বারুইপুরের অশান্তির নেপথ্যে ষড়যন্ত্র! গণপিটুনিতে মৃত যুবক নির্দোষ, কড়া হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর

West Bengal

-Ritesh Ghosh

বারুইপুরে গোলমাল তৈরির পিছনে সরাসরি সক্রিয় রয়েছে মৌলবাদী ও দেশবিরোধী শক্তি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে নির্যাতিতা নাবালিকার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার পর এই চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ তুলেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার বিকেলে বারুইপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গিয়ে তিনি শোকার্ত পরিবারের সাথে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করার পর এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।

মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচন সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ে যাঁরা পরাজিত হয়েছেন, তাঁরাই নিজেদের হারানো মাঠ ফিরে পেতে এবং রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে এই অস্থিরতা তৈরি করেছেন। রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে উসকানিমূলক কাজ কড়া হাতে দমন করার বার্তা দেওয়া হয়েছে। হিংসা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির এই নোংরা রাজনীতিকে আর কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না বলে চরম হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

Mamata Banerjee visits Baruipur to assess violence situation

উত্থেজনার রেশ ধরে বারুইপুরের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মাঝে এক নির্দোষ যুবককে নির্মমভাবে পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটেছিল, যা গোটা রাজ্যকে স্তম্ভিত করে দেয়। এদিন জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ওই গণপিটুনিতে মৃত যুবকের অত্যন্ত অসহায় পরিবারের তিন সদস্যের সঙ্গেও কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে, মৃত যুবক সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন এবং তাঁর হত্যাকারীদের কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হবে।

উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় স্তরের পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন মহলে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ঘটনা ঘটার সময় পুলিশের কোনো নিষ্ক্রিয়তা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে নবান্ন। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেলকে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়।

বারুইপুরের অশান্তির নেপথ্যে গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র

বারুইপুরের উত্তেজনার পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজতে গিয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে এসেছে বলে দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সুবিধাভোগী চক্র আড়াল থেকে সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে উত্তেজিত করছিল। এই চক্রান্তের কারণে এলাকায় প্রচুর সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছে, সাধারণ জীবনযাত্রা থমকে গেছে এবং রেললাইনের পাত উপড়ে ফেলে সাধারণ যাত্রীদের প্রাণ সংশয়ের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।

তদ্বন্ত প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, পুলিশ ইতিমধ্যেই বেশ কিছু বিতর্কিত ফোন কল রেকর্ডিং এবং উসকানিমূলক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ করে অশান্তি ছড়ানো এবং হিংসায় সরাসরি ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগে প্রায় ২০০ জনকে জেলা পুলিশ ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করেছে। এই ঘটনায় আর কারা পর্দার আড়ালে রয়েছে, তাদের খোঁজেও জোর কদমে তল্লাশি চলছে।

মুখ্যমন্ত্রী দেশের আইনের শাসনের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো অন্যায় কোনো স্বাধীন দেশে সহ্য করা যায় না। যে কোনো অন্যায়ের বিচার করার জন্য প্রশাসন ও দেশের আইন ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সেই সংবেদনশীল ইস্যুকে হাতিয়ার করে যারা বারুইপুর জুড়ে সামাজিক বিভেদ ও ত্রাস সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে প্রশাসন নিশ্চিত করেছে।

যদি পুলিশের কোনো আধিকারিকের কর্তব্যে কোনো ধরনের ফাঁকি বা অবহেলা প্রমাণিত হয়, তবে তাঁদেরও বিন্দুমাত্র রেয়াত করা হবে না বলে মুখ্যমন্ত্রী পুনরায় মনে করিয়ে দিয়েছেন। এই ধরনের ঘটনার তদন্ত যাতে কোনোভাবেই প্রভাবিত না হয়, তার জন্য কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে। বর্তমানে ওই স্পর্শকাতর এলাকা জুড়ে রাজ্য পুলিশের বিশাল বাহিনী ও উচ্চপদস্থ কর্তারা দিবারাত্রি টহল দিচ্ছেন এবং শান্তি বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর রয়েছেন।

নির্যাতিতার পরিবারের স্থায়ী নিরাপত্তা এবং আগামী পদক্ষেপ

নাবালিকার শোকগ্রস্ত পরিবারের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং এলাকার বাকি সাধারণ মানুষের মনে আস্থা ও ভরসা ফিরিয়ে আনা এই মুহূর্তে সবথেকে বড় কাজ। লক্ষ্যপূরণে মুখ্যমন্ত্রী এদিন প্রশাসনিকভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে নির্যাতিতার বাড়ির ঠিক সামনে অবিলম্বে একটি স্থায়ী পুলিশ আউটপোস্ট বা পুলিশ ফাঁড়ি তৈরি করা হয়। এই স্থায়ী ফাঁড়ির ফলে এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা সুদৃঢ় হবে এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ চিরতরে বন্ধ করা যাবে।

জনসাধারণের সামগ্রিক নিরাপত্তা এবং সুশাসনের স্বার্থে রাজ্য সরকার সবসময় দায়বদ্ধ থাকবে বলে নিজের বক্তব্যে অত্যন্ত জোরের সঙ্গে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। এই গুরুতর ঘটনার প্রতিটি স্তরে নজরদারি জারি রাখতে তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন যে, আগামী মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি আবারও বারুইপুর এলাকা পরিদর্শনে আসবেন। তাঁর উপস্থিতিতে গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থার তদারকি করবেন এবং ভুক্তভোগীদের সাথে আবারও সরাসরি পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলবেন।

ঘটনার পর থেকে তদন্তকারী আধিকারিকেরা এখন মূলত দুটি সমান্তরাল ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারায় কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। একদিকে যেমন নির্যাতিতা নাবালিকার ওপর হওয়া নৃশংস অত্যাচারের সুবিচার দিয়ে মূল দোষীদের ফাঁসি বা সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে, অন্য বিভাগে গণপিটুনির শিকার হওয়া নিরপরাধ যুবকের এই মর্মান্তিক পরিণতির জন্য দায়ী উগ্রপন্থী দাঙ্গাবাজদের একে একে গ্রেফতার করা হচ্ছে।

প্রশাসনের এই দ্বিমুখী ও কঠোর উদ্যোগ এলাকায় নতুন কায়দায় সামাজিক মেলবন্ধন ও আইনের শাসন ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। বারুইপুরের এই দুঃখজনক অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রশাসন ভবিষ্যতে সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানোর ওপর আরও বেশি জোর দিচ্ছে। অন্যায় রুখতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যাতে নিজেদের হাতে আইন তুলে না নেন, সেই সচেতনতা বাড়াতেও পুলিশ এলাকায় নতুন করে উদ্যোগী হচ্ছে।

Post Comment

You May Have Missed