ঘোর সঙ্কট পোল্যান্ডে, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতায় প্রশ্ন, মাঝ আকাশে বিমান ঘোরালেন প্রেসিডেন্ট
ওয়ারশ: চরম সাংবিধানিক সঙ্কট পোল্যান্ডে। বিরোধীদের সঙ্গে সংঘাত চরমে প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড তুস্কের। বিচারপতি নিয়োগকে ঘিরে এই সংঘাতের সূচনা হয়, যা নতুন করে চরমে পৌঁছেছে। দেশের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট বোগদান সুইকজস্কি এবং তাঁর ডেপুটি বার্তোমি সোকানস্কিকে বরখাস্ত করেন ট্রাইব্যুনালের অন্যতম বিচারপতি অ্যানা করউইন-পিওত্রোভস্কা। বিচারবিভাগে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার দরুণ, সিনিয়রিটির নিরিখে নিজেকে ওই পদের দাবিদার ঘোষণা করেন তিনি। আর তাতেই আইনের শাসনের পরিবর্তে অভ্যুত্থানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে পোল্যান্ডে। প্রকাশ্যে সংঘর্ষ, খণ্ডযুদ্ধের খবরও সামনে আসছে। (Polan Constitutional Crisis)
পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে সেনেগল যাওয়ার পথে বিমান ঘুরিয়ে পোল্যান্ড ফিরে এসেছেন প্রেসিডেন্ট কারল নাভরতস্কি। সরকার এবং বিরোধী পক্ষের সঙ্গে শনিবার বৈঠক ডাকেন তিনি। এর পর পরই দেশের আইনমন্ত্রী তথা সরকারি কৌঁসুলি ভলদেমা জুরেক সাংবাদিক বৈঠক করে জানান, দুই বিচারপচির আইনি রক্ষাকবচ প্রত্যাহার করা হোক। এতে তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি পদক্ষেপ করার রাস্তা সুগম হবে। ট্রাইব্যুনালকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি। (Poland Political Crisis)
আরও পড়ুন: মক পার্লামেন্টে জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ইমপিচ’ করল বিরোধীরা, রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা চালানোর দাবি
এই ট্রাইব্য়ুনাল আসলে পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত। সংসদে পাস হওয়া আইন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সংবিধান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত তাদের হাতে। সরকারি সংস্থার বিরোধের নিষ্পত্তিও করে তারা। অন্য দিকে, সুপ্রিম কোর্ট নাগরিক মামলা, অপরাধ মামলা, শ্রম-মামলার দায়িত্বে রয়েছে। সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালে ১৫ জন বিচারপতি রয়েছেন, যাদের নিয়োগ করে সংসদের নিম্নকক্ষ। প্রত্যেক বিচারপতির কার্যকালের মেয়াদ ন’বছর। তার চেয়ে বেশি সময় কাজ চালিয়ে যেতে পারেন না কেউ। অন্য দিকে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগ করেন প্রেসিডেন্ট। ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ দ্য জুডিশিয়ারি নাম সুপারিশ করে। ৬৫-৭০ বছর বয়স পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে পারেন বিচারপতিরা।
সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের নিয়েই পরিস্থিতি তেতে উঠেছে। এই মুহুর্তে। দুই বিচারপতিকে বরখাস্তের নির্দেশ খারিজ করে দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। তাদের দাবি, যে বা যাঁরা এই কাজে যুক্ত, তাঁরা আসলে অভ্যুত্থান ঘটাতে চাইছেন দেশে। এই মুহূর্তে ট্রাইব্যুনালের বাইরে পুলিশ ও সেনা মোতায়েন রাখা হয়েছে। পোল্যান্ডের দক্ষিণপন্থী বিরোধীদল PiS-এর সদস্যরা বাইরে জড়ো হয়ছেন। ব্যারিকেড টপকে ভিতরে যাওয়ার চেষ্টা করেন অনেকে। কেউ কেউ স্লোগান তোলেন, ‘তুস্ক বিশ্বাসঘাতক’, ‘তুস্ক দেশদ্রোহী’ বলে। বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে ইতিমধ্যেই।
পোল্যান্ডের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তুস্ক এবং প্রধান বিরোধী দল PiS-এর সংঘাত চরমে পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু এই পরিস্থিতি তৈরি হল কেন?
- এই বিরোধের সূচনা ২০১৫ সালে। সেই সময় ক্ষমতাচ্যুত হতে চলা PO-PSL জোট সরকার আইন বদলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পাঁচ জন বিচারপতি নিয়োগ করে। কিন্তু দেশের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট আন্দ্রজে়জ ডুদা তাঁদের শপথগ্রহণকে মানতে রাজি হননি। এর পর ক্ষমতায় এসে পূর্বতন PiS সরকার নতুন পাঁচ বিচারপতি নিয়োগ করে। কিন্তু আদালত জানায়, আগের তিন বিচারপতিকে নিয়োগের পদ্ধতি বৈধ ছিল। এর ফলে তীব্র টানাপোড়েন শুরু হয়।
- এর পর, পূর্বতন PiS সরকার আদালতের কার্যপদ্ধতিতে রদবদল ঘটায় এবং নিজেদের নিয়োগ করা বিচারপতিদের কাজে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেয়। এতে আদালতের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। ২০২১ সালে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
- ক্ষমতায় এসে তুস্কের জোট সরকার PiS-এর আমলে ওই বিচারপতিদের নিযুক্তির বৈধতা বাতিল করে। প্রেসিডেন্ট ডুদা তাতে সমর্থন না জানিয়ে, বিষয়টিকে আদালতে পাঠান এবং নতুন বিচারপতি হিসেবে কাজে যোগ দেন বোগদান সুইকজস্কি। চলতি বছরে সংসদ ছয় জন নতুন বিচারক নির্বাচন করলে, প্রেসিডেন্ট নাভরতস্কি মাত্র দু’জনকে শপথগ্রহণ করান। বাকি চার জন শপথ নেন নোটারির মাধ্যমে, যা গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানান প্রেসিডেন্ট খোদ। একই কথা বলে আদালত। যদিও ইউরোপিয়া মানবাধিকার সম্মেলন এবং ভেনিস কমিশনের যুক্তি ছিল, প্রেসিডেন্টের ভূমিকা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক। তিনি এসবে মাথা ঘামাতে পারেন না।
- চলতি অক্টোবরে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছয়। বিচারপতি অ্যানা সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট বোগদান সুইকজস্কি এবং তাঁর ডেপুটি বার্তোমি সোকানস্কিকে বরখাস্ত করে সাময়িক ভাবে আদালতের দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা করেন। এর ফলে সংঘাত চরমে পৌঁছয়। প্রেসিডেন্ট নাভরতস্কি বিষয়টিকে ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জবরদখলে’র চেষ্টা বলে অভিহিত করেন।
পোল্যান্ডের এই সঙ্কট গোটা ইউরোপের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি কেবল মাত্র ক্ষমতার লড়াই নয়। গণতন্ত্রে ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা এবং সর্বোপরি আইনের শআসনের উপর মানুষের আস্থার প্রশ্ন জড়িয়ে এর সঙ্গে। সবমিলিয়ে উত্তেজনা চরমে।
Suvendu Adhikari | “মহম্মদ সেলিম.. এত বড় সাহস”, নিশানা করে কী বললেন মুখ্যমন্ত্রী?
Post Comment