সংসদ অভিযানের ডাক ঘিরে তপ্ত দিল্লি, একাধিক স্থানে জারি ১৬৩ ধারা, রয়েছে কড়া পুলিশি নজরদারি

India

-Ritesh Ghosh

সংসদের বাদল অধিবেশন শুরু হওয়ার ঠিক আগেই তপ্ত দিল্লির রাজনীতি। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রস্তাবিত ‘সংসদ চলো’ অভিযানকে কেন্দ্র করে রাজধানী দিল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এদিন সোমবার থেকে শুরু হতে চলা সংসদের বাদল অধিবেশন এবং এই প্রতিবাদ মিছিলের জেরে নয়াদিল্লি জেলা জুড়ে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দিল্লি পুলিশ। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)-এর ১৬৩ ধারার অধীনে এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা হয়েছে।

মূলত সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট (NEET)-এর নিয়মে একাধিক অনিয়ম এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই আবহে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে সরব হয়েছে সিজেপি। সেই লক্ষ্যেই সোমবার তাদের ‘সংসদ চলো’ অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলার অবনতি রুখতে এবং সংসদের স্বাভাবিক কাজকর্ম বজায় রাখতে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পুলিশ প্রশাসন।

Delhi police strengthening security measures during protest

দিল্লি পুলিশের নিষেধাজ্ঞা ও আইনি অবস্থান

দিল্লি পুলিশের তরফ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই প্রতিবাদ মিছিল বা সমাবেশের জন্য কোনও আগাম অনুমতি নেওয়া হয়নি এবং প্রশাসনও এমন কোনও কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি। নতুন দিল্লির ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (ডিসিপি) শচীন শর্মা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ একটি নির্দেশিকা জারি করে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে মিছিলটিকে ‘অবৈধ’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পুলিশের জারি করা নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, অনুমোদিত নির্দিষ্ট স্থান যন্তর মন্তর ছাড়া নয়াদিল্লির সীমানার কোথাও কোনও ধরনের প্রতিবাদ মিছিল, সমাবেশ, শোভাযাত্রা বা পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যন্তর মন্তরেও প্রতিবাদ কর্মসূচি করতে হলে পুলিশের আগাম লিখিত অনুমতির প্রয়োজন হবে। সংসদ অধিবেশন চলাকালীন এই নিরাপত্তা ও কড়া নজরদারি জারি থাকবে এবং গোটা এলাকার প্রতিটি স্পর্শকাতর পয়েন্টে কড়া পাহারা থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।

নতুন দিল্লি জেলায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এবং যেকোনও আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কোনও ব্যক্তি বা সংগঠন এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়বেন। আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে প্রশাসন সাধারণ মানুষকে এই নিয়মাবলী কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে।

মূলত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং কোনও ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেছে। আইন প্রয়োগকারী আধিকারিকদের মতে, সংসদের অধিবেশন চলাকালীন রাজধানীর স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে সুরক্ষার বলয় তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এই প্রেক্ষিতেই যেসব কার্যকলাপের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, তা নিচে দেওয়া হল।

নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ আইনি বিধি ও শর্তাবলী
ধরনা ও জমায়েত পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত এবং যে কোনও ধরনের জনসভা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
প্রতিবাদ ও মিছিল মহকুমার কোনও রাস্তায় মিছিল, স্লোগান দেওয়া বা প্রকাশ্যে সভা করা নিষিদ্ধ।
অস্ত্র ও সরঞ্জাম বহন লাঠি, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, তরবারি, বল্লম বা কোনও ধরনের হিংসাত্মক সরঞ্জাম বহন করা যাবে না।
বক্তব্য ও মাইক ব্যবহার উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য রাখা, মাইক বাজানো এবং রাজনৈতিক উস্কানিমূলক বার্তা দেওয়া নিষিদ্ধ।
নির্দিষ্ট এলাকা যন্তর মন্তর ছাড়া অন্য কোথাও ধরনা দেওয়া যাবে না। তাও বিকেল ৫টার পর অনুমতির ওপর নির্ভরশীল।

এই নিষেধাজ্ঞা মূলত পার্লামেন্ট স্ট্রিট মহকুমার সম্পূর্ণ এলাকার ওপর কার্যকর হবে। তবে যন্তর মন্তর রোড সংলগ্ন নির্দিষ্ট এলাকাটিকে এই বিধিনিষেধের আওতা থেকে বাইরে রাখা হয়েছে। তবে সেখানেও বিকেল ৫টার পর কোনও ধরনের কর্মসূচি বা জমায়েত করার ক্ষেত্রে পুলিশের সুনির্দিষ্ট এবং লিখিত অনুমতির প্রয়োজন হবে। অন্যথায় সেটিকেও আইনবিরোধী ও অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হবে বলে পুলিশ প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।

কড়া আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি

পার্লামেন্ট স্ট্রিট মহকুমার সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসিপি) অজয় শর্মা এই বিশেষ নির্দেশনামা জারি করেছেন। দিল্লি পুলিশ অ্যাক্ট, ১৯৭৮-এর ধারা এবং ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস), ২০২৩-এর ১৬৩ ধারার অধীনে পুলিশকে দেওয়া ক্ষমতার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

যদি কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এই নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে জমায়েত করার চেষ্টা করেন বা আইন অমান্য করেন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)-এর ২২৩ ধারার অধীনে মামলা রুজু করা হবে। এই ধারায় উপযুক্ত জরিমানা এবং শাস্তির বিধান রয়েছে। নতুন দিল্লি জেলাজুড়ে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলিতে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, সংসদের বাদল অধিবেশন অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনগুলি নিজেদের দাবিদাওয়ার সমর্থনে রাজধানীতে বিক্ষোভ বা জমায়তের চেষ্টা করে থাকে। সাম্প্রতিককালে নিট পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে এমনিতেই উত্তপ্ত রয়েছে ভারতের জাতীয় রাজনীতি। বিরোধী শিবিরের একাংশও এই ইস্যুতে সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে মরিয়া। সেই পরিস্থিতি মাথায় রেখেই দিল্লি পুলিশ এই বিশেষ নিরাপত্তামূলক বলয় তৈরি করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা দিল্লি পুলিশের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ‘সংসদ চলো’ অভিযানের জেরে সোমবার রাজধানী দিল্লিতে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষকেও ট্রাফিক ডাইভারশনের জেরে কিছুটা সমস্যার সম্মুখীন হতে হতে পারে। তবে সংসদ ভবনের সংলগ্ন এলাকা এবং নতুন দিল্লির শান্তি বজায় রাখাই প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। স্পর্শকাতর এই সময়ে সংসদ এলাকার নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনও খামতি রাখতে চাইছে না দিল্লি পুলিশ।

Previous post

অভিষেকের ‘ইস্তফা’ চ্যালেঞ্জ, ‘হঠাৎ বোধোদয় কিনা জানি না’, ‘গোলের টাইম মিস করে গেছেন’

Next post

অপ্রতিরোধ্য স্পেন ফের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, আর্জেন্টিনাকে জেতাতে পারলেন না মেসি

Post Comment

You May Have Missed