এন্টোমো বিজনেস : বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম টেকসই ব্যবসা
ড. উৎপল অধিকারী
পৃথিবীতে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে মনে করা হচ্ছে, পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা ৯.৭ বিলিয়নের কাছাকাছি পৌঁছাবে। এই বাড়তি জনসংখ্যার খাদ্য, জ্বালানি, সার ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প উৎসের সন্ধান করছেন। এ অবস্থায় পোকামাকড় বা ইনসেক্টকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে একটি দ্রুত বর্ধনশীল ব্যবসা, যার নাম এন্টোমো বিজনেস। নতুন এই ব্যবসা পরিকল্পনাটি হল কৃষিবিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞান, বায়োপ্রযুক্তি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি টেকসই বায়ো ইকোনমি মডেল।
এন্টোমোলজি বা পতঙ্গবিদ্যা থেকে এন্টোমো বিজনেস এর উৎপত্তি। মূলত পোকা-মাকড়কে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয় এই ব্যবসা। এর মধ্যে রয়েছে ভোজ্য পোকামাকড়, পশুখাদ্য ও বায়োফার্টিলাইজার উৎপাদন, জৈব বর্জ্য পদার্থের ভাঙন, পোকামাকড়ভিত্তিক ওষুধ, সিল্ক, ল্যাক, মধু ইত্যাদি উৎপাদন। পোকামাকড় ভিত্তিক বায়োরোবটিক্স ও বায়োসেন্সর তৈরি করা হয়। পতঙ্গ নিয়ন্ত্রিত পেস্ট ম্যানেজমেন্ট একটি পরিবেশ বান্ধব প্রক্রিয়া। এই শিল্পের প্রধান লক্ষ্য হল কম সম্পদ ব্যবহারে উচ্চ উৎপাদন ও উচ্চ পুষ্টিমান নিশ্চিত করা। অনেক পোকামাকড়ে রয়েছে ৪৫-৭৫% প্রোটিন, ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম, আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন বি-১২ ও কাইটিন, যা ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। ক্রিকেট, মিল ওয়ার্ম ও ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই (বিএসএফ) এর পুষ্টিমান প্রচলিত মাংসের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে বেশি।
এছাড়াও পোকা প্রতিপালনে গরু বা ছাগলের তুলনায় ৫০-৯০% কম জল লাগে ও ভূমি ব্যবহার ১০ গুণ কম হয়। পোকা নিজের দেহের ৮০-৯০% খাদ্যকে বায়োমাসে রূপান্তরিত করতে পারে, যা যে কোনো প্রাণীর চেয়ে অনেকটাই বেশি। গবাদি পশুর তুলনায় পোকা উৎপাদনে মিথেন নির্গমন প্রায় শূন্য, নাইট্রাস অক্সাইডের নির্গমন ৬০-৭০% কম ও কার্বন ফুট প্রিন্ট ৫-৮ গুণ কম হয়। এই কারণে আন্তর্জাতিক খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) পোকাকে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখছে।
এন্টোমো বিজনেসের প্রধান শাখা
মানুষের খাদ্য ও প্রাণী খাদ্য
বিশ্বের ২২০ কোটির বেশি মানুষ ইতিমধ্যে বিভিন্ন পোকাকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। সবচেয়ে পরিচিত ভোজ্য পোকা ক্রিকেট, গঙ্গাফড়িং, মিলওয়ার্ম, সিল্কওয়ার্ম পিউপা, টার্মাইট, ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই লার্ভা ইত্যাদি। এগুলো থেকে প্রোটিন বার, বিস্কুট, নুডলস, শেক, বেকারি আইটেম এমনকি পাস্তাও তৈরি হচ্ছে। পোল্ট্রি, মাছ, হাঁস, কুকুর ও বিড়ালের খাদ্যে এই জাতীয় প্রোটিন দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশেষত বিএসএফ লার্ভা বিশ্বজুড়ে অ্যাকুয়াকালচারের অন্যতম আদর্শ খাদ্য বিকল্প চিহ্নিত হয়েছে। কারণ এগুলি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হজম শক্তিকে উন্নত করে, মাছের বায়োফ্লক উৎপাদন বৃদ্ধি করে। এন্টোমো ফিড ভবিষ্যতের ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাজার হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
পোকামাকড় বর্জ্য ভাঙতে অত্যন্ত দক্ষ। বিশেষত বিএসএফ লার্ভা খাদ্য বর্জ্য, গৃহস্থালী বর্জ্য, কৃষি বর্জ্য, মাছ বাজারের বর্জ্য, গোবর ইত্যাদি দ্রুত ভেঙে উচ্চমানের প্রোটিন ও বায়োফার্টিলাইজার তৈরি করা হচ্ছে। ১ টন খাদ্যবর্জ্যে বিএসএফ লার্ভা থেকে ২০০-৩০০ কেজি প্রোটিন, ৩০০-৪০০ কেজি অর্গানিক সারের উৎপাদন করা যায়। এটিই ভবিষ্যতের সার্কুলার ইকোনমি মডেল হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জৈব সার উৎপাদন
