প্রয়াত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার স্যার গ্যারি সোবার্স
Cricket
-Ritesh Ghosh
বিশ্ব ক্রিকেটের এক অনন্য তারকার বিদায়। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ক্রিকেটার স্যার গারফিল্ড সোবার্স ৮৯ বছর বয়সে এদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর এই প্রস্থানে বিশ্ব ক্রিকেট কেবল একজন মহান ব্যক্তিত্বকেই হারালো না, বরং অবসান ঘটল বাইশ গজের রাজকীয় এবং গতিময় এক রোমাঞ্চকর স্বর্ণোজ্জ্বল যুগের।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ একটি বিশেষ পোস্টের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর খবরটি ভক্তদের উদ্দেশ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের এই অবিসংবাদিত নেতার চলে যাওয়ায় বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং ক্রিকেটপ্রেমীরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণিল কীর্তিকলাপকে।

১৯৩৬ সালের ২৮ জুলাই বার্বাডোজের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এই ক্রিকেট প্রতিভাকে আধুনিক অলরাউন্ডারের প্রকৃত জনক বলে মনে করা হয়। তিনি মাঠে নামা মানেই ছিল দর্শকদের জন্য নিখাদ বিনোদনের নিশ্চয়তা। বাঁহাতে মারকুটে ব্যাটিং করার পাশাপাশি তিনি নিখুঁত গতিতে বল করতে পারতেন এবং স্পিন বোলার হিসেবেও সমানভাবে প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের বিভ্রান্ত করতে পারতেন।
ক্রিকেটের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের উদয়
মাত্র ১৭ বছর বয়সে এক তরুণ হিসেবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের হয়ে আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেট মঞ্চে পা রেখেছিলেন স্যার গারফিল্ড সোবার্স। প্রথম ম্যাচ থেকেই ক্রিকেট বিশ্লেষকরা তাঁর ভেতরের অসীম সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরেছিলেন। এরপর প্রায় দুই দশক ধরে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের বুক কাঁপিয়েছেন এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ক্রিকেটকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
দীর্ঘ খেলোয়াড় জীবনে সোবার্স ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে মোট ৯৩টি টেস্ট ম্যাচ খেলেন। টেস্ট ফরম্যাটে তাঁর সংগৃহীত রান ৮,০৩২, যা তিনি অর্জন করেছিলেন ৫৭.৭৮ গড়ে। ক্রিকেটের ইতিহাসে এই গড় ধরে রাখা যেকোনও বিশ্বমানের ব্যাটারের জন্য অত্যন্ত কঠিন কাজ। তাঁর এই চোখধাঁধানো কেরিয়ারে রয়েছে ২৬টি শতরান এবং ৩০টি অর্ধ-শতরান।
In Barbados & in the company of greatness! 🫡 🫡#TeamIndia meet one of the greatest of the game – Sir Garfield Sobers 🙌 🙌#WIvIND pic.twitter.com/f2u1sbtRmP
— BCCI (@BCCI) July 5, 2023
তবে সোবার্সের অনন্যতা লুকিয়ে ছিল তাঁর বোলিং এবং অবিশ্বাস্য ফিল্ডিং দক্ষতার ওপর। বাঁহাতে মিডিয়াম পেস বোলিংয়ের সাথে লেগ স্পিন ও অর্থোডক্স স্পিনের এমন সংমিশ্রণ ক্রিকেট দুনিয়ায় আগে কখনও দেখা যায়নি। টেস্টে তিনি শিকার করেছেন ২৩৫টি উইকেট। একই সাথে স্লিপ অঞ্চলে অসম্ভব ক্ষিপ্রতার সাথে তিনি লুফে নিয়েছিলেন ১০৯টি অসাধারণ ক্যাচ।
রেকর্ডের পাতায় চিরস্মরণীয় দুটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত
স্যার গ্যারির কেরিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় এবং ঐতিহাসিক অনবদ্য কীর্তিটি রচিত হয়েছিল ১৯৫৮ সালের পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে। সাবাইনা পার্কে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে তিনি ব্যক্তিগত অপরাজিত ৩৬৫ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন, যা তৎকালীন সময়ে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে দীর্ঘদিনের জন্য সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান হিসেবে অক্ষুণ্ণ ও ছিল।
