Encounter: ‘সকালে জমা বিকেলে খরচ’, বারুইপুরের পর ফের গাইঘাটা! পুলিশ কি আইনত এনকাউন্টার করতে পারে? এ বিষয়ে কী বলেছে সুপ্রিম কোর্ট

ঘটনার পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। নৃশংস অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অভিযুক্তের মৃত্যুতে অনেকেই বলছেন, ‘বেশ হয়েছে’। আবার প্রশ্ন উঠছে, অপরাধ যত গুরুতরই হোক, পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যু কি আদৌ আইনের চোখে বিচার? নাকি তা বিচারবহির্ভূত হত্যার পর্যায়ে পড়তে পারে? পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যু ও গুরুতর আঘাতের ঘটনায় তদন্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্টও নির্দিষ্ট নির্দেশিকা দিয়েছে৷

কী সেই নির্দেশিকা? এনকাউন্টারে মৃত্যু হলে পুলিশের কী কী করণীয়? অভিযুক্তের মৃত্যু হলেও কি এফআইআর ও স্বাধীন তদন্ত বাধ্যতামূলক? পুলিশের গুলিতে মৃত্যু কখন আইনসম্মত হতে পারে, আর কখন তা বেআইনি বলে গণ্য হতে পারে? জেনে নেওয়া যাক, এনকাউন্টার নিয়ে আইন কী বলছে এবং এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকাগুলি কী।

পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যুর তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের ১৬ দফা নির্দেশিকা

১. আগাম খবর নথিভুক্ত করা: গুরুতর অপরাধ সংঘটনের বিষয়ে পুলিশ কোনও গোয়েন্দা তথ্য বা আগাম খবর পেলে তা লিখিতভাবে অথবা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে নথিভুক্ত করতে হবে। তবে সন্দেহভাজন ব্যক্তির পরিচয় বা পুলিশ কোথায় অভিযান চালাতে যাচ্ছে, সেই তথ্য উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক নয়।

২. এফআইআর দায়ের: আগাম পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করলে এবং তার জেরে কারও মৃত্যু হলে, যথাযথ ফৌজদারি তদন্ত শুরু করার জন্য এফআইআর দায়ের করতে হবে। কোনও বিলম্ব না করে সেই এফআইআর আদালতে পাঠাতে হবে।

৩. স্বাধীন তদন্ত: এনকাউন্টারে মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত করতে হবে স্বাধীন অপরাধ তদন্ত বিভাগ (CID)-এর দল অথবা অন্য থানার পুলিশকর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি দলকে। একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিকের তত্ত্বাবধানে তদন্ত চালাতে হবে। মৃতের পরিচয় শনাক্ত করা, প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা এবং ঘটনাস্থলের সাক্ষীদের চিহ্নিত করার মতো অন্তত আটটি ন্যূনতম তদন্তমূলক শর্ত পূরণ করতে হবে।

৪. ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত: এনকাউন্টারে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনায় বাধ্যতামূলকভাবে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত করতে হবে। সেই তদন্তের রিপোর্ট বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠাতে হবে।

৫. জাতীয় বা রাজ্য মানবাধিকার কমিশনকে জানানো: এনকাউন্টারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে অবিলম্বে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC) অথবা সংশ্লিষ্ট রাজ্য মানবাধিকার কমিশনকে জানাতে হবে।

৬. আহতদের চিকিৎসা ও বয়ান নথিভুক্ত করা: আহত ব্যক্তি বা অভিযুক্ত অপরাধীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে। পাশাপাশি, তাঁর শারীরিক অবস্থার উপযুক্ততার শংসাপত্র-সহ ম্যাজিস্ট্রেট অথবা চিকিৎসা আধিকারিককে তাঁর বয়ান নথিভুক্ত করতে হবে।

৭. নথি পাঠাতে দেরি নয়: এফআইআর, পঞ্চনামা, ঘটনাস্থলের স্কেচ এবং পুলিশের ডায়েরির সংশ্লিষ্ট নথি কোনও বিলম্ব ছাড়াই উপযুক্ত আদালতে পাঠাতে হবে।

৮. তদন্ত শেষে আদালতে রিপোর্ট জমা: ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হওয়ার পর উপযুক্ত আদালতে রিপোর্ট জমা দিতে হবে, যাতে দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।

৯. মৃতের পরিজনকে জানানো: এনকাউন্টারে অভিযুক্ত অপরাধীর মৃত্যু হলে যত দ্রুত সম্ভব তাঁর নিকটাত্মীয়দের বিষয়টি জানাতে হবে।

১০. ছয় মাস অন্তর রিপোর্ট জমা: এনকাউন্টারে মৃত্যুর সমস্ত ঘটনার বিবরণ নির্দিষ্ট তারিখ ও নির্ধারিত ফরম্যাট অনুযায়ী বছরে দু’বার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে পাঠাতে হবে। এই রিপোর্ট পাঠানোর দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজ্যের পুলিশ প্রধান বা ডিজিপির (DGP)।

১১. দোষী পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: এনকাউন্টারের ঘটনা যদি ভারতীয় দণ্ডবিধি (IPC) অনুযায়ী অপরাধ বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে দোষী পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা শুরু করতে হবে। তদন্ত চলাকালীন সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত রাখতে হবে।

