ষক লাইভ ফুটেজের মাধ্যমে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখবেন।
পরীক্ষার্থীদের পরিচয় সুনিশ্চিত করতে এবং ছদ্মবেশী বা ডামি পরীক্ষার্থীদের প্রবেশ রুখতে এবার অত্যন্ত কড়া তল্লাশি বা ফ্রিস্কিং প্রোটোকল চালু করা হয়েছে। পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের মুখেই পরীক্ষার্থীদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য ৪৮,৪৪৮ জন বিশেষ বায়োমেট্রিক কর্মী নিযুক্ত করা হয়েছে। জালিয়াতি রুখতে এবার বায়োমেট্রিক ম্যানপাওয়ার দ্বিগুণ করা হয়েছে এবং এর পাশাপাশি বসানো হয়েছে আধুনিক ফেস অথেন্টিকেশন বা মুখমণ্ডল স্ক্যান করার প্রযুক্তি।
শুধুমাত্র বায়োমেট্রিক নয়, শারীরিক তল্লাশির কাজ নিখুঁত করতে প্রতিটি সেন্টারে আলাদাভাবে পুরুষ ও মহিলা কর্মীদের মোতায়েন করা হয়েছে। তল্লাশি প্রক্রিয়া দ্রুত ও নিশ্ছিদ্র করার স্বার্থে এবার মোট ৩৮,৭৯৫ জন ফ্রিস্কিং স্টাফ কাজ করছেন। এনটিএ সুনিশ্চিত করেছে যে, পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রতিটি পরীক্ষার্থীর সমস্ত নথিপত্র এবং শারীরিক পরীক্ষা সম্পূর্ণ করা হবে, যাতে কোনো অননুমোদিত বস্তু কেন্দ্রের ভিতরে না পৌঁছয়।
এবারের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিলি যেমন কঠোর প্রহরায় করা হয়েছে, ঠিক তেমনই ওএমআর (OMR) শিট বা উত্তরপত্রগুলি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এই কাজের নিরাপত্তায় যুক্ত করা হয়েছে ডাক বিভাগকে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর কঠোর প্রটোকল মেনে প্রায় ৭০০টি কেন্দ্র থেকে সরাসরি ডাক বিভাগের কর্মীরা ওএমআর শিটগুলি সংগ্রহ করবেন। এছাড়াও গোটা প্রক্রিয়ায় দেশের প্রায় ১৫০০টি ব্যাঙ্ক শাখার আধিকারিকদের ওএমআর শিট জমার সুরক্ষাবলয় পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
যে কোনো রকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবারের পুনঃপরীক্ষা আয়োজনে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনীর পাশাপাশি ভারতীয় বিমানবাহিনীও তৎপর রয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন থাকছেন। শনিবার দেশজুড়ে একটি মক ড্রিল বা মহড়ার মাধ্যমে জ্যামার, ক্যামেরা ও অন্যান্য পরিকাঠামো খতিয়ে দেখা হয়েছে।
গোটা দেশে চলমান তীব্র গরম ও তাপপ্রবাহের কারণে পড়ুয়াদের স্বাস্থ্যসুরক্ষাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে ঠান্ডা পানীয় জল, ওআরএস (ORS)-এর বন্দোবস্ত রাখার পাশাপাশি আপৎকালীন চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকদের জন্য থাকছে ছায়াবৃত অপেক্ষাগার।
প্রবেশের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে যাতে পরীক্ষার্থীরা অসুস্থ না হন, সে জন্য এবার গেট খোলার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। ঘরের দেওয়াল ঘড়ি ছাড়া খসড়া কাজের অতিরিক্ত কাগজও দেওয়া হবে। এমনকি বামহাতি পরীক্ষার্থীদের বসার ক্ষেত্রেও বিশেষ স্বাচ্ছন্দ্যের বন্দোবস্ত রাখা হয়েছে।
পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে সোশাল মিডিয়ায় প্রশ্ন ফাঁসের কোনো গুজব বা ভুয়ো দাবি বরদাস্ত করা হবে না বলে সাফ জানিয়েছে এনটিএ। এ ধরনের গতিবিধির ওপর সাইবার সেল ও পুলিশ নজরদারি চালাচ্ছে। প্রসঙ্গত, প্রশ্নপত্র পরীক্ষা শুরুর আগে ফাঁস হওয়া ঠেকাতে সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্ট টেলিগ্রাম অ্যাপের ওপর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত রায়কেও বহাল রেখেছে।
রবিবার দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৫টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত অফলাইন বা পেন-অ্যান্ড-পেপার মোডে এই পরীক্ষা সম্পন্ন হচ্ছে। ভারত মিলিয়ে মোট ৫৫১টি শহর এবং বিদেশের ১৪টি শহরে এই মেগা পরীক্ষার ফলপ্রসূতা নির্ধারণের চেষ্টা করছে শিক্ষা মন্ত্রক। দীর্ঘ তিক্ততা ভুলে দেশের মেধাবী ভবিষ্যৎ যাতে সুষ্ঠুভাবে জীবন গড়ার প্রথম ধাপে সফল হতে পারে, এখন সেই সুরক্ষার পরিবেশ বজায় রাখাই প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।



Post Comment