এর এক দশক পেরিয়ে ১৯৬৮ সালে স্যার গ্যারি সোবার্স বিশ্বকে উপহার দেন আর একটি তাক লাগানো ম্যাজিক। প্রথম-শ্রেণীর কাউন্টি ক্রিকেটে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে খেলার সময় গ্ল্যামারগনের বোলার ম্যালকম ন্যাশের এক ওভারে টানা ছয়টি ছক্কা মারেন তিনি। ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক ওভারে ছয়টি ছক্কা মারার অনন্য বিশ্বরেকর্ড গড়ে ইতিহাস গড়েছিলেন তিনি।
ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট সংস্কৃতির রূপকার ও অনন্য মেন্টর
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট মানেই এখন যে চোখধাঁধানো বিনোদন এবং মাঠের দাপট, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন স্যার গ্যারি সোবার্স ও তাঁর সময়ের লড়াকু খেলোয়াড়েরা। অধিনায়কত্ব করার সময় তিনি খেলোয়াড়দের কেবল কৌশলগত দিকই শেখাতেন না, বরং মাঠে কীভাবে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান থাকতে হয় সেই পাঠ দিতেন। তাঁর হাত ধরেই অনেক ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
পরবর্তী প্রজন্মের বহু তারকা ব্যাটার ও বোলার প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন যে, স্যার সোবার্সের দেওয়া বহুমুখী পরামর্শ তাঁদের কেরিয়ার গঠনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বিশ্ব ক্রিকেটে যখনই কোনও সংকট এসেছে বা নতুন কোনো রণকৌশল প্রণয়নের দরকার হয়েছে, তাঁর উপস্থিতি ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সকলের মনের শক্তি ও কাজের প্রতি একাগ্রতা অনেকখানি বাড়িয়ে দিত।
শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের কারণেই নয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের অধিনায়ক হিসেবেও তাঁর বিচক্ষণতা ও গতিশীল নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিনি তাঁর দলের খেলোয়াড়দের নতুনভাবে উজ্জীবিত করতে পারতেন এবং মাঠের যেকোনও কঠিন পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করতেন না। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত করার কারিগরদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
সর্বোচ্চ সম্মাননা এবং কালজয়ী এক মহিমান্বিত উত্তরাধিকার
ক্রীড়াজগতে অসামান্য অবদান এবং অসাধারণ ক্রিকেটশৈলীর স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ রাজপরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে নাইটহুড উপাধিতে ভূষিত করা হয়। উইজডেনের শতাব্দীসেরা অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন এবং আইসিসি হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে নিজের মহিমার পাকাপোক্ত স্বাক্ষর রেখে যান, যা বৈশ্বিক ক্রীড়া সম্প্রদায়ের জন্য বিশাল গৌরবের।
ক্রীড়া গবেষক ও ক্রিকেটবোদ্ধাদের মতে, স্যার গ্যারি সোবার্সের পরেই অলরাউন্ডারের প্রকৃত মাপকাঠি তৈরি হয়। কপিল দেব বা ইয়ান বোথামের মতো ক্রিকেটাররাও নিজেদের এগিয়ে নেওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন সোবার্সের অসাধারণ খেলা দেখে। মাঠে তাঁর অলরাউন্ড পারফরম্যান্স প্রতিটি তরুণ অলরাউন্ডার খেলোয়াড়কে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে মেলে ধরার এবং পারফর্ম করার চূড়ান্ত বিশ্বাস জুগিয়েছে।
মাঠের বাইরেও একজন পরিপূর্ণ ভদ্রলোক ও বিনয়ী মানুষ হিসেবে স্যার গ্যারি ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের প্রতি তাঁর সম্মানবোধ এবং খেলার চেতনাকে সবসময় সর্বাগ্রে রাখার মানসিকতা তাঁকে সবার থেকে আলাদা করেছিল। মাঠে তিনি যখন ব্যাট বা বল হাতে দাঁড়াতেন, প্রতিপক্ষও তাঁর খেলার চমৎকার ভঙ্গিমা দেখে অবাক ও মুগ্ধ হতো।
স্যার গারফিল্ড সোবার্সের এই চিরবিদায় ক্রিকেট বিশ্বে এক অভূতপূর্ব ও বড় ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি করল। তবে বাইশ গজের মায়াবী রূপকথা এবং কোটি কোটি ক্রিকেট অনুরাগীর অন্তরে তিনি চিরকাল এক মূর্ত প্রতীক হয়ে বাস করবেন।


Post Comment