১২. ক্ষতিপূরণ প্রদান: ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ৩৫৭এ ধারায় বর্ণিত ক্ষতিপূরণ প্রকল্প অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তির নির্ভরশীলদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

১৩. পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র জমা: সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মী বা আধিকারিকদের ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র ফরেনসিক ও ব্যালিস্টিক পরীক্ষার জন্য জমা দিতে হবে। তবে সংবিধানের ২০ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত অধিকারগুলি এক্ষেত্রে বজায় থাকবে।

১৪. অভিযুক্ত পুলিশকর্মীর পরিবারকে আইনি সহায়তার কথা জানানো: ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীর পরিবারকে জানাতে হবে এবং তাঁদের আইনজীবী বা কাউন্সেলরের পরিষেবা নেওয়ার সুযোগ সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।

১৫. তাৎক্ষণিক পদোন্নতি বা বীরত্বের পুরস্কার নয়: এনকাউন্টারে মৃত্যুর ঘটনার পরপরই সেই ঘটনায় জড়িত পুলিশকর্মীদের কোনও বিশেষ পদোন্নতি বা তাৎক্ষণিক বীরত্বের পুরস্কার দেওয়া যাবে না।

১৬. অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা: নিহত ব্যক্তির পরিবার যদি মনে করে যে উপরের নির্দেশিকাগুলি যথাযথভাবে মানা হয়নি, তাহলে তারা ঘটনাস্থলের বিচারিক এক্তিয়ারভুক্ত দায়রা আদালতের বিচারকের কাছে অভিযোগ জানাতে পারবে। সংশ্লিষ্ট বিচারক অভিযোগের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখবেন এবং উত্থাপিত সমস্যাগুলির নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করবেন।

নির্দেশিকা মানা বাধ্যতামূলক

সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যু অথবা গুরুতর আঘাতের সমস্ত ঘটনায় এই নিয়ম ও নির্দেশিকাগুলি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। ভারতীয় সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আদালত ঘোষিত আইন হিসেবে এই নির্দেশিকাগুলি কার্যকর থাকবে।

এই বিষয়ে বারুপুরের ঘটনার সময় ‘এনকাউন্টার’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন নেটওয়ার্ক 18-এর ম্যানেজিং এডিটর ধ্রুবজ্যোতি প্রামাণিক। তিনি বলেন, ‘‘দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম হিসেবে আমাদের উচিত একবার দেখা, এনকাউন্টার নিয়ে আইনে কী বলছে? এই এনকাউন্টার এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ‘ট্রিগার হ্যাপি পুলিশ’ এই শব্দবন্ধ আমরা আজ নয়, বহু দিন ধরে শুনছি এবং অনেক বিতর্ক হয়েছে, একাধিক এনকাউন্টার নিয়ে বহু মামলা হয়েছে দেশের বিভিন্ন হাইকোর্টে এবং অবশ্যই সুপ্রিম কোর্টে।’’

কোন মামলার ক্ষেত্রে এসেছিল উপরোক্ত ১৬ দফা নির্দেশিকা, সেই মামলার উল্লেখ্য করে তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আর. এম. লোধা এবং বিচারপতি রোহিন্টন ফলি নারিমানের বেঞ্চ পুলিশি এনকাউন্টার সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। সেই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ১৬ দফা নির্দেশিকা জারি করে স্পষ্ট জানায়, যদি কোনো কারণে এনকাউন্টার হয়, তাহলে পরে পুলিশ তার দায়িত্ববর্তায়, আইনানুগ এনকাউন্টার হয়েছে কিনা৷ তার ঠিক দু’বছর আগের একটি মামলা, ওমপ্রকাশ ভার্সেস স্টেট অফ ঝাড়খণ্ড—সেই মামলাতে সুপ্রিম কোর্টের যে রায় দেয়, সেই রায়ের ৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ উল্লেখ্য করেন৷ সেখানে আদালত পরিষ্কার বলে দিল, বাট ওয়ান ক্যানোট বি অব্লিভিয়াস অফ দ্য ফ্যাক্ট দ্যাট দেয়ার আর কেসেস হোয়্যার দ্য পুলিশ হু আর পারফরমিং ডিউটি আর অ্যাটাকড অ্যান্ড কিল্ড (তবে এই বাস্তব সত্য সম্পর্কেও কেউ চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না যে, এমন অনেক ঘটনাই ঘটে যেখানে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ আক্রান্ত হয় এবং নিহত হয়)… পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে৷’’

‘‘আদালত পুলিশকে একটা রক্ষা কবজ দিল। যদি দেখা যায় পুলিশ আত্মরক্ষার্থে বাধ্য হয়ে গুলি চালিয়েছে, সেই গুলিতে কোনো অভিযুক্ত অপরাধী আসামীর তার মৃত্যু হয়েছে এবং পুলিশ পরবর্তীতে সমস্ত আইনানুক যে প্রক্রিয়া, সেটা পালন করেছে, তাহলে সেই পুলিশ—যার বন্দুকের গুলিতে বা রাইফেলের গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ—তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ করা যাবে না। এটাই পুলিশের রক্ষা কবজ’’, জানালেন তিনি৷

Post Comment

You May Have Missed