পোকা চাষের উপজাত থেকে উচ্চমানের অর্গানিক সার বা জৈব সার তৈরি করা হচ্ছে। এতে থাকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ ও কাইটিন, যা উদ্ভিদ রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে ও ফসলের উৎপাদন ১৫-২৫% পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম।
বায়োমেডিসিন
বিভিন্ন পোকা থেকে নিষ্কাশিত বায়োমলিকিউল এখন বায়োমেডিসিনে ব্যবহৃত হচ্ছে। সিল্ক প্রোটিন থেকেই প্রাপ্ত তন্তু সার্জিক্যাল স্টিচ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। মৌমাছির বিষ আর্থ্রাইটিস নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করে। কাইটিন ও কাইটোসান ক্ষত সারাতে এবং মিলওয়ার্ম ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদপিণ্ডের সুরক্ষা প্রদানে বিশেষ কার্যকরী। এগুলো স্বাস্থ্য শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি
নির্দিষ্ট তাপমাত্রা যথা ২৭-৩২°C ও আর্দ্রতায় (৬০–৭০%), স্বয়ংক্রিয় খাদ্য সরবরাহ ট্রে তে অল্প জায়গায় হাজার-হাজার লার্ভা প্রতিপালন করা হয়। একে ‘ক্লাইমেট কন্ট্রোলড হাই ডেনসিটি ফার্মিং’ বলে।
পরিবেশগত সুবিধা
বর্জ্য কমানোর জন্য ইউরোপের বহু শহরে খাদ্য বর্জ্য সমস্যার সমাধানে বিএসএফ লার্ভা ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলি জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে ও পশুখাদ্য উৎপাদনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষিত থাকবে।
কার্বন নিরপেক্ষ উৎপাদন
পোকা চাষে খরচ কম এবং বর্জ্য উৎপাদনও কম। ফলে নেট কার্বন ফুট প্রিন্টও অত্যন্ত কম বলে দেখা যাচ্ছে।
ভারতের প্রেক্ষাপট
ভারতে এন্টোমো বিজনেস দ্রুত বাড়ছে। ভারতের উপযোগী প্রজাতি বিএসএফ, মিলওয়ার্ম, ক্রিকেট, সিল্কওয়ার্ম ইত্যাদির উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্য যেমন হরিয়ানা, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা ও পশ্চিমবঙ্গে আধুনিক ইনসেক্ট ফার্ম গড়ে উঠছে। ভারত সরকার ২০২৩ সালে পোকা প্রোটিন থেকে বিকল্প পশু খাদ্য উৎপাদনে অনুমোদন দেয়, যা ভবিষ্যতে এই ধরনের শিল্প সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা পালন করবে।
সম্ভাবনা ও বাজার
বিশ্বের বাজারে এন্টোমো বিজনেস ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ২০২৪ সালে এর বাজার ছিল প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৩ সালে এই ব্যবসা বেড়ে ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে এই আশা করা যেতেই পারে। এর প্রধান চাহিদার ক্ষেত্রগুলি হল অ্যাকুয়া ফুড, পোল্ট্রি ফুড ও পেট ফুড উৎপাদন। এছাড়াও ভোজ্য পতঙ্গ ও বায়োফার্টিলাইজারেরও যথেষ্ট বাজার আছে। ভবিষ্যতে ভারতে এই বাজার আরও বাড়বে আশা করা যায়।
চ্যালেঞ্জ
সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, খাদ্য নিরাপত্তা নীতি সকল, প্রজাতি নির্বাচনের সমস্যা, বায়োসেফটি ও হাইজিনিক প্রোডাকশন, অজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের অভাব এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রচার, সরকারি সহায়তা এবং স্টার্টআপ পরিচালনা অপরিহার্য।
ভবিষ্যৎ
এন্টোমো বিজনেস কেবল একটি ব্যবসা নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি স্থায়িত্ব, পরিবেশ সুরক্ষা, বায়োপ্রযুক্তির উন্নয়ন সমন্বয়ে মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎকে আরও টেকসই করার পথ দেখায়। ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে এই পোকামাকড় থেকে প্রাপ্ত প্রোটিন হবে ’গ্রিন প্রোটিন’ এবং এন্টোমো বিজনেস হবে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম টেকসই ব্যবসা।
লেখক- পূর্ব বর্ধমানের আঝাপুর হাই স্কুলের সহ শিক্ষক। প্রতিবেদনটি এবিপি লাইভ কর্তৃক বিষয়-সম্পাদিত নয়।



Post Comment