বিদেশি খুঁজতে জায়গায় জায়গায় হানা, অগ্নিগর্ভ আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলস, সমালোচনায় বিদ্ধ ট্রাম্প

বিদেশি খুঁজতে জায়গায় জায়গায় হানা, অগ্নিগর্ভ আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলস, সমালোচনায় বিদ্ধ ট্রাম্প

লস অ্যাঞ্জেলস:  ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বিরোধ চলছিলই। এবার আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলসের পরিস্থিতি এই মুহূর্তে অগ্নিগর্ভ। একদিকে, পুলিশ ও অভিবাস দফতরের বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযোগ তুলছেন প্রতিবাদীরা। প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছেন দলে দলে। জায়গায় জায়গায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। অন্য দিকে, প্রতিবাদীদের ছত্রখান করতে নির্বিচারে গ্রেফতারি, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটানো থেকে ছররা গুলি ছোড়ার অভিযোগও সামনে আসছে। এমনকি খবর করতে যাওয়া সাংবাদিকের শরীরেও রবারের গুলি বিঁধে গিয়েছে বলে খবর। (Los Angeles Protests)

দ্বিতীয় বার আমেরিকার মসনদে ফিরেই বিদেশি তাড়াতে তৎপর হয়ে ওঠেন ট্রাম্প। কোমরে হাতে-পায়ে বেড়ি পরিয়ে বেআইনি  অভিবাসীদের বিমানে তোলা হয় দলে দলে মানুষকে। এমনকি দেশের তাবড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত বিদেশি পড়ুয়াদেরও শনাক্ত কারর প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই নিয়ে প্রতিবাদ বিরোধের মধ্যেই সপ্তাহান্তে কার্যত বিস্ফোরণ ঘটে আমেরিকার ঝাঁ চকচকে শহর লস অ্যাঞ্জেলসে। আমেরিকার অভিবাসন ও শুল্ক দফতর (Immigration And Customs Enforcement (ICE) Department) অতর্কিতে জায়গায় জায়গায় হানা দিতে এবং নির্বিচারে গ্রেফতার করতে শুরু করলে পরিস্থিতি তেতে ওঠে। (Donald Trump)

জানা গিয়েছে, গত শুক্রবার পর পর হোম ডিপো, ডোনাটের দোকান, রেস্তরাঁ, জামা-কাপড়ের গুদামে অতর্কিতে হানা দেয় ICE. ওই সব জায়গায় কর্মরত লোকজন, যাঁদের কাছে বৈধ কাগজপত্র নেই, জাল কাগজ তৈরি করে রয়ে গিয়েছেন যাঁরা,  তাঁদের ধরতেই অতর্কিতে অভিযান চালানো হয়। ঘটনাস্থল থেকে যে ছবি ও ভিডিও সামনে আসে, তাতে ICE-র গাড়িও আটকাতে দেখা যায় স্থানীয়দের। আধিকারিকদের ঘিরে বিক্ষোভ দেখান শত শত মানুষ। যাঁদের বন্দি করা হয়েছে, সকলকে মুক্ত করার দাবি জানানো হয়। বেশ কিছু জায়গায় ICE-কে ঢুকতেও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। জানা যায়, শুক্রবার এক জায়গায় হানা দিয়েই ৪৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। আর এক জায়গা থেকে গ্রেফতার করা হয় ৭৭ জনকে।

পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে বেআইনি জমায়েত নিষিদ্ধ করে সরকার, ব্যাপক ধরপাকড়ও চালানো হয়। প্রতিবাদীদের হঠাতে লাঠিচার্জ করা হয়। কিন্তু তাতেও প্রতিবাদ ঠেকানো যায়নি। বরং দলে দলে মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। এর পর কিছু না জানিয়েই পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায়, এমনকি প্রতিবাদীদের লক্ষ্য করে লঙ্কার Pepper Balls অর্থাৎ ঝাঁঝালো পদার্থ ভর্তি বোমাও ছোড়া হয়। প্রতিবাদীদের লক্ষ্য় করে নির্বিচারে ছররা গুলি, অর্থাৎ রবারের গুলি ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ এ নিয়ে সরব হয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, লস অ্যাঞ্জেলসে খবর করতে গিয়ে রবারের গুলিতে আহত হয়েছেন লরেন টোমাসি নামের এক সাংবাদিক। ভিডিও ফুটেজে গোটা ঘটনা ধরা পড়েছে, লুকনোর কোনও সুযোগ নেই বলে জানান তিনি। ট্রাম্প সরকারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন অ্যান্টনি। সোশ্য়াল মিডিয়াতেও ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন লরেন। হঠাৎই কান ফাটানো শব্দ শোনা যায়। একটি রবারের গুলি এসে সটান লাগে লরেনের গায়ে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠেন তিনি।

পুলিশের এমন আচরণে লস অ্যাঞ্জেলসের পাশাপাশি অন্য শহরগুলিতেও আন্দোলন চরম আকার ধারণ করেছে। সান ফ্রান্সিসকো, নিউ ইয়র্ক, আটলান্টা, সিয়াটলের মতো শহরেও দলে দলে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছেন। সান ফ্রান্সিসকোয় প্রায় ১৫০ জন গ্রেফতার হয়েছেন। নিউ ইয়র্কেও ব্যাপক ধরপাকড় চলছে বলে খবর। দেশের অন্দরে তো বটেই, রিপাবলিকানদের মধ্যেও ট্রাম্প সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কিন্তু নিজের অবস্থান থেকে সরতে নারাজ ট্রাম্প। বিক্ষোভ দমন করতে গ্রেটার লস অ্যাঞ্জেলসে তিনি আরও ২০০০ ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন। ৭০০ মেরিনও কনামানো হয়েছে। আগামী দু’মাস সেখানে সেনা মোতায়েন থাকবে বলে জানা যাচ্ছে। 

 লস অ্যাঞ্জেলসের মেয়র ক্যারেন ব্যাস সরকারের পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা করেছেন। তিনি জানান, লস অ্যাঞ্জেলসে সেনা নামিয়ে নজির স্থাপন করতে চাইছে ট্রাম্প সরকার। স্থানীয় প্রশাসনের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই এমন পদক্ষেপ। লস অ্যাঞ্জেলস বেআইনি অভিবাসী ও অপরাধীদের হাতে চলে যাচ্ছে বলে যে দাবি করছে ট্রাম্প সরকার, তাও খারিজ করে দেন ক্যারেন। তাঁর দাবি, লস অ্যাঞ্জেলস বরাবর শান্তিপূর্ণ থেকেছে। ট্রাম্প সরকারই অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার প্রাদেশিক সরকার ট্রাম্প সরকারের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে। সেনা নামানোর উপর স্থগিতাদেশ জারি করতে আবেদন জানিয়েছে আদালতে। 

ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমও তীব্র আক্রমণ করেছেন ট্রাম্পকে। তাঁর দাবি, ইচ্ছাকৃত ভাবে অশান্তির পরিবেশ তৈরি করছেন ট্রাম্প। দেশে গৃহযুদ্ধ চান তিনি। রাস্তায় রাস্তায় গৃহযুদ্ধ দেখতে চাইছেন। তাঁর কথায়, “এই সঙ্কট তৈরি করা হয়েছে, যাতে দেশের সামরিক বাহিনীর উপরও কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারেন উনি। আমাদের দেশের ভিত্তির উপর আঘাত হানছেন সরাসরি। যে দলেরই হোন না কেন,সমস্ত গভর্নরদের এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত।  ইচ্ছাকৃত ভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে, মানুষকে ভয় দেখানো হচ্ছে, গণতন্ত্রের সমস্ত নীতি বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে।” অবিলম্বে লস অ্যাঞ্জেলস থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে ট্রাম্প সরকারকে চিঠিও দিয়েছেন তিনি।

আমেরিকার প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট তথা ট্রাম্পের একসময়কার প্রতিদ্বন্দ্বী কমলা হ্যারিসও গোটা ঘটনায় সরব হয়েছেন। বিবৃতি প্রকাশ করে বলেন, ‘লস অ্যাঞ্জেলস আমার বাড়ি। অন্য নাগরিকতদের মতো, শহরের এই অবস্থা দেখে আমি শিহরিত। ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের সিদ্ধান্ত উস্কানিমূলক, যাতে অশান্তি আরও ছড়ায়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি থেকে ধরপাকড়, এর নেপথ্যে ট্রাম্প সরকারের নিষ্ঠুর, পরিকল্পিত উদ্দেশ্য় রয়েছে। ওরা ভীতি ছড়াতে চায়, সমাজে বিভাজন তৈরি করতে চায়’।



Post Comment

You May Have